হানিফ মোহাম্মদ, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম ও ইনজামামুল হকরা যা পারেননি সেই অসাধ্য কাজটাই করেছেন মিসবাহ-উল হক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জিততে তিনি তার দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই কঠিন পথ চলায় সময়ে মিসবাহ’র সতীর্থদের মধ্য অবশ্যই একনম্বরে থাকবেন ইউনিস খান।
এই টেস্টের মধ্যদিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান মিসবাহ-ইউনিস। এমন টেস্টে পাকিস্তান বিজয়ী করে টেস্ট ক্রিকেট নিজেই নিজেকে পুরস্কৃত করার রাস্তা খুলে নিয়েছে।
শেষ টেস্টে মিসবাহ ও ইউনিস শনিবার যখন মাঠ থেকে বেরিয়ে যান তখন তাদের গার্ড অব অনার দিয়ে স্বাগত জানানো হয় এবং তাদের সার্ভিসের জন্য প্রশংসা করা হয়।
তাদের নিখুঁত কেরিয়ারের সময় উভয় খেলোয়াড়ই অসংখ্য রেকর্ড ভাঙ্গা-গড়া করেছেন। অন্য দলের বিপক্ষে অনন্য সব জয় পেয়েছে পাকিস্তানে ক্রিকেট।
ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে মিসবাহর ব্যাট থেকে আসে ২ রান। আর ইউনিস খান করেন ৩৫। কিন্তু মিসবাহ আর ইউনিসের পুরো ক্যারিয়ার দেখলে দুজনের এই দুটি ইনিংসের কথা কে আর বলবে। একজন অসামান্য অধিনায়ক অন্যজন অতুলনীয় ব্যাটসম্যান।
বিদায়ী টেস্টে পাকিস্তান না জিতলেও মিসবাহ-ইউনিস কিন্তু সত্যিকারের বিজয়ী। তাদের মনে রাখবে পাকিস্তানের ক্রিকেট? মিসবাহকে পাকিস্তান মনে রাখবে দারুণ এক নেতা হিসেবে। কয়েক দিন আগে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি শাহরিয়ার খান তো বলেছেন, অধিনায়ক হিসেবে ইমরান খানের চেয়েও এগিয়ে মিসবাহ।তার পরিসংখ্যানও সেই সাক্ষ্য দেয়।
২০১০ সালে পাকিস্তান দলের ভীষণ দুঃসময়ে ধরেছিলেন হাল। স্পট ফিক্সিংয়ের কারণে দেশটির ক্রিকেট তখন টালমাটাল। সেই সময়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই অনেকটা গোপনেই মিসবাহর কাঁধে দায়িত্ব দিয়েছিল পিসিবি। নিজের পরিবারের কাছেই প্রায় এক সপ্তাহ খবরটা গোপন রাখেন মিসবাহ।
৪২ বছরের মিসবাহ ডমিনিকা টেস্টের আগে ক্যারিয়ারে ৫ হাজার ১শ ৬১ রান করেছেন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৪৮ রানই করেছেন ৩৫ পেরোনোর পর। ক্যারিয়ারে খেলা ৭৫ টেস্টের ৫৬টিতেই অধিনায়ক। দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি টেস্টজয়ী (২৬টি) অধিনায়ক তিনিই। ছাড়িয়ে গেছেন ২৩ টেস্টজয়ী ক্লাইভ লয়েডকে। পাকিস্তানকে টানা ৫৬ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সময়ের হিসাবে যেটা ৬ বছর ১৭৫ দিন।
তার পরেই ইমরান খান ৫ বছর ৩১৪ দিনে পাকিস্তানকে টানা ৩৪ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইমরান। পাকিস্তানের দুঃসময়ে ব্যাট হাতেও মিসবাহ দাঁড়িয়ে গেছেন হিমালয়ের মতো। ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে ১০টি সেঞ্চুরিসহ ৪৬ দশমিক ৬২ গড়ে করেছেন ৫ হাজার ২২২ রান।
পাকিস্তানের ক্রিকেটে অমর হয়ে থাকবেন ইউনিস খানও। তার অধিনায়কত্বের মুকুটে জ্বলজ্বল করে ২০০৯ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়। ১৯৯২ সালে ওয়ানডের বিশ্বকাপের এটিই পাকিস্তানের বড় কোনো বৈশ্বিক শিরোপা।
তবে নেতৃত্বের জন্য নয়, ইউনিসকে ক্রিকেট-বিশ্ব মনে রাখবে একজন ‘গ্রেট’ ব্যাটসম্যান হিসেবে। হানিফ মোহাম্মদ, জাভেদ মিয়াঁদাদ বা জহির আব্বাসকে পাকিস্তানের সেরা ধরলেও কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে ১০ হাজার রান করা প্রথম পাকিস্তানি ক্রিকেটার তো ইউনিসই। ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন ছয়টি। আছে ট্রিপল সেঞ্চুরিও। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন একটি জরিপে দেখিয়েছে, সবাইকে ছাড়িয়ে ইউনিসই এক নম্বরে। ভোট দাতাদের ৯৫ শতাংশই ভোট দিয়েছেন এই পাঠানের পক্ষে।
দুই কিংবদন্তির বিদায় ম্যাচে মাঠে নেমেছিল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। দুই পাকিস্তানি ক্রিকেটারের জন্য বার্তা ও অভিনন্দন জানায় বার্তা সংস্থাগুলো। অভিনন্দন জানিয়েছেন তাদের পাকিস্তানের বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটাররাও।

বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান ফাওয়াদ আলম বলেন, ‘আপনাদের সাফল্য এবং মহান ক্যারিয়ারের জন্য মিসবাহ ও ইউনুস ভাইকে ধন্যবাদ। ‘মিস ইউ’।
স্পিনার আবদুর রেহমান বলেছেন, ‘ইউনিস এবং মিসবাহ ভাই আপনাদের সবসময় মিস করবো। তারা শুধু কিংবদন্তি নয়, অনেক ক্রিকেটারের জন্য অনুপ্রেরণা এবং রোল মডেল! আসল লিজেন্ডস।’
সাবেক কোচ ওয়াকার ইউনুস বলেন, মিসবাহ এবংইউনিসের অবসরে তাদের চমৎকার অর্জনসমূহের জন্য অভিনন্দন জানা্ই। তাদের দেয়া বিনোদনের জন্যও ধন্যবাদ।’
দুই গ্রেটকে অভিন্দন জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন, সাঈদ আজম, মোহাম্মদ রিজওয়ান, খুররম মঞ্জুর, সোহেল খান, বিলওয়াল ভাট্টি, এহসান আদিল ও আদনান আকমল।
মিসবাহ-ইউনিসকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন। তিনি বলেন, ইউনুস খান এবং মিসবাহ উল হকের প্রতি অনেক অনেক শ্রদ্ধা। তারা গ্রেট খেলোয়াড় এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ হল মহান মানুষ।’
এই দুজন সম্পর্কে পাকিস্তানের সাবেক স্পিন লিজেন্ড মোস্তাক আহমেদের মন্তব্য, ‘দুইজন যোদ্ধা, দুই বন্ধু এবং দুইজন মানুষ যারা বিপদ-আপদে পাকিস্তানের পাশে ছিল। তাদের শ্রদ্ধা জানাই, উই মিস ইউ।’
নেতা ও ব্যাটসম্যান, এই দুজনকে একসঙ্গে হারানোর ধাক্কা সামলে উঠতে পাকিস্তানকে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে সেটা সময় বলবে। শুধু পাকিস্তান নয়, তাদের হারানোর আক্ষেপ করবে বিশ্ব ক্রিকেটও। আর সেই আক্ষেপ কতটা, সেটা স্পষ্ট হয় ডমিনিকার জায়ান্ট স্কিনে যখন ভেসে উঠল ‘মিসবাহর ‘মিস’ ও ইউনিসের ‘ইউ’ মিলিয়ে ‘মিস-ইউ’!










