আকাশে ঘন মেঘ। যে কোন সময় নামতে পারে বৃষ্টি। মাতাল হাওয়ায় ধুলোর সঙ্গে উড়ছে ঝরা পাতা। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এমনি প্রতিকূল আবহাওয়ায় বাকশিল্পাঙ্গনের একদল আবৃত্তিশিল্পী রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে অনুষ্ঠান আয়োজন করে। বাতাসে বারবার পড়ে যাচ্ছিল সাজানো তোরণগুলো। বৈরি আবহাওয়ার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের পর শুরু হয় ‘শেকল ভাঙ্গার পদ্য’ শিরোনামে দুদিনব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের আবৃত্তি উৎসব। বাকশিল্পাঙ্গনের আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে সম্মাননা জানানো হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাতজন আবৃত্তিশিল্পীকে। তারা হলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সৈয়দ হাসান ইমাম, আশরাফুল আলম, কাজী আরিফ, পঞ্চানন চৌধুরী, মানবেন্দ্র বটব্যাল ও ডালিয়া আহমেদ।
অতিধিদের আসন গ্রহণের পর মৈত্রী শিশুদলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সমবেতকণ্ঠে জাতাীয় সংগীত গায়। এসময় রবীন্দ্সরোবরের মাঠ ভর্তি দর্শক দাঁড়িয়ে শিশুদের সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলান। জাতীয় সংগীত শেষ করে ওরা গাইল ‘মানুষ হ, মানুষ হ, আবার তোরা মানুষ হ’। এরপর সম্মিলিত সংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুসের নেতৃত্বে অতিথিরা মশাল প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। এসময় মৈত্রী শিশুদলের কণ্ঠে ছিল ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলি দান’ গানটি।
মশাল প্রজ্বলন শেষে একে একে ডাকা হয় মহান মুক্তিযোদ্ধাদের। শুরুতে আসেন মুক্তিযোদ্ধা আবৃত্তিশিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম। গোলাম কুদ্দুস ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেন সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। আশরাফুল আলম ও সম্মুখ যোদ্ধা কাজী আরিফের পরে সম্মাননা স্মারক নেন পঞ্চকানন চৌধুরী। উপস্থিত একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা ও আবৃত্তিশিল্পী ডালিয়া আহমেদ সম্মাননা নেওয়ার পর চট্টগ্রামে থাকা মানবেন্দ্র বটব্যালের পক্ষ থেকে সম্মাননা নেন তার প্রতিনিধি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর অন্য একটা অনুষ্ঠানে থাকায় তার সম্মাননা পরে হস্তান্তর করা হবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

সম্মাননা পেয়ে কেমন লাগছে সেটা দর্শকদের জানান কাজী আরিফ ও পঞ্চানন চৌধুরী। অনুভূতি প্রকাশের পর থাকে তাদের আবৃত্তিও। ডালিয়া আহমেদ বলেন তার মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হওয়ার গল্প। বলেন যুদ্ধকালীন গেরিলা কার্যক্রম ও সে সময় পালন করা দায়িত্বের গল্প। কীভাবে বড়ভাই কর্নেল তাহেরের চোখে নিজেকে যুদ্ধে যাওয়ার যোগ্য প্রমাণ করে যোগ দিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে সেই গল্প তন্ময় হয়ে শুনছিল দর্শক। দর্শকের মোহ ভাঙ্গে বজ্রের ডাকে। বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। আয়োজকরা বাধ্য হয়ে এদিনের অনুষ্ঠান সমাপনি ঘোষনা করেন।
বাকশিল্পঙ্গনের সভাপতি নাসির উদ্দীন আয়োজন নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে আমরা নিয়মিতভাবে আয়োজন করছি এই উৎসব। এই উৎসব তো এক উপলক্ষ মাত্র। আয়োজনকে ঘিরে নিজের জায়গা থেকে আমরা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা কাজে যুক্ত হতে চাই। যারা দেশের জন্য, মানুষের জন্য নতুন পৃথিবী বিনির্মাণে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন তাদের পাশে থাকার এ বড় ক্ষুদ্র প্রয়াস।’

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই সম্মান একেবারেই ক্ষুদ্র মনে করিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা আমাদের একটা দেশ উপহার দিলেন, সমাজ দিলেন, সমাজ বিনির্মাণের সুযোগ দিলেন; তাদের জন্য এই সম্মাননা একেবারেই ক্ষুদ্র।’
আজ শনিবার অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন রয়েছে আবৃত্তি। নাসির উদ্দিন জানান, এবার আবৃত্তি উৎসবে বাকশিল্পাঙ্গন আশ্রয় নিয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামে। তার ‘সাম্যবাদ-দেশপ্রেম- সমতার’ কথা নিয়ে আমরা সাজানো হয়েছে এবারের প্রযোজনাগুলো। আমাদের পাশাপাশি তিনটি সংগঠনও পরিবেশন করবে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা, শিশুদের বাঁচাবার ও বাঁচবার অধিকারের কথা, সর্বোপরি মানুষের বাসযোগ্য ধরিত্রীর কথা।
আজ বিকাল পাঁচটায় শুরু হবে দ্বিতীয় দিনের পরিবেশনা। ঢাকা স্বরকল্পনের ক্ষুদে আবৃত্তিশিল্পীরা পরিবেশন করবে ‘যুদ্ধ জয়ের কাব্য’। থাকছে বাকশিল্পাঙ্গনের শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনা ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। দলীয় প্রযোজনাগুলোর মধ্যে থাকছে ‘ধরিত্রী’, ‘বিশ্ব মানুষ দিবস’। রয়েছে একক আবৃত্তি।
আলোকচিত্রী : শাকিব উল ইসলাম










