না, ভাস্কর্য, ধর্ষণ, জঙ্গি আস্তানায় অভিযান নয়, সকাল থেকেই ব্রেকিং নিউজ যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ নিয়ে। সকাল থেকেই সবার মুখে একই আলোচনা: বাংলাদেশ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’। ঘূর্ণিঝড়টির নাম ‘মোরা’ কেন, নামটি কোত্থেকে এল—তা নিয়ে অনেকের মধ্যে কৌতূহল লক্ষ্য করা গেছে। সহকর্মীদের কেউ বলেছে, আসলে এর নাম হচ্ছে ‘মরা’। প্রাকৃতিক দুর্যাগ তো আমাদের মারতেই আসে। কাজেই বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যে কোনো ঘূর্ণিঝড়েরই নাম হওয়া উচিত ‘মরা’। কেউ বলেছে, এটা আসলে ‘মোড়া।’ এখানে বসতে চায়। আমরা বানানে ভালো নই বলে মোরা বলছি। আবার কেউ বলেছে, এটা আসলে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় ‘আমরা’ (মোরা)!
আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞ কর্মকর্তারা অবশ্য ‘মোরা’ নামের আসল রহস্য ব্যাখ্যা করছেন। তাদের মতে, থাইল্যান্ডের কাছ থেকে আসা প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই ঘূর্ণিঝড়টির (মোরা) নামকরণ করা হয়েছে। ‘মোরা’ একটি থাই শব্দ। শব্দটি ইংরেজি অর্থ ‘স্টার অব দ্য সি’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘সাগরের তারা’। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে অহরহ ঘূর্ণিঝড় হয়। কোথায় কখন কোন ঝড় হয়, তা নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে ঝড়ের আগাম নামকরণ করা হয়। পূর্বনির্ধারিত নামের তালিকা থেকে একেকটি ঝড়ের নাম দেওয়া হয়।
এখন দেশজুড়ে চলছে ‘মোরা’-নিয়ে শঙ্কা, ভয়, প্রস্তুতি। এটা ঠিক কখন নাগাদ, কতটা অঞ্চল জুড়ে কতটা রুদ্র রূপ নিয়ে হাজির হবে, এটা আইলার মতো ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হবে, নাকি নার্গিদের মতো ভয় দেখিয়েই চলে যাবে-তা নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা!
আগে ঘূর্ণিঝড় হতো, দাপট দেখিয়ে, ভেঙে, মুচড়ে, ভাসিয়ে চলে যেতো! চলে যাওয়ার পর কদিন লাগাতার মানুষের দুর্ভোগ-কষ্ট-যন্ত্রণার খবর। কিছু মানুষের ত্রাণ তৎপরতা। টিভি পর্দায় মন্ত্রী-এমপিদের ত্রাণ বিতরণের ছবি। তারপর এক সময় আক্রান্ত মানুষজন নিজেদের মতো করে বাঁচার পথ বের করে নিত। এবং বেঁচে-বর্তেও থাকত।
এখন হচ্ছে ব্রেকিং নিউজের যুগ। সব কিছুর আগাম খবর। প্রতিমুহূর্তের বর্ণনা। ‘আসলাম গুটি গুটি পায়ে এগোচ্ছেন, সামনে তাকাচ্ছেন, কিন্তু বল কাকে দেবেন, ভেবে পাচ্ছেন না। অবশেষে দূর থেকে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে মারলেন। বল গোলবারের অনেক ওপর দিয়ে বাইরে চলে গেল। লক্ষ্যভ্রস্ট শট!’ মঞ্জুর হাসান মিন্টুর দেওয়া ঢাকাই ফুটবল লীগের ধারাবিবরণীর মতো এখন সব কিছুর ‘লাইভ’ ধারাবর্ণনা থাকে। এখন আরও একটা জিনিস নতুন যোগ হয়েছে, তা হলো: সব কিছুর একটা নামকরণ। নব্বইয়ের দশকে মিডিয়ায় নামজাদা সন্ত্রাসীদের বিশেষ বিশেষ নামে ডাকা হতো, যেমন: কালা জাহাঙ্গীর, কানা বক্কর, কিলার আব্বাস, মুরগী মিলন, জামাই ফারুক ইত্যাদি।
গত কয়েক বছর ধরে জঙ্গিরা বিভিন্ন নাম নিয়ে বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপে তৎপরতা শুরু করে। পুলিশ যখন নিয়মিত বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা শুরু করে, তারাও প্রতিটি অভিযানের একটা করে গালভরা নাম দেয়। কোনোটির নাম ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’, কোনোটি ‘অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭’, আবার কোনোটির নাম ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’।
নামকরণের এই যুগে ঘূর্ণিঝড়েরও নিত্যনতুন নামকরণ করা হচ্ছে। গত বছর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমে ঘূর্ণিঝড়ের বান ডেকেছিল। বর্ষার আগে হাজির হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। বর্ষা-বিদায়ের পর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হয় ঘূর্ণিঝড় ক্যান্ত, এরপর নাডা, তারপর এসেছে ওয়ারদা।
এবার মৌসুমের প্রথম ঘূর্ণিঝড় এই ‘মোরা’-র আগমন কিন্তু মোটেও শুভ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাভাবিক বর্ষায় বাগড়া দিতেই ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’-র আগমন।
দেশজুড়ে এখন সব থেকে প্রার্থিত অতিথি মৌসুমি বায়ু। সেই অতিথি অর্থাৎ বর্ষার উপরে বঙ্গোপসাগরের সদ্যোজাত ঘূর্ণিঝড় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আশঙ্কার অঙ্ক কষে চলেছেন আবহাওয়াবিদেরা। কিন্তু হঠাৎ দারুণ চমক দিয়ে জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষার মেজাজ এনে দিয়েছে ‘মোরা’ নামের সেই ঘূর্ণিঝড়!
এই ঘূর্ণিঝড় সত্যিই সাগরের তারা, নাকি এটা আসলে আমাদের শত্রুই— তা নিয়ে আমজনতার সংশয়-বিভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু প্রমাদ গুনছে বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, ধ্বংসের স্বাভাবিক শক্তি নিয়ে ঘূর্ণিঝড় যা ক্ষতি করার, তা তো করতেই পারে। তার উপরেও বর্ষার ঘাড়ে থাবা বসিয়ে রুখে দিতে পারে তার অগ্রগতি। তাই মেঘলা আকাশ, বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি নিয়ে বর্ষার আমেজ ঘনিয়ে আনলেও ঘূর্ণিঝড়ের এই বন্ধুসুলভ ভূমিকাটা আসলে ছলনার আলখাল্লা। মৌসুমি বায়ুর দেরি করিয়ে দেওয়ার জন্য যতটা সম্ভব শত্রুতা সে করবেই করবে।
আবহাওয়াবিদদের অনেকেই বলছেন, বর্ষা সমাগমের ঠিক আগে অর্থাৎ প্রাক্-বর্ষার মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়াটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। কারণ, দেশে বর্ষাকে টেনে আনার জন্য আরবসাগর আর বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ-সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রবণতার মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই ধরনের আকস্মিক নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় সেই ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ফলে বর্ষার আগমন পিছিয়ে যেতে পারে। নষ্ট হয়ে যেতে পারে তার স্বাভাবিক ছন্দ। আর সেই ছন্দোভঙ্গের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে দেশের কৃষিতে, সামগ্রিক আবহাওয়াতেও।
আমাদের পঞ্জিকা অনুযায়ী, বর্ষা শুরু হওয়ার স্বাভাবিক তারিখ হলো ১ জুন। কিন্তু এখন ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সেই তারিখ পরিবর্তন করবে বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে এবার যদি শীতের মতো বর্ষাও আসি আসি করে না আসে, কিংবা গায়েব হয়ে যায়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না!
অনেক আবহাওয়াবিদ বলছেন, তীব্র দহনে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ এই বৃষ্টিতে স্বস্তি পাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এতে পুলকিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, বর্ষার অগ্রগতি রুখে দিয়ে এই ঘূর্ণিঝড় বড় ক্ষতি করে দিতে পারে।

এই যে সাগরের তারা-‘মোরা’ নাম নিয়ে যে ঘূর্ণিঝড়ের আগমন, তা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও একেবারে কার্যকারণহীন নয়। প্রকৃতির ওপর যথেচ্ছাচার চালানোর কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, আর পরিবেশ দূষণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থা কায়েম থাকায় এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়ায় পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু-যা বিশ্ববাসীকে একটি গভীর সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।আমরাও এর অনিবার্য শিকারে পরিণত হয়েছি।
প্রশ্ন হলো, এ পরিস্থিতি থেকে তাহলে কীভাবে রেহাই পাব? কীভাবেই বা আমরা টিকে থাকব?
সুইডেনের এক পরিবেশ বিজ্ঞানী উমিও জলবায়ুবিষয়ক এক সম্মেলনে বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরা যা করতে পারি তা হলো: ১) প্রতিকারমূলক বা প্রিভেনশন, ২) অভিযোজন বা মিটিগেশন, ৩) খাপ খাইয়ে নেয়া বা আ্যডাপটেশন, ৪) সয়ে যাওয়া, দুর্ভোগ পোহানো বা সাফারিং।
জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক বিষয় হওয়ায় ১ ও ২ নম্বরের ব্যাপারে আমাদের তেমন কিছুই করার নেই (অবশ্য উত্তরাঞ্চলে খরা ও মরুকরণ রোধে ব্যাপক বনায়ন করলে microclimate-এ যে পরিবর্তন আসবে তাতে ‘প্রিভেনশন’ ও ‘মিটিগেশন’ কিছুটা হলেও সম্ভব)।
‘আ্যডাপটেশন’- যাকে বলে local solution to global problem এবং ‘সাফারিং’-যা আমরা ইতিমধ্যেই করছি এবং ভবিষ্যতেও করেই যাব। কাজেই আমাদের সামনে মোটা দাগে করণীয় হলো:
বিজ্ঞান (Science) হিসাবে ‘আ্যডাপটেশন’ কে এগিয়ে নেওয়া, ২) ছোট ছোট ‘আ্যডাপটেশন’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন, ৩) স্থানীয় জ্ঞান (indigenous knowledge)-এর কল্যাণে যে প্রযুক্তি/উপায়গুলো আছে তার উন্নয়ন ঘটানো এবং ৪) আন্তর্জাতিক ফোরামে গণসংযোগ বাড়িয়ে ‘আ্যডাপটেশন ফান্ড’-এর ব্যবস্থা করা এবং এর সদ্ব্যবহার করা।
তবে রাত পোহালে দুর্গত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো, তাৎক্ষণিক খাবারের ব্যবস্থা করাটাই হোক আমাদের সবার প্রাথমিক দায়িত্ব।
আসুন, আমরা সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই, মানবিক কর্তব্য সম্পাদনের মধ্য দিয়ে দুর্যোগের কালো রাতকে জয় করি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)










