“ফ্রি কার ওয়াশ”। স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের একদল দুই রাস্তার মাঝখানে আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড ঝাঁকিয়ে চলছে। আরেকদল কিশোর-কিশোরী হৈ হৈ রৈ রৈ করে খানিক দূরে খোলামেলা জায়গায় লাইন ধরা গাড়ি পর্যায়ক্রমে পরিস্কার করে চলছে। আমি গাড়ি স্লো করতেই দুই কিশোর-কিশোরী ছুটে এল।
জিজ্ঞেস করলাম “ফ্রি কেন?” বালিকাটি ফিক করে নিষ্পাপ মিষ্টি হাসি হেসে উঠল। বেকুবের মত প্রশ্ন করে আমিই বিব্রত। তাই দেখে ছেলেটি পোপের মত গাম্ভীর্য নিয়ে বুঝাতে লাগল “ফ্রি এ’জন্য যার কাছে ক্যাশ নাই সে তো কোনো অপরাধ করেনি। তারও এই সেবাটি পাবার অধিকার আছে। এবার সিরিয়া হতে অনেক ইমিগ্রান্ট এসেছে। তাদের জন্যই চ্যারিটি করছি; তাদের টাকা-পয়সার এমনিতেই টানাটানি, তারা এই সুযোগটি ফ্রি পেলেই আমরা খুশি!
ঘটনাটি ২০১৭ সালের জুন মাসের দশ তারিখের। আগে “কার ওয়াশ ফান্ডরেইজার” প্ল্যাকার্ড দেখতাম। তাই ‘ফ্রি’ শব্দটি দেখে না বুঝেই হুটহাট বেকুবি করে বসেছি। ছেলেটি বলে চলল “ফ্রি” হলেও মোটামুটি ৯৫% মানুষই কমবেশি যা-ই পারুক ডোনেইট তো করছেই! ধরো তুমিও ডোনেইট করতে চাচ্ছো কিন্তু ক্যাশ নাই। অসুবিধা কি! আমাদেরকেই পরিশোধ করছো ভেবে পরে সুযোগ মত অন্য কোথাও দান করে দিও! একই তো কথা!
কানাডার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা গরমকাল জুড়ে এভাবে অন্যের গাড়ি ধুয়ে দিয়ে, বাড়িবাড়ি চকোলেট বেচে, শপিং মলের সামনে বাদ্যযন্ত্রসহ গান গেয়ে মানবসেবা তহবিল সংগ্রহ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের বাড়ির সামনে-পিছনের ঘাস কেটে দিয়ে, বাড়ির কাঁচের জানালা ধুয়ে দিয়ে, ঘরের দেয়ালে রঙ করার কাজ করে তহবিল জোগাড় করে।
আঁকিয়ে ছবি-পেইন্টিংস বিক্রি করে। হস্তশিল্পে ছাত্রছাত্রীরা হাতে বানানো বিচিত্র ধরণের ঘরোয়া হস্তশিলপ ও গ্রিটিংস কার্ড বিক্রি করে তহবিল জোগায়। সেই তহবিল ব্যবহার হয় পৃথিবীময় দুর্ভিক্ষ-খরাপীড়িত শিশুদের জন্য; যুদ্ধাহত, গৃহহীন, সহায়-সম্বলহীন মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য। ভলান্টিয়ারিংও শিক্ষার অংশ। প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে উচ্চশিক্ষা নিতে হলে, চাকুরিবাকুরি পেতে হলে, বৃত্তি ও শিক্ষাঋণ পেতে হলে ঘন্টা-সপ্তা-মাস-বছরের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের অভিজ্ঞতা দেখাতে হয়।
সব সেবা-সংস্থারই স্বেচ্ছাসেবা বিভাগ থাকে। সেগুলোতে এমনই উপচে পড়া ভীড় থাকে যে ভলান্টিংরিং করতে হলে অনেক আগে থেকে নাম তালিকাভূক্ত করতে হয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষমান থাকতে হয়। শুধু গ্রীষ্মেই নয় শীতকালেও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের কমতি থাকেনা। স্কুল ছাত্রছাত্রীরা চলৎক্ষমতাহীন বয়োবৃদ্ধদের বাড়ির ড্রাইভওয়েতে জমে উঠা বরফের স্তুপ পরিস্কার করে দেয়।
এই জানুয়ারিতেই মাইনাস ৩০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় আমার দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া কন্যা এক বয়োবৃদ্ধ দম্পতির ড্রাইভওয়ের বরফ পরিস্কার করতে গিয়েছিল। তার আগে দুইদিন ধরে প্রস্তুতি। ঠিকানা তল্লাশে পুরো এলাকা চষে শেষমেষ বাড়িটি খুঁজে পেল। বুড়োবুড়ি বাড়ি নাই। হয়তো তারা ভুলেই গেছে একজনের ড্রাইভওয়ে পরিস্কার করতে আসার কথা।
মানবিক শিক্ষা কানাডায় শিক্ষা কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিদ্যালয়ে মানবিক শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। শিখতে হয়ে হাতে-কলমে। মাঠে।
সরাসরি ছাত্রছাত্রীরা যা করে সত্যিকার অর্থেই মন-প্রাণ-অন্তর ঢেলে আনন্দের সঙ্গে মানবিক দায়িত্ব শেখে ও প্রয়োগ করে। লক্ষ্যনীয় যেসব প্রদেশে সমাজবাদী রাজনৈতিক দল জনপ্রিয় সে’সব প্রদেশে মানবিক শিক্ষা চর্চা বেশি হয়। ম্যানিটোবায় (যে প্রদেশে থাকি) ১৯৮৯ হতে ২০১৫ পর্যন্ত দীর্ঘ ষোল বছর সমাজবাদী নিউ ডেমক্র্যাটিক পার্টি ক্ষমতায় থাকায় ফলে স্কুলভিত্তিক সামাজিক-মানবিক কর্মকাণ্ড অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান।
ছাত্রছাত্রীরা গাড়ি ধোয়া, ঘাস কাটা বা ক্যান্ডি বিক্রিকে নীচু কাজ কিংবা দায় বা উটকো ঝামেলা ভাববে এমনটির প্রশ্নই উঠে না। আমার কন্যার মহাপ্রস্তুতিতে, দু’একদিন আগে হতে আমাদের বলে কয়ে প্রস্তুত রাখার আন্তরিকতার মধ্যেও একই মানবিক দয়িত্ববোধটুকুই দেখেছিলাম।
বাংলাদেশে কি হয়? শিক্ষিত জনের মুখে ‘এখনকার ছেলেপেলেরা পড়াশোনা করে না’ কথাগুলো শুনতে অস্বস্তি হয়। তাদের “পড়াশোনা” শব্দ বলার শরীরি ভাষাই বলে দেয় তারা ‘টেবিল-চেয়ারে বসা’ বুঝাচ্ছেন। যদিও শিক্ষায় পাঠ্যবই ও টেবিল-চেয়ারের চাইতে বাইরের জগতের অবদানই বেশি। মাঠের ধান-পাট কি টেবিল-চেয়ারে ফলানো যায়? যায়না। তাহলে কৃষিবিদ্যা বা ধান-পাট চাষবিদ্যা সোজা কথা মাঠের পড়াশোনাও টেবিলে-চেয়ারে হবার নয়!
বিজ্ঞানের মানুষজন কেউ কেউ ‘পড়াশোনা করেনা’ অনু্যোগ-অভিযোগ দ্বারা প্রায়শই বুঝাতে চান যে ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে না। অনেকেরই আচরণ এমন ধারণা দেয় যেন শুধুমাত্র বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিতরাই মেধাবী। তারাই আদর্শ যেন তাদের মত না হতে পারলেই সব গ্যালো! যেন বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিতদের কেউ দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোর-ডাকাত-অপরাধী হয় না।
তার চেয়ে বড় সমস্যা বাংলাদেশের স্কুল শিক্ষায় বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক নামক তিনটি অনাবশ্যক বিভাজন আছে, এবং অনেকের ভাবনা এমন মানবিক শিক্ষা তো শুধু মানবিক বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা চর্চা করবে। এই কুচিন্তার জগদ্দল পাথরটি সরানো অত্যাবশ্যক। মানবিক শিক্ষা সকলের জন্য অত্যাবশ্যক না করা হলে এই জগদ্দল পাথর এক চুলও নড়বে না।
আশ্চর্য হবার মত বিষয় তারা মানবিক শিক্ষা বা মানবিকতা শিক্ষাও যে আসলে এক ধরণের মানবিক-বিজ্ঞান বা বিজ্ঞান-শিক্ষাই সেকথা বলেন না। আরো আশ্চর্যের বিষয় তারা “বিজ্ঞানসম্মত” শব্দটি ব্যবহার করেন না।
অনেকেই দেখি “বিজ্ঞান শিক্ষা” এবং “বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা” ধারণা দু’টি যত্রতত্র প্রচার করেন। তারা বুঝেন না যে দু’টি ধারণাই অযাচিত উন্নাসিক ও বৈষম্যমূলক।
শিক্ষামন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী সবাই জিপিএ চার-এর পরিসংখ্যানে এতটাই আসক্ত ও আচ্ছন্ন যে তাদের মুখে কখনো এই প্রশ্ন আসেননা মানবিক ও মানবিকতা শিক্ষায় আমাদের অবস্থান কোথায়? অনিঃশেষ দুর্নীতি-অপনীতি-অপকর্ম ও নীতি-নৈতিকতাহীনতায় বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যায় বিশ্বজুড়ে এমন দেশ এখন আর খুব বেশি নাই।
কখনো প্রশ্ন করেন না এসব কমিয়ে আনায় শুধুই বিজ্ঞানমনস্কতা আর ডিজিটাল-মনস্কতা আসলেই কতটা কার্যকরী! অনেকে বলবেন, বাংলাদেশ কানাডা নয়। কথায় কথায় কানাডা টেনে আনা কেন? বাংলাদেশ অবশ্যই কানাডা নয়। কানাডার আদলে বাংলাদেশের স্কুল ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে গাড়ি ধোয়ানোর কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। কানাডাকেও টানা হচ্ছে না। উদাহরণে কানাডা নয় মানবিক শিক্ষার প্রকৃত দর্শন ও উদাহরণ টানা হচ্ছে। মানবিক শিক্ষার কোনো আমেরিকা-এশিয়া হয় না।
বাংলাদেশে কানাডার চেয়ে ঢের বেশি মানবিক শিক্ষা প্রয়োগের জায়গা আছে। স্কুলগুলো কারিকুলামের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মানবিক শিক্ষা দিতে পারে কীভাবে গ্রুপ প্রজেক্টের মাধ্যমে গৃহকর্মীদের গৃহশিক্ষক হবে, গৃহকর্মীর প্রতি দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে যেসব সংস্থা কাজ করছে সেগুলোসহ বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার, হেলথ ক্যাম্প, টিকাকেন্দ্র এই সমস্ত জায়গায় স্বেচ্ছাসেবা দিতে পারে। কানাডার মত উপরের ক্লাসের ভালো ছাত্রদের নীচের ক্লাসের দুর্বল ছাত্রদের জন্য টিউটর হতে পারা তো অন্তত সম্ভব। এ’রকম আরো এমন অসংখ্য ক্ষেত্রে আছে যেগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত না করলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সামাজিক দায়দায়িত্বহীন স্বার্থপর জনগোষ্ঠীতেই পরিণত হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)






