বৈষম্য আর পার্থক্য এক নয়। প্রকৃতিতে পার্থক্য থাকবেই কিন্তু গোল বাঁধে যখন সেই পার্থক্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বৈষম্যের। আবার অতিসচেতন অনেকে বৈষম্য ঘোঁচাতে গিয়ে পার্থক্য ঘোঁচাতে উঠেপড়ে লাগি। যার সাম্প্রতিকতম একটি উদাহরণ নারীবাচক শব্দের উচ্ছেদ।
সভ্যতার সূচনালগ্নে গর্ভধারণের অজুহাতে সভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিস্কার কৃষির আবিস্কারক নারীকে একদা যে গর্ভধারণের অসুস্থতার অজুহাতে গৃহবন্দী করা হয়েছিল সে বন্দীদশা থেকে আজও নারী মুক্ত হতে পারেনি। নারীর একদার সেই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে আজকের নারীবাচক শব্দ কেড়ে নেওয়ার বিন্দুমাত্র পার্থক্য দেখি না।
নারীদের সমঅধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতায় অনেকেই একে সাধুবাদও জানিয়েছেন। আমি হয়তো অতখানি প্রাজ্ঞসর হতে পারিনি বলেই পোষণ করতে পারিনি এর সঙ্গে একাত্মতা। সমঅধিকার মানে আমার কাছে পুরুষ হয়ে ওঠা নয়, আমি চাই নারী হিসেবেই আমার পূর্ণ অধিকার পেতে, আমার মানবিক অধিকার পেতে।
নারীবাচক শব্দের যদি এরূপ বিলুপ্তি ঘটে তাহলে একদিন অভিধানের পাতা থেকে মুছে যাবে আমাদের মহিয়সী, গরিয়সীরা। কিন্তু তার বিপরীতে অসতী, পতিতা, বেশ্যা, কুলটা শব্দগুলো বহাল তবিয়তেই বেঁচে থাকবে। আর শতবছর পর মহান, গরিয়ানদের কল্পনায় মাদার তেরেসা, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, বেগম রোকেয়ার অবয়ব সহসাই ভেসে না উঠলেও পতিতা, অসতী, বেশ্যা বলতে কোন নারীর অবয়বই ভেসে উঠবে। নারী হয়ে উঠবে তখন এসবেরই প্রতীক। কারণ এর বিপরীতে কোন পুরুষবাচক শব্দ তৈরি হবে না কখনই। পুরুষ কখনই পতিত হবে না। পুরুষের কখনই সতীত্ব হারাবে না।
আর তাই প্রশ্ন জাগে মনে, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠাই যদি এর লক্ষ্য হয় তবে উভয়বাচক শব্দে কেন শুধু পুরুষবাচক শব্দই গ্রহণ করা হবে, কোন নারীবাচক শব্দ কেন গ্রহণ করা হবে না? কোন পুরুষ যদি আজ তার সম্বোধনে ব্যবহৃত মহোশয়া, জনাবাৎ, ম্যাডাম ইত্যাদি সম্বোধনের একটিকেও স্বাগত জানায়, সানন্দচিত্তে গ্রহণ করে আমি হাজারটা পুরুষবাচক শব্দকে ধারণ করতেও রাজি আছি। আমি আমার এই লেখাটিকে প্রত্যাহার করে নিতে রাজি আছি। আর যদি তা না হয় তাহলে আমি কেন মহাশয়, জনাব, স্যার শব্দকে গ্রহণ করবো! ব্যাপারটা মনে হয়, নারীর আসলে নিজস্ব কোন অধিকার নেই। অতএব সেটা তাকে পেতে আগে পুরুষ হয়ে উঠতে হবে। কিংবা দয়ার দান গ্রহণ করতে তাকে যতটুকু ত্যাগ করার সেটুকুতো করতেই হবে!
না, সমঅধিকারের প্রশ্নে আমি পুরুষের সমকক্ষ হতে চাই না, আমি নারী হিসেবেই আমার পূর্ণ অধিকার চাই। পুরুষ যেমন তার শিশ্ন নিয়েই মানুষের অধিকার পেয়ে আসছে, আমি আমার স্তন কিংবা যোনী নিয়েই মানুষের পূর্ণ অধিকার পেতে চাই। প্যান্ট, শার্ট, ব্রেসলেট, জিপার ধারণ করে নয়, আমি আমার শাড়ি, চুড়ি, টিপ,কাজলেই মানুষের অধিকার চাই। মানুষের অধিকার পেতে আমি পুরুষ হয়ে উঠতে চাই না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






