বাংলায় একটা প্রবাদ বাক্য আছে ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ!’ বিএনপিরও আজ সে অবস্থা হয়েছে! রাজনৈতিক জোটের নামে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে থাকতে থাকতে অধঃপতন হয়েছে চরিত্রে! এরা নিজেদের স্বাধীনতার ঘোষকের দল দাবি করে! মুক্তিযোদ্ধাদের দল দাবি করে! কিন্তু কী যে কখন বলে তার আগামাথা নেই!
লন্ডনের খবর যারা জানেন; তারা জানেন তারেক রহমানের সঙ্গীদের অনেকে জামায়াত ঘরানার একদল তরুণ আইনজীবী। তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারেক রহমানকে যা জ্ঞান দেয় তা নিয়ে তিনি একটি ভাষণ দেন! খালেদা জিয়া এবার লন্ডন গিয়ে ছেলের সেই জ্ঞানের ভাগ নিয়ে এসেছেন!
প্রধানমন্ত্রী থাকতে তিনি ত্রিশ লাখ শহীদের কথা বলতেন। এখন হঠাৎ করে সংখ্যাটা নিয়ে তার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে! না পাকিস্তানিদের সর্বশেষ বিবৃতির পর! যেখানে পাকিস্তানিরা দাবি করেছে একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে তাদের কোন দায়-সম্পৃক্ততা নেই! তবে কী সেদিন ভূতে এতলোক মেরেছে? সেই ভূতদের দল কী আজকের বিএনপি!
এরশাদের মন্ত্রী, মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমিন চখা মিয়া ঠাকুরগাঁওয়ের রাজাকার না মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন; তা সেখানকার লোকজন জানে। গত বিএনপির আমলে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নিজের নাম তোলেন মির্জা ফখরুল। ঢাকার হাওয়া ভবনের আদলে গত বিএনপির আমলে মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও শহরের বাড়ির নাম কেন বাতাসভবন ছিল এর কারণও জানেন সেখানকার লোকজন!
তারেক রহমানের আকস্মিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উদগীরণ শুরুর পর মির্জা ফখরুল বলে বসেন, বইপত্র পড়ে এসব বলেছেন তারেক রহমান! মির্জা ফখরুল মাস্টার মানুষ ছিলেন। অনেক ছাত্র পড়িয়েছেন। তারেক রহমানের বিদ্যাবুদ্ধিও ঢের জানেন। তা সেই তারেক রহমান হঠাৎ এতকিছু পড়ে ফেললেন, মির্জা ফখরুল তা কেন পড়েননি বা পড়তে পারলেন না?
আসলে দীর্ঘদিন অনভ্যস্ত ক্ষমতার বাইরে থাকতে থাকতে গভীর হতাশার রোগে পেয়ে বসেছে বিএনপি নেতাদের! জামায়াতের সঙ্গে ঘরসংসার করতে করতে মাথায় চেপেছে জামায়াতের আছর! এতদিনের সংসার! আছর না পড়ে কি পারে! তাই ‘নাই কাজতো খই ভাজ’এর মতো হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাসে তাদের চোখ পড়েছে! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মূলকথাগুলো স্বাধীনতার ইতিহাসের দলিলখণ্ডগুলোয় আছে। জাতীয় এই সম্পত্তি এড়িয়ে জামায়াতি-পাকিস্তানি ধারায় নতুন ইতিহাস উদগীরণ অপচেষ্টার কারণ সব দেশের মানুষতো বোঝে।
প্রতিবার দেশে নির্বাচন এলে বিএনপির এক নেতা রেগেমেগে পদত্যাগ করেন! কারণ খালেদা জিয়া তাকে নির্বাচন করার মতো উপযুক্ত মনে করেন না! ইনি বাবু গয়েশ্বর! তিনিই এখন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা! নানাকিছুতে দলের হয়ে বক্তৃতা দেন!
ইনি বলেছেন, সাতদিনেই নাকি তারা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা করে ফেলতে পারেন! দফায় দফায় তারা এতদিন ক্ষমতায় ছিলেন। কোনদিন তালিকা করলেন না, বা করতে চাইলেন না! কোনদিন স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন কায়দায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেন না! এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরাও চাই, সাতদিনের মধ্যে তালিকা যারা করে ফেলার কথা বলেন, তারা কারা দেশের মানুষ তাদেরও চেনে-জানে। এরাই কী রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের দল? বাংলাদেশের কোন রণাঙ্গনে শ্লোগান দেয়া হতো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার পর্বটি এত নারকীয় যা বিশ্বের ইতিহাসে তুলনাবিহীন। বেশিরভাগ লোক নিহত হয়েছে বেঘোরে। স্থানান্তরের সময়। তাদের পরিচয় শনাক্তের মতো স্বজন কেউ আশেপাশে ছিলেন না।
মানিকগঞ্জের এক মুক্তিযোদ্ধা আমাকে বলেছেন, একদিন এক নদীতে দেখেন একটা কুকুর হেঁটে নদী পেরোচ্ছে! এরপর যে বর্ননা দিলেন তা শিউরে ওঠার মতো! পাকিস্তানিদের ফেলে দেয়া লাশের স্তুপ জমে খরস্রোতা বিশাল নদীর মাঝ বরাবর বাঁধের মতো পথ তৈরি করেছে! সেটির ওপর দিয়েই হেঁটে নদী পেরুচ্ছিল সেই কুকুর! জামালপুর-শেরপুরের ধানুয়া কামালপুরে আমাকে বলা হয় কর্নেল তাহের নেতৃত্বাধীন ভয়াবহ যুদ্ধের পর তারা সারা মাঠজুড়ে দেখেন শুধু লাশ আর লাশ! জিজ্ঞেস করি কবরগুলো কোথায়? আদিগন্ত ধানের মাঠ দেখিয়ে বলা হয়, এই যে মাঠ-যত ধানক্ষেত দেখছেন সবই কিন্তু কবর! এগুলো চিহ্নিত করা হয়নি বা যায়নি!
বাংলাদেশের এমন নানান এলাকায় জমি খুঁড়তে, বাড়ি করতে গেলে পাওয়া যায় মানুষের হাড়গোড়! এর বেশিরভাগ একাত্তরে নিহত মাটিচাপা দেয়া লোকজনের! এরজন্যে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ গড়ার আগেই সেই এফিটাফে লেখা হয়েছিল, ‘অজ্ঞাতনামা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে’। সেই স্মৃতিসৌধে প্রতি ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে শ্রদ্ধাঞ্জলির নামে ছবি তুলতে যান খালেদা জিয়া! সেই ছবিতে সেখানে নিজেকে রাখার জন্যে গুতোগুতি করেন বাবু গয়েশ্বরও! আর তারা সাতদিনের মধ্যে করে ফেলবেন শহীদের তালিকা!
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে খালেদা জিয়া ধৃষ্ট অবজ্ঞা-কটুক্তির পর বিএনপির শোপিস নেতা বাবু গয়েশ্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়েও ধৃষ্ট কটুক্তি করেছেন! তিনি বলেছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীরা এখানে থেকে নির্বোধের মতো মরেছেন! একাত্তরে এই জনপদে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিলেন। সাড়ে সাত কোটির মাত্র এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে গেছেন। বাকি সাড়ে ছয় কোটি নানা কারণে যাননি বা যেতে পারেননি। তারা কী সবাই নির্বোধ? শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারীদের সঙ্গে সারাক্ষণ উঠবস করা এই বাবু গয়েশ্বরকে তার এসব উদ্দেশ্যমূলক উস্কানিমূলক মতলবী মন্তব্যের জন্যে কে যে কোথায় তাকে পথেঘাটে ধরে তা কে জানে!
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে খালেদা জিয়ার হঠাৎ সন্দেহ, পাকিস্তানিদের পক্ষে উস্কানি সৃষ্টির পর দেশে একটি ডিনায়াল ল’ চালুর তাগিদ শুরু হয়েছে। আইন কমিশন সে কাজও শুরু করেছে। তারা সে কাজ করুক। আমরা জানি, বিশ্বাস করি মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ, বিএনপি যেহেতু তা বিশ্বাস করে না তারা একটি তালিকা করুক। বাবু গয়েশ্বর যেহেতু সাতদিনেই তালিকা করতে সক্ষম তাকে তারা সে তালিকা প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান করুক। তারা তাদের তালিকায় থাক, আমরা থাকবো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-চেতনার মূলধারায়। যেখানে বাঙ্গালি জাতির একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে। সে রাষ্ট্রের শ্লোগান জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশনে তথা যুদ্ধে যাবার আগে শপথ নিয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান দিয়ে যেতেন। যুদ্ধ থেকে ক্যাম্পে ফিরে আবার শ্লোগান দিতেন জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের সবগুলো শহর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান দিয়ে স্বাধীন হয়েছে। সেই জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বাদ দিয়ে কী কারণে গয়েশ্বরের নেতারা সেদিন পাকিস্তান জিন্দাবাদের আদলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ চালু করেছিল, তাও দেশের মানুষ জানে। সেই শয়তানদের নতুন উৎপাত দেশে আগে বন্ধ হোক।
বাংলাদেশের আর সব কাজ করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। কারণ বাংলাদেশ থাকবে। এরা চাইলেই বাংলাদেশ আবার পাকিস্তান হয়ে যাবে না। যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার যেমন তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল পাকিস্তান পালিয়ে গেছে এরাও যাবে। কারণ এদের মনটা সেখানকার। দেহটা এখানে জোর করে রাখতে চাইলে তাদের পাগলামোগুলো শুধুই বাড়বে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। এ লেখাটির ভাষারীতিও লেখকের নিজস্ব)






