দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের বহুল প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার মামলায় জঙ্গিদের গডফাদার মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। অাজ কাশিমপুর কারাগারে এই ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। নানা অপকর্ম দিয়ে নিজেকে ভয়ঙ্কর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা শতাধিক নিরাপরাধ মানুষের হন্তারক শীর্ষ এই জঙ্গির ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে অন্যতম মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এই মাইলফলক দেশ-বিদেশের জঙ্গিবাদ দমনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
এর মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হলো, যতো বড় জঙ্গি হোক না কেনো, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। অপরাধ করলে নিজের সেই অপরাধের বিচার যে পেতেই হবে, এ রায় কার্যকরের মাধ্যমে তা আবারো প্রতিষ্ঠিত হলো। এ দণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে তার নির্দেশনায় নিহত মানুষদের আত্মা এবং আহত ব্যক্তিরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। নিহতদের স্বজনরা চোখ থেকে অনবরত ঝরতে থাকা অশ্রুটুকু মুছে ফেলে আজ সবক’টা জানালা খুলে দিয়ে গাইতে পারবে বিজয়ের গান।
তবে যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফের আবেদনের মতো এবারও জঙ্গিবাদের গডফাদার এবং শতাধিক মানুষের হন্তারক এই শীর্ষ জঙ্গিসহ আরো তিন জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে ‘মানবাধিকার সংস্থা’ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ! মানবাধিকারের বুলি আওড়িয়ে এ সংস্থা বলছে, তারা যেকোনো দেশে, যেকোনো পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে।
মানবাধিকারের মুখোশ পড়া এ সংস্থাটি এখন দানবের হয়ে কথা বললেও যখন এই শীর্ষ জঙ্গিরা তথাকথিত জিহাদের নামে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও বোমা-গ্রেনেডের আতঙ্ক কায়েমের অপচেষ্টা চালিয়েছে, যখন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের এই জঙ্গি নেতার নির্দেশনায় শক্তিশালী বোমায় বারবার সবুজ-শ্যামল এ দেশ কেঁপেছে, এরা যখন মাজার থেকে শুরু করে রাজপথ-জনসভা এমনকি সংস্কৃতি অঙ্গনকে রক্তাক্ত করেছে, তখন কিন্তু সেই নিরাপরাধ মানুষগুলোর হয়ে এইচআরডব্লিউ কোনো কথা বলেনি।
মানবাধিকারের এই ধ্বজাধারীরা এসব হামলায় আহত হয়ে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা কোনো মানুষের কাছে যায়নি। এরা কখনোই দেখতে যায়নি শীর্ষ এই জঙ্গির নির্দেশে নিহত কোনো মানুষের প্রিয়জনের চোখের জল। নিহত কারো মা, সন্তান, বোন কিংবা প্রিয়তমার মনের কষ্ট এরা কখনো বুঝতে চায়নি। মানবাধিকারের দোকান দিয়ে এরা শুধু লবিং আর টাকা চিনেছে। তাই যুদ্ধাপরাধী কিংবা শীর্ষ জঙ্গিদের ‘অধিকার’ই তাদের কাছে মানবাধিকার!
এই জঙ্গি গডফাদারের জবানবন্দী মতে জানা যায়, গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসা হয়ে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছে সে। দেওবন্দে দাওরা হাদিস পড়াকালে ১৯৮৭ সালে ওই দেশের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করে হান্নান। পরের বছর ১৯৮৮ সালে সে পাকিস্তানে যায় এবং করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে ভর্তি হয়৷
সেখান থেকে সীমান্তবর্তী শহর খোস্তে ‘মুজাহিদ ক্যাম্পে’ প্রশিক্ষণ নিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয় হান্নান। এরপর করাচির ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করে। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৩ সালে দেশে ফেরে মুফতি হান্নান এবং ফিরেই পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়ে তৎপরতা শুরু করেন। অল্প দিনেই হুজি-বির থানা পর্যায়ের দায়িত্ব থেকে শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসে হান্নান।
এসব তথ্য পর্যালোচনা করলে এর মানে দাঁড়ায়, তার জঙ্গিবাদী মতাদর্শের হাতেখড়ি হয়েছিলো বরিশালের শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসায়। এটা সেই মাদ্রাসা যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলো এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার চিহ্নিত রাজাকার। একাত্তরে পরাজয়ের পর নিজের অপরাধ লুকানোর কৌশল হিসেবে এ মাদ্রাসায় জড়িত হয় সে। তখন থেকেই এদের বিষাক্ত ছোবলে বারবার রক্তাক্ত হয়েছে এদেশ। আর তার জঙ্গিবাদের দীক্ষার পূর্ণতা মিলেছে পাকিস্তানের করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায়।
অনেকে হয়তো বলবেন, গুলশানের জঙ্গি হামলাসহ এখনকার সন্ত্রাসী হামলাগুলোতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ধারার ছাত্রদের দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমি বলবো, বিষয়টি দু:খজনক বাস্তবতায় সত্য হলেও এসব ছেলে-মেয়েদের ব্রেইনওয়াশ করে এ অন্ধকারের পথে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জঙ্গি হান্নানের মতো মাদ্রাসা পড়ুয়া ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকারী উত্তরসূরিরা কলকাঠি নাড়ছে। আমি সামগ্রিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাকে খারাপ বলছি না, তবে এটা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি দেশের কওমী মাদ্রাসা এবং অন্যতম শীর্ষ রাজাকারের শর্ষিণা মাদ্রাসা নিশ্চয়ই এদেশে কট্টরপন্থা ও জঙ্গিবাদ বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। এসব মাদ্রাসা এখনো পহেলা বৈশাখ, বসন্ত বরণসহ অন্যান্য বাঙালি সংস্কৃতিকে এখনো ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’ বলে ফতোয়া দেয়।
তারা যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে ‘অনৈসলামিক’ ও ‘মুরতাদ’দের আস্তানা মনে করে তার একটি ধারণা আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া হান্নানের স্বীকারোক্তিতে পাওয়া যায়। ওই স্বীকারোক্তিতে উদীচির হামলা প্রসঙ্গে সে বলেছিলো, ‘দেশে অনৈসলামিক কাজ বন্ধ করার জন্য আমরা মৌখিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আরও কয়েকজন মওলানার উপস্থিতিতে সভার সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশে উদীচীর উলঙ্গ গান-বাজনা বন্ধ করা হবে।’ এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, সিপিবির সমাবেশে হামলা, খুলনায় ভিন্ন মতাবলম্বী আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ধারাবাহিকভাবে মানুষ খুনের পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠে এই সন্ত্রাসীরা।
জবানবন্দীতে হান্নান আরও বলে, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। এরপর দেশের প্রখ্যাত আলেমরা ইসলামী আইনানুযায়ী দেশে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার বাইরে দেশের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে ফতোয়া দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করেন। তাতে আওয়ামী লীগ সরকার বাধা দেয়। তারা ফতোয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্ট মামলা করলে আদালত ফতোয়া দেয়া অবৈধ ঘোষণা করেন যাতে আলেম-ওলামাদের ফতোয়া দেয়া বন্ধ হয়ে যায়।’ এ কারণেই হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে কয়েকবার শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনাসহ করা হয় বলে সে জানিয়েছে।
আমার জানামতে, শর্ষিণা মাদ্রাসাটি এখনো কট্টর জঙ্গি মতাদর্শ মোতাবেক পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের ব্রেইনওয়াশের মাধ্যমে কাজ না হলে এখানে শারিরীকভাবে নির্যাতন করে ধর্মীয় এসব অপব্যাখ্যা মানতে বাধ্য করা হয়। এমনকি বিভিন্ন ‘অনৈসলামিক’ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তি হওয়ার বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তারা। পরবর্তী সময়ে যেসব শিক্ষার্থীরা এই গণ্ডির বাইরে বেরোতে না পারে, তারাই আস্তে আস্তে দেশ-বিদেশে ওই মাদ্রাসার মতাদর্শী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজের অজান্তেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে।
হান্নানের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, এদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তারের মূল কারণ হচ্ছে ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন। তাই জঙ্গিদের বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা পেতে হলে এবং জঙ্গিবাদের শেকড় সমূলে উৎপাটন করতে হলে মুফতি হান্নানের ফাঁসির পাশাপাশি জঙ্গিবাদের এসব আঁতুড়ঘরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মৌলবাদি মতবাদকে গুড়িয়ে দিতে হবে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াত এবং তাদের মতাদর্শীদের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠন নিষিদ্ধ এবং রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার নামে এরা যাতে ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত করতে না পারে সেই বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এটা নিশ্চিত করতে না পারলে এক মুফতি হান্নান গেলেও মৌলবাদি রাজনীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলে শত শত মুফতি হান্নানের জন্ম হবে। কারণ তাদেরকে যখন এ পথে নিয়ে আসা হয়, তখন নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিণতি এবং মৃত্যু পরবর্তী ‘বেহেশতি হুর-পরী’র প্রলোভন দেখিয়েই নিয়ে আসা হয়। ধর্মের অপব্যাখ্যা করে এমন মৃত্যুকে তারা ‘ইমানি মৃত্যু’ বলে আখ্যায়িত করে। তাই জঙ্গিবাদ নির্মূলে প্রকৃত মাইলফলকে যেতে হলে তাদের মৌলবাদি আদর্শের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা জরুরি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







