মীর কাসেমের ফাঁসিতে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসীম আর তার মায়ের সুখের দিন আজ; জাতির কলঙ্কমোচনের দিন। চট্টগ্রামের টেলিগ্রাফ অফিস সংলগ্ন মহামায়া ভবন দখল করে সেদিনের গড়ে ওঠা ডালিম হোটেলে নির্যাতিত এবং প্রাণ হারানো শত-শত মানুষের স্বস্তির এক দিন। চট্টগ্রামের জল্লাদ খ্যাত মীর কাসেমের ফাঁসির মধ্যদিয়ে নিভৃতে চোখের পানি ফেলে যাওয়া স্বজন হারানোর হাহাকার, ক্ষোভ ও দুঃখ-বেদনার অবসানের দিন আজ।
মীর কাসেমের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে শুধু মাত্র কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ব্হাল রাখে আপিল বিভাগ। সেদিনের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে দীর্ঘদিন আটক রেখে নির্যাতন করে হত্যা করে হয় ডালিম হোটেলে। এরপর তাকে সহ আরও পাঁচ জনের লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় কর্ণফুলী নদীতে। সেদিনের নিহত কারও-ই লাশ খুঁজে পায়নি স্বজনেরা। কথিত আছে: মৃত্যুর আগে জসিমের শেষ ইচ্ছে ছিলো মায়ের হাতে ভাত খাওয়া। কিন্তু মানুষ রূপী ওই নরপিশাচেরা সেদিন তাকে তো সে সুযোগই দেইনি। উল্টো নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। ওই দিনের নিহত জসিমের মা স্বাধীনতার পরও প্রায় ১৬ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু ছেলের শেষ ইচ্ছের কথা জানার পর আর কোনো দিনই ভাত স্পর্শ করেননি।
ডালিম হোটেল চট্টগ্রামবাসীর চেখে এক বিভীষিকার নাম; চলতি পথে এখনও ঘৃণাভরে ডালিম হোটেলের দিকে তাকায় সাধারণ মানুষ। নির্যাতনে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরপরাধ বাঙালির কান্নার আওয়াজ যেন এখনও কানে বাজে। ঠিক কতো মানুষকে এখানে নির্যাতন এবং নির্যাতনের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। মীর কাসেমের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বদর এ টর্চার সেলে সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো।
মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনা মোট ১৪টি অভিযোগের মধ্যে শুধু মাত্র ১১ নম্বর অভিযোগে জসিম হত্যার ঘটনায় সর্বোচ্চ সাজার রায়ই বহাল রেখেছিলো। মামলার অন্যতম সাক্ষী মীর কাসেম আলীর হাতে নিহত কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমের দুধবোন হাসিনা খাতুন ভাই হত্যার বিচার পাওয়ার পর জানিয়েছেন: জসিম একজন মায়ের সন্তান ছিলো। তাকে অকথ্য নির্যাতন করে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। ৪৫ বছর ধরে বুকে পাথর বেঁধে রেখেছি। কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের ফরে এ পাথর নেমে গেলো।
মামলার অন্যসকল সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, ড. ইরশাদ কামাল খান, ডালিম হোটেলে নির্যাতিত প্রয়াত সাইফুদ্দিন খানের স্ত্রী নারী নেত্রী নূরজাহান খানসহ সকলের সাক্ষ্যে মীর কাসেম এবং ডালিম হোটেলে তার নেতৃত্বে চালানো নৃশংসতার কথা ওঠে এসেছে।
৭১-এ জসিমের মতো ডলিম হোটেলে আটক এবং নির্যাতনে শিকার জাহাঙ্গীর আলম তার সাক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছিলেন: ‘১৯৭১ সালের ২২ অথবা ২৩ নভেম্বর। শহরের মাদারবাড়িতে কারফিউ ঘোষণা করে বদর বাহিনী। শুরু করে বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধা ধরপাকড়। মাদারবাড়ির নিজ বাড়ি থেকে আমাকে এবং আমার ছোট ভাই প্রয়াত দস্তগীর চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনকে বেঁধে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় বদর বাহিনীর সদস্যরা।
যখন আমাকে টর্চার সেলে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন আমার মা অঝোরে কাঁদছিলেন। আমাকে নগরীর নজির আহমদ চৌধুরী রোডে বদর বাহিনীর টর্চার সেল ডালিম হোটেলে ২৬ দিন আটকে রেখে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। কেবল আমি নই এই ২৬ দিনে কত মানুষকে যে ডালিম হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় তার ইয়ত্তা ছিল না।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে জসিমসহ মোট আটজনকে হত্যার দায়ে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ আদালত তার আপিল আংশিক মঞ্জুর করে ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছে। তবে ১১ নম্বর অভিযোগে জসিম হত্যার ঘটনায় সর্বোচ্চ সাজার রায়ই বহাল রয়েছে।
পাশাপাশি ৪ ও ৬ নম্বর অভিযোগে সাত বছর করে সাজার রায় থেকেও জামায়াতের এই নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে আপিল নাকচ করে ২, ৩, ৭, ৯, ১০ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে মোট ৫৮ বছর কারাদণ্ডের সাজা বহাল রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন একাত্তরের এই বদর নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপারধের মোট ১৪টি অভিযোগ এনেছিল। তার মধ্যে ১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনালের রায়েই খালাস পেয়ে যান কাসেম।









