মিয়ানমারে হতার শিকার অসংখ্য রোহিঙ্গা অধিবাসীদের ৫ টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। সংবাদ সংস্থা এপি’র একটি এক্সক্লুসিভ তদন্ত প্রতিবেদনে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবারে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ২৪ জন বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী ও আক্রান্তদের স্বজনদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এছাড়া হামলা পরবর্তীতে সময় উল্লেখিত মোবাইল ফোন ফুটেজও সরবরাহ করা হয়।
হিসেবে দেখা যায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ওই গণকবরের আশেপাশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ৪০০ জনকে হত্যা করে।
গতবছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) এর একটি হিসেবে অনুযায়ী, আগস্টে জাতিগত নিধন অভিযান শুরু হওয়ার এক মাসের মধ্যেই কমপক্ষে ৬ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী।
এপি’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞগুলোর একটিতে, গা দার পিয়ান গ্রামে একদল লোক ফুটবলের মতো স্থানীয় খেলা ‘চিনলোন’ এর জন্য দল বাছাই করার সময় সেনারা তাদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে।
এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া একজন নুর কাদির পরবর্তীতে দেখতে পায় তার ৬ জন বন্ধুকে পৃথক দুটি গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র শর্টসের রঙ দেখেই মরদেহের পরিচয় শণাক্ত করতে হয়।
গণহত্যাটি আগস্টের ২৭ তারিখ সংঘটিত হয় বলে ধারণা। বেঁচে যাওয়াদের কয়েকজন এপিকে জানায়, সেনারা এই নৃশংসতা গোপন করার চেষ্টা করেছিলো।
এপি’র হাতে আসা ভিডিওতে মরদেহগুলো গোপন করার জন্য এসিড ব্যবহারের ইঙ্গিত দেখা যায়।
অন্যান্য মরদেহগুলো অগভীর কবরে সমাহিত করা হয়। কিন্তু ভারী বর্ষণের কারণে তা অনেকটাই উন্মুক্ত হয়ে পরে। তাই পরবর্তীতে বেঁচে যাওয়ারা নৃশংসতার এই প্রমাণ ভিডিওতে ধারণ করতে সক্ষম হয়।
মানবাধিকার সংস্থার ফিল রবার্টসনের মতে, এই প্রতিবেদনটি মিয়ানমারকে জবাবদিহি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ আবশ্যক করেছে। মিয়ানমারের উপর জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয়তাকেও জোড়ালো করেছে প্রতিবেদনটি।
“এপির এই প্রতিবেদন দেখা যায়, গা দিয়ার পিন গ্রামের এই হত্যাযজ্ঞে মরদেহ বিকৃত করতে এবং শণাক্তকরণ প্রক্রিয়া আরও জটিল করতে সেনারা এসিডের কন্টেইনারসহ আসে। আর তা মারাত্মক অপরাধের জোড়ালো প্রমাণ, এছাড়াও এই নৃশংসতা যে পূর্বপরিকল্পিত তাও নির্দেশ করে।”
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কমান্ডারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও অপরাধে দায়ী সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এখনই গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন রবার্টসন।
এর আগে অবশ্য মিয়ানমার একটি গণকবরের বিষয়ে নিজেদের দায় স্বীকার করেছিলো। ইন দিন গ্রামের সেই গণকবরে ১০টি মরদেহ পাওয়া গিয়েছিলো। ওই হত্যাকাণ্ডটি সেপ্টেম্বরে সংঘটিত হয়। কিন্তু ডিসেম্বরে গণকবরটি প্রকাশ হয়ে পড়লেই শুধু কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করে নেয়। তবে মিয়ানমারের দাবি নিহতদের সকলেই ‘সন্ত্রাসী’।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ডিসেম্বরের সেই গনকবর উন্মোচনের ঘটনাকে শুধুমাত্র ‘সামান্য নজির’ বলে অভিহিত করে।
গত বছরের আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের মুখে ৬ লাখ ৫৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ একে ‘পাঠ্যবইয়ে উল্লেখযোগ্য গণহত্যা’ বলে অভিহিত করে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের লড়াই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে। কিন্তু বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বর্ণনাতে গণহত্যা, ধর্ষণ, এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংসতার সাক্ষ্য পাওয়া যায়।
সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি চুক্তিতে সম্মত হয় দেশদুটি। এই প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের সাময়িকভাবে একটি হোল্ডিং সেন্টারে গ্রহণ করবে মিয়ানমার, যাকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা অনেকেই অভিহিত করেছে‘ বন্দি শিবির’ হিসেবে।
বিশ্বের সবচেয়ে নিপিড়িত সংখ্যালঘু হিসেবে অভিহিত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না মিয়ানমার সরকার। যদিও মিয়ামনারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা বসবাসের হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে।







