ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে রূপ আমাদের জানা সেটি শিক্ষা অঙ্গনের চেয়ে বরং ইতিহাস তৈরীতে অসাধারণ ভূমিকা রাখা এক রাজনৈতিক সচেতনতা চর্চা কেন্দ্র বলেই বোধ হয়। বাঙ্গালী জাতির চেতনার উন্মেষ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জন ও বিকাশে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ন ইস্যুগুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকা কখনো অগ্রজ সৈনিক, কখনো বা মূল রসদদাতা। আর সেটি সম্ভবপর হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাইকে বরন করে নেয়ার কৃষ্টির কারণে।
বাঙ্গালীর যত গৌরবময় দিন সব পালন করা হয় যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরেই। পহেলা বৈশাখ হোক বা নবান্ন উৎসব কিংবা বইমেলা, ঢাবি বারবারই আপন করে নিয়েছে সমগ্র বাংলাকে এবং এক সংস্কৃতির প্রতিনিধির মতো নিজেকে সাজিয়ে তুলেছে প্রতিটি উৎসবে, সংগ্রামে, আন্দোলনে।
ঢাবির ছাত্রদের ভাষায় ‘বহিরাগত’ হিসেবেই হাজারবার পাড়িয়েছি এই পবিত্র অঙ্গনের ঘাস। ছবির হাট, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, জগন্নাথের পুকুর কিংবা মধুর ক্যান্টিন থেকে মল চত্বর- জড়িয়ে আছে আমার হাজারো রঙ্গিন কিছু সুখ স্মৃতির সাথে। এবং আমার বিশ্বাস সকল ঢাকাবাসীরও তাই বটে। আমার আন্দোলন, আমার সংগ্রাম এবং আমার সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্র ঢাবিকে তাই শুধু ঢাবির ছাত্রদের একার বলে ভাবতে পারিনা। ঢাবিকে ভাবি আমাদের সবার একটি ভালোবাসার পীঠস্থান হিসেবে। আমি ঢাবির ছাত্র নই, ঢাবি এলাকায় বসবাসও করিনি কখনো কিংবা নগর পরিকল্পনাবিদও নই।
কিন্তু সেই ভালোবাসার অধিকার নিয়ে দুটি কথা বলতে চাই। ঢাবিতে মেট্রোরেল এর পথ নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন আলোচনা/সমালোচনা ও বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব দেখে সবার আগে এই ধারনাটাই মাথায় আসে সবার আগে বাঙ্গালী আসলে ভালো কিছুর চাইতে গেলে আগে খারাপের আশংকায় ঘরপোড়া গরুর মতো ভীতু হয়ে যায়। এতে দোষের কিছু নেই, যেকোন পরিবর্তনেই সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। তবে মাঝে মাঝে অতিদৃষ্টি আবার কাল হয়ে দাঁড়ায় বৈকি।
সম্প্রতি বিদেশে এসেছি। আমার যেটা সবচেয়ে আসার পর ভালোলেগেছে সেটা যাতায়াত ব্যাবস্থা। বাস আছে, অল্পসংখ্যক। মুল যাতায়াতটা হয় মেট্রোরেল ভিত্তিক। কোন জানজট নেই, হাজার গাড়ির ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা নেই। প্রায় নিশব্দে শহরের মাঝ দিয়ে, বাসা বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যায় মেট্রো রেল। আপনি যদি কাউকে কথা দিয়ে থাকেন কখন দেখা করবেন সেটি খুবই সহজ রাখা শুধুমাত্র এই সহজ যাতায়াত ব্যাবস্থার কারণে। মাঝে মাঝে ঢাকার অসহনীয় জামের কথা ভাবি আর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলি। বাসা থেকে বের হলেই সারাদিনের জন্য রাস্তায় আটকে পড়া। এ যেন এক ইঁদুরের ফাঁদ, না যাওয়া যায় এদিকে, না ওদিকে। খুব, খুবই দেরীতে হলেও ঢাকাতে মেট্রোরেল হচ্ছে এই সংবাদ আশাবাদী করে তোলে।
সোজা চোখে যেটা দেখতে পাই বা যেটা বুঝি, মেট্রো রেলের পথটি ঢাবির ভেতর দিয়ে যাবার দুইটি কারন। এক, মেট্রো রেলের যাতায়াতের পথ হতে হয় সরলরেখায়। যেন অধিক গতিতে যাতায়াত করা যায় ও মেট্রোরেলের গঠনগত কারনে। কিছু বাঁক অবশ্যম্ভবাবী, সেটা ইঞ্জিনিয়াররা হিসাব করেই বের করে থাকেন। আমার সহজ দৃষ্টিতে মনে হয়েছে দোয়েল চত্বর দিয়ে মেট্রো রেল না গিয়ে মৎসভবন ঘুরে গেলে মেট্রো রেলের সেই উদ্দেশ্যটি পুরন হচ্ছে না।
ক্যাপশনঃ লালটি রাস্তাটি প্রস্তাবিত ও কালো রাস্তাটি আন্দোলনকারীদের দাবী।
দুই, ঢাবির অগনিত শিক্ষার্থী ও আজিমপুর-নিউমার্কেট এলাকার বাসিন্দাদের একটু সহজ যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধা করে দেয়া। ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় আটকে না থেকে সবাই-ই চাইবেন একটু বেশি মূল্য দিয়ে হলেও দ্রুত যেন আসা যায়।
এখন মাইক বাজিয়ে পরিবেশ দূষন করে যারা আসলে মেট্রোরেলের পরিবেশ দূষনের ধোঁয়া তুলছেন, তাঁরা আদৌ মেট্রোরেল দেখেছেন কিনা সন্দেহ হচ্ছে। কারন মেট্রোরেল পরিবেশবান্ধব বাহন হিসেবে পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত। কারেন্টে চলে বলে তেল বা গ্যাস পোড়ার কোন বালাই নেই। আর কাঁপুনির কথা শুনে আরো বেশি মজা লেগেছে, কারন মেট্রো রেলকে তাঁরা রেলগাড়ি হিসেবে ধরে নিয়ে বিচার করছেন। মেট্রোরেলের গঠন খুব হালকা করা হয় যেন দ্রুত গতিতে ছুটতে পারে। কাঁপুনিতো দুরের কথা, মৃদু যে শব্দটা হয়, টিএসসির নিয়মিত মাইকে বিপ্লবী গলার আওয়াজে সেটা আদৌ শোনা যাবে কিনা সন্দেহ আছে।
সপ্তাহ দুয়েক আগে ইউনিভার্সিটি অফ বিলেফেল্ডে গিয়েছিলাম এক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে, ইউনিভার্সিটি বিল্ডিং এর সামনেই গিয়ে মেট্রো থেকে নেমে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলাম, মানুষ অজ্ঞানতার জন্য কতোরকমের ভাবনাই ভাবে। আমি যদি দেশে থাকতাম, তাহলে হয়তো একই কথা বলে আমাকেও কনভিন্স করা সম্ভব হতো, যেহেতু আমি নিজের চোখে দেখিনি।
তবে রাজু ভাস্কর্যের সৌন্দর্যহানি বা ইউনিভার্সিটির নিয়মিত সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক আয়োজনগুলি কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কিনা সেটা খেয়াল রাখাটা জরুরী। কিছু লেখা পড়ে নিশ্চিত হলাম সেটার সম্ভাবনা নেই। ঢাবি শুধু একটি গৌরবের অংশীদার হতে যাচ্ছে। একসময় রাজু ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে দিয়ে চলে যাওয়া মেট্রোরেলই হবে ঢাবির পরিচিতির অংশ, সেই কামনাই করি।
পরিশেষে একটি গল্প লিখে শেষ করি। একদিন এক বাম ছাত্রনেতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন রাজনৈতিক দল হিসেবে আপনারা রাজনীতি করছেন কিন্তু ক্ষমতায় আসতে পারেননি। আপনাদের নিশ্চয়ই সমাজ পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা আছে। সেটা কিভাবে? তিনি আমাকে উত্তর দিয়েছিলেন দেশে বিভিন্নসময় গড়ে ওঠা আন্দোলনের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ক্ষেত্র তৈরী করে সমন্বিত আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চাই আমরা। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে কি ক্ষমতায় আসা যায়? ইস্যু নিঃশেষ হবার সাথে সাথে তো আন্দোলনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আস্তে আস্তে হবে।
তো আন্দোলনমুখী রাজনৈতিক দল থাকাটা খারাপ নয়, তবে আন্দোলনটা কি নিয়ে করতে হবে, মেট্রোরেলের পথ পরিবর্তন জন্য না মেট্রোরেলের অধিক ভাড়া সংক্রান্ত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য সেটা বুঝতে না পারলে তো আন্দোলনের কাঁপিয়ে মেট্রোরেল চলে যাবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






