একটি তৈলচিত্রের দাম বাংলাদেশের টাকায় প্রায় ২৯০ কোটি টাকা ভাবা যায়! জীবিত শিল্পীদের মধ্যে জার্মান চিত্রশিল্পী গেরহার্ড রিখটার আর সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেন তার তৈলচিত্রে মিলান ক্যাথেড্রাল স্কয়ার দিয়ে। সম্প্রতি এ শিল্পকর্মটি নিউইয়র্কের নিলামকারী প্রতিষ্ঠান সাদাবি’স বিক্রি করেছে ২ কোটি ৪৪ লাখ পাউন্ডে। এর আগেও গেরহার্ডের ‘অ্যাবসট্রাক্টস বিল্ড’ ছবিটি ২ কোটি ১৩ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল। ১৫ বছর আগে মিলান ক্যাথিড্রাল স্কয়ার শিল্পকর্মটির লন্ডনে এর দাম উঠেছিল ২৩ লাখ পাউন্ড যা তখনকার দিনে রেকর্ড করেছিল।
তখন নিলামকারী প্রতিষ্ঠান সাদাবি’স ছবিটি বিক্রি না করে রেখে দিয়েছিল। ১৫ বছর পর সাদাবি’স ছবিটি বিক্রি করে তার লাভ গুনলো সুদে-আসলে। ৮১ বছর বয়স্ক রিখটারকে শিল্পবোদ্ধারা বিশ্বের জীবিত শিল্পীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠশিল্পী হিসেবেও আখ্যায়িত করছেন। রিখটারের এই ছবিটিকে বিংশ শতকেরর শিল্পকলার একটি অনন্য নমুনা এ রকম অভিধায় অভিষিক্ত করে বলা হচ্ছে এটিগত শতকের ফটো পেইন্টিং রীতির প্রতীক।
মিলান ক্যাথিড্রাল স্কয়ার তৈলচিত্রটি ডোম প্লাজ, মেইল্যান্ড নামেও সমধিক পরিচিত। প্রথমে এ ছবিটা দেখে যে কেউই ভাববেন, আরে! এ আবার কেমন তৈলচিত্র, ঝাপসা আর ঘোলাটে! কিন্তু ছবিটিতে ভালো করে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে (চিত্রকর্ম দেখার এ এক অলিখিত নিয়ম) আপনার সেই ভ্রম কাটবে। 
অনেকক্ষণ দেখার পর আপনার সামনে তখন আস্তে আস্তে করে স্পষ্ট হতে শুরু করবে, ঝাপসা আলোকচিত্রের কায়দায় গেরহার্ড রিখটার এক অসাধারণ ফর্মে একটি পরিপার্টি নগরের দৃশ্য এঁকেছেন। আবার কারো কারো কাছে ছবিটি শীত-সকালে জমাটবাঁধা পুকুরের নিস্তরঙ্গ পানির মতোও মনে হতে পারে। ছবিতে যেন প্রাণের কোনো স্পন্দন নেই। পুরো ক্যানভ্যাস জুড়ে কেমন একটা ‘ফ্রিজ-ফ্রিজ’ ভাব। কিন্তু ছবিটি অভিনিবেশ সহকারে দেখলে তা ভুল বলে প্রমাণিত হবে। একটা ঝাপসা, ম্যাড়ম্যাড়ে আলোকচিত্রের আদলে তৈরি করা তৈলচিত্রের ভেতর যে জলজ্যান্ত নগরীর প্রাণ ভোমরাকে ফুটিয়ে তোলা যায় সেটা রিখটার গেরহার্ড বেশ ভালো করেই দেখিয়ে দিয়েছেন।
দুই.
মিলান ক্যাথিড্রাল স্কয়ার গেরহার্ডের এই ছবিটি যখন সংবাদ মাধ্যমে এলো তা দেখে তখন আমার মধ্যে এক অন্য ধরনের অনুভূতির তোলপাড় তুলল। আর আমার মনে হলো, আরে! এই ছবি আর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড তো আমার বহুদিনের চেনা। মিলান ছেড়ে দেশে এসে থিতু হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। ভুলেই গিয়েছিলাম আমার প্রিয় মিলান শহর। আমার অতি পরিচিত শহর মিলান।
জীবন-জীবিকার তাগিদে এই শহর আমাকে প্রায় ১০ বছর থাকার জায়গা করে দিয়েছিল। কাজ (বিদেশ বাড়িতে ‘কাজ’ করাকে ‘কামলা’ দেয়া বলা হয়) দিয়েছিল। কখনো কখনো এ শহর আামকে বেকারও রেখেছিল নির্বিকারভাবে। মিলান সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে খুব কাছের এক মহল্লায় (ইতালিতে মহল্লাতে বলে জোনা) আমি থাকতাম। দ্রুত মহল্লা পাল্টানোতে সুনাম ছিল বলে বেশ কয়েক মহল্লায় আমার থাকা হয়েছে যার সবই মিলান সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছাকাছি।
শহরের প্রাণকেন্দ্রের কাছাকাছি, লোকজনের ভিড়ে, কলরবের স্রোতে থাকার মজাই আলাদা। আর উপশহরে সুবিধা হলো যখন খুশি বাস, মেট্রো, ট্রেন, ট্রাম সবকিছুতেই উঠে পড়া যায়। শহরের বাইরে গেলে বাসের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। যে কারণে শহর ছেড়ে কেউ খুব একটা বাইরে যেতে চান না। শহরে কাজ থাকে। পয়সা থাকে। রঙিন আলোও থাকে।
মিলান ক্যাথিড্রাল স্কয়ার ছবিটি আসলে যে এলাকায় তার আশপাশে অনেক বিখ্যাত জাদুঘর, বাড়িঘর, অফিস-আদালত, চিত্রশালা, গ্যালারি, গির্জা, পালাৎসো, ব্যবসাকেন্দ্র, পিয়াজ্জা, ঐতিহাসিক স্থান, পর্যটনকেন্দ্রও আছে। তবে ক্যাথিড্রাল স্কয়ার বলতে সাধারণত যে জায়গাটুকুকে বোঝানো হয় সেই এলাকার বহু পরিচিত নাম হলো দোমো। ইতালিয়ান ভাষায় উচ্চারিত হয় পিয়াজ্জা দেল দুমো (P.ZA DEL DUOMO)|
সাধারণত ইতালিতে বসবাসরত বৈধ-অবৈধ বাঙালিদের বেশিরভাগই শহরে থাকেন বা থাকার চেষ্টা করেন। আমি যে মহল্লায় বেশি সময় ধরে থেকেছি তার নাম ভিয়া ক্রেসপি। মিলানোতে গিয়ে আমি প্রথম ভিয়া (রাস্তার নাম ভিয়া) কার্লোফারিনির এক বাসায় উঠেছিলাম। ভিয়া ক্রেসপি স্টেশনের পাশেই।
ক্রেসপির ঘরে শুয়ে আমি মিলান সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে দূর-দূরান্তের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের শব্দ শুনতে পেতাম। কাজকর্ম না থাকলে কিংবা বেকার থাকার কল্যাণে যখন হাতে অফুরন্ত সময় থাকত তখন এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতাম। মেট্রো-বাস-ট্রামের জন্য ৩০ ইউরোর মাসিক টিকেট (বিলিয়েত্তি মেনসিলে) থাকার কারণে সেটারও সদ্ব্যবহার করতাম উপর্যুপরি কিংবা যাচ্ছেতাই ভাবে। বেকারত্বের সেসব দিনে বিশেষ করে রাতেরবেলা দোমো যেতাম। দোমোর বিশাল বিশাল স্থাপনা দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
দোমোর আশেপাশে সারি সারি ভবন। বাণিজ্যিক কার্যালয়। ফ্যাশন প্যারেডও হয় দোমোতে। গান-বাজনা, বিপ্লবী সমাবেশও হয়। দোমো-র সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা। সেখানে পর্যটকদের ভিড় বছরজুড়ে। আমার বেশি ভালো লাগত খোলা জায়গায় একটা ঘোড়ার স্কাল্পচার। ঘোড়ার ওপরে সাহসী এক যোদ্ধা। দোমোর সিঁড়িতে বসে রাজ্যির দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে আমি নির্বিকার তাকিয়ে থাকতাম সেই ঘোড়ার দিকে। মাসখানেক বেকার থাকার পর একসময় পত্রিকা বিলি করার একটা কাজ পেলাম। বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা তিন ঘণ্টার কাজ। প্রতিঘণ্টা চার ইউরো। মেট্রো, সিটি দুটো নাম করা ট্যাবলয়েডের সান্ধ্য সংস্করণ বিলি করার কাজ। আর এসব পত্রিকা বিলির কাজ মেট্রো রুটেই হয়।
সাধারণত অফিস-ফেরতা মানুষ বিনে পয়সায় পত্রিকা নিয়ে মেট্রোতে ওঠে। তারপর পড়া শেষ হলে মেট্রো থেকে উঠে যাওয়ার সময় ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। আমাকে দেয়া হলো মন্তে নেপোলিয়নে বলে এক অভিজাত এলাকায়। চারটা বাজার আগেই পত্রিকার বান্ডিল এসে পড়ত। পত্রিকার ছয় বান্ডিল (প্রতি বান্ডিলে একশ কপি) আমাকে বিলি করতে হতো। আমি করতাম কী মেট্রোর মুখে যে সিঁড়ি তার দেয়ালে পত্রিকার বান্ডিলগুলো খুলে রাখতাম আর হাতেও কিছু কপি রাখতাম।
ইতালিয়ানদের মধ্যে অভিবাসীদের সঙ্গে কথা না বলে হাসি বিনিময় করে কথার পর্ব সেরে নেয়ার একটা দুর্লভ গুণ আছে। সন্ধ্যা ছয়টা সাড়ে ছয়টার মধ্যে পত্রিকা বিলির কাজ শেষ হয়ে যেত। তারপর আধা ঘণ্টা সময় কোনোমতে পার করে আমি দোমো চলে যেতাম। মন্তে নেপোলিয়ন থেকে দোমো হেঁটে যেতে সময় লাগে মিনিট পাঁচেক। কাজ শেষ হলে আমার অবধারিত গন্তব্য হয়ে পড়ত দোমো।
দোমোর মূল ভবনের সামনে ধাপে ধাপে লম্বা সিঁড়ি। সিঁড়ি পেরুলে খোলা প্রান্তর যেখানে শত শত মানুষ। শত শত কবুতর। আর কী আশ্চর্য! কবুতরগুলো দেখতে অবিকল আমাদের দেশের জালালী কবুতরের মতো। এসব কবুতর ঘুরে বেড়ায় নির্জন প্রান্তরের এখানে ওখানে। দোমো-তে ঘুরতে আসা পর্যটকরা এসব কবুতরকে গম খেতে দেয়। দোমো-র খোলা প্রান্তরে জালালী কবুতরের মতো দেখতে এসব কবুতর দেখে প্রথমে আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ইতালিতেও জালালী কবুতর! পরে আরো অবাক হয়েছি এসব কবুতরদের গম খাওয়াবার বিষয়টি নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ দল আছে যাদের ছাড়া অন্যদের দোমো-তে প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ। পর্যটকরা এলে গম সাপ্লাই, বিক্রি এবং পর্যটকদের কবুতরকে গম খাওয়ানোর ছবি তোলার ব্যাপারটাও এরা বেশ কঠোরভাবে দেখভাল করে।
দোমোর আশপাশের বিশাল চত্বরকে কেউ কেউ মিলান ক্যাথিড্রাল স্কয়ারও বলে থাকেন। এই ক্যাথিড্রাল স্কয়ারকে কেন্দ্র করে এর সামনে পেছনে অনেক সংস্কার করা হয়েছে মূলত পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। এই সংস্কার বছরের পর বছর ধরে চলছে। ইতালির বাড়িঘর তৈরি হয় পুরনো ধাঁচে। দেখলে মনে হবে বাড়িটি বুঝি অনেক আগের।
অনেক রাত অবধি দোমোর সিঁড়িতে বসে বসে রং বাহারি মানুষ দেখেছি। তাদেরকে কারণে-অকারণে বিস্তর পয়সা খরচ করতে দেখেছি। জন-অরণ্য দেখেছি। দোমোর আশপাশে অনেক ছোট ছোট গলি-উপগলি এসে মিশেছে। সন্ধ্যার পর মানুষজন এসব অলিতে-গলিতে উপচে পড়ে। তখন ক্যাফে, বার, ডিসকোটেকা, রেস্তোরাঁতে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পত্রিকা বিলি করে ২২ দিনে যা পেতাম তা দিয়ে থাকা-খাওয়ার খরচ কোনো রকমে চলে যেত। ফলে অভাব-অনটন লেগে থাকত। সিগারেট আর কফি খেতে হতো গুনে গুনে।
মিলান ক্যাথিড্রাল স্কয়ারের সিঁড়িতে বসে কিংবা এর আশপাশের অলি-গলিতে ঘুরতে ঘুরতে আমি প্রায়ই নিজেকে আবিষ্কার করতাম পুরনো ঢাকার অলি-গলিতে। আমার অনেক কর্মহীন দিবস, উদ্বাস্তু জীবন আর হতাশা-বেদনা-আশাহত হওয়ার রাজসাক্ষী দোমো। আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বলতার কেনো কমতি নেই এই স্কয়ারের। শিল্প রসিকরা যতই গেরহার্ড রিখটারের তৈলচিত্রকে ঝাপসা দেখেন তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







