একটা সময় ছিল যখন দিনে একবার ঢাকা না গেলে পেটের ভাত হজম হতো না। সেই আমার এখন ঢাকা যেতে হবে শুনলেই শরীরে জ্বর আসে। যদিও সেই সময়টায় আমার বসবাস সীমানা ঢাকার পায়ে হাটার দূরত্বে বলা যায়। আর এখনকার মুল ঢাকা থেকে প্রায় অর্ধেক দিনের দূরত্বে বসবাস।
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন এসে যায়, এই ঢাকা শহর এমন হলো কেন ? কারণ, সমস্যা অনেক। একদিন কেন, ভালো করে বলতে গেলে দুই দিনেও বলে শেষ করা যাবে না, তারপরেও সমস্যা থেকেই যাবে। এই প্রিয় শহরের এই চিত্রের জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার আগে বের করতে হবে, দায়ী নয় কে ?
যাহোক, যে কথা বলার জন্য এই লেখা, গতকাল একটা নিউজ দেখলাম। নিউজটা হচ্ছে, ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন করার প্রস্তাব উঠেছে মন্ত্রী সভায়। সাফাই সংযুক্তি হিসেবে এম্বুলেন্স, জরুরি সেবাসহ আরো কিছু বিষয় জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

একটু পিছনে ফিরে বলতে হয়, সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকারকে আমি সমর্থন করিনি, এরপরেও আমি মনে করি অনেক মন্দের মধ্যে সেই সময়টা অর্থাৎ ২০০৭-২০০৮ ছিল ঢাকা শহরের রাজপথের জন্য একটি স্বর্নালী সময়। ফুটপাত থেকে রাজপথ, পথচারী থেকে হকার, রিকশাওয়ালা থেকে সিএনজিওয়ালা, বাস ড্রাইভার থেকে বড় লোকের ড্রাইভার, আমলা থেকে কামলা, চাঁদাবাজ, মস্তান থেকে বড় মস্তান, ছাত্র থেকে ছাত্রের অভিভাবক, ট্রাফিক থেকে আনসার, সার্জেন্ট থেকে কমিশনার, ডিসিপ্লিনের মধ্যে ছিল না, কারা? রাস্তায় বের হলে ঠিক মত ফুটওভার ব্রিজ, ফুটপাত, রাজপথ, সিনগ্যাল, ব্যবহার করতো নিয়মের মধ্যে। নাহলে অগণতান্ত্রিক নিয়মে গাড়ির নিচে দিয়ে ১০/১২ বার আশা যাওয়া করতে হতো। আর রাস্তা বন্ধ করে রাজনৈতিক সমাবেশের নামে গণতান্ত্রিক অধিকার ? এটা ছিল না বলেই, ঐ সময়টাকে ঢাকা শহরের স্বর্নালী সময় বলি আমি।
সত্যি বলছি, এখনো বুঝে উঠতে পারছি না ভিআইপি লেনের প্রয়োজনীয়তা কী ? যদিও মন্ত্রিপরিষদ সচিব বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে (নাম উল্লেখ না করে) এই লেন আছে বলেছেন। কিন্তু ভদ্রলোক কিন্তু এটা বলেননি, বিশ্বের এমন একটা অনুন্নত দেশ যেখানে সড়ক বন্ধ করে বিশেষ কারণ ছাড়া গণতন্ত্রের চর্চা হয়, তাছাড়া উনি এটাও দেখাতে পারবেন না যেখানে খুশি সেখানে, যেভাবে খুশি সেভাবে চলন্ত বাস দাঁড়িয়ে অহেতুক রাস্তা বন্ধ করে যাত্রী তুলছে। এমনকি উনি এটাও দেখাতে পারবেন না বিশ্বের এমন একটা অনুন্নত দেশ আছে যে দেশের শহুরে নাগরিকেরা, ফুটপাত বন্ধ করে বছরের পর বছর গণতান্ত্রিক নাগরিক চর্চা করছে কিংবা ফুটওভার ব্রিজ রেখে ব্যস্ত রাস্তা থামিয়ে দিয়ে সড়ক পার হচ্ছে।

এখন আমলাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, উনারা কি বিশ্বের এমন একটা দেশের নাম বলতে পারবেন, যেখানে সিটিতে ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন আছে, যেখান দিয়ে শুধু ভিআইপিরা যাবে? আমার ধারণা, উনারা তা বলতে পারবেন না। তবে, দূরের যাত্রার এক্সপ্রেসওয়ের উদাহরণ তারা দিতে পারেন। যা নগরের জন্য মোটেও এলাউ না। যদি হতো, তাহলে ক্রেমলিনে পুতিনের জন্য খুব মোটা একটা ভিআইপি রাস্তা থাকতো, কিংবা ট্রাম্পের জন্য নিউইয়র্কে তৈরি হতো ঢাউস সাইজের ভিআইপি লেন।
এখন কথা হলো সরকার ভিআইপি লেন করবে কি না… ?
হয়তো বা, হয়তো না… তবে সম্ভাবনা যে জিরোতে সেটা খুব স্পষ্ট দেখতেই পাচ্ছি। এই জন্য যে, ভিআইপি লেইন হবে কি করে ? ধরেন, একজন ভিআইপি গুলশান-২ থেকে বের হয়ে, বনানী দিয়ে ময়মনসিংহ সড়কে ভিআইপি লেইনে উঠলো, ঐ ভিআইপি যাবে পল্টনে… তো, শাহবাগ ধরে যদি যায় কিংবা ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনে দিয়ে… সেক্ষেত্রে, বিজয় স্মরনীর সিনগ্যাল, ফার্মগেটের পুলিশ বক্স, কাওরান বাজারের চক্কর… ওভার পাস করবে কি দিয়ে ? আলাদা ফ্লাই ওভার দিয়ে নাকি সোজা সিনগ্যাল মেনে ? আলাদা ফ্লাইওভার করলে জায়গা আর সময় কই ? আর ইউটার্ন সিনগ্যাল মেনে গেলে ভিআইপি লেইন হয় কি করে ?
কাজেই, প্রস্তাব যে বিপদের সেটা খুব সহজেই অনুমেয়। যারা দিয়েছে, তারা ভালো ও মহৎ চিন্তা থেকে এই প্রস্তাব আনেনি। ১৬০ ফিট রাস্তার কম করে হলেও ২ লেইনের ৪০ ফিট রাস্তা ভিআইপিরা নিয়ে গেলে, বাকী থাকে ১২০ ফিট, ফুটপাত দখল ২০ ফিট, রইলো ১০০ ফিট, যেখান দিয়ে আমাদের মত নন আদম রা যাবে ঘণ্টায় ১ কিলোমিটার গতিতে। বিষয়টা ভেবে দেখলেই শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
তাই বলছি, ভিআইপি লেইনের দরকার নাই। নিজের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে পারেন সংশ্লিষ্ট মহল।
১। ফুটপাত পরিষ্কার করুন, পাবলিকের ব্যবহার উপযোগী করুন।
২। ব্যক্তিগত গাড়িতে স্টিকার লাগিয়ে পরিবার পিছনে প্রকার ভেদে একটি বা দুইটি গাড়ি ব্যবহারে বাধ্য করুন।
৩। যেখানে খুশি সেখানে নয়, নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে পাবলিক বাস দাঁড়ালে চালকদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করুন।
৪। ট্রাফিক পুলিশ, সার্জেন্টদের সচেতন করুন।
৫। ঢাকা শহরে খোলা জায়গায় সকল গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা বন্ধ করুন।
৬। মাস তিনেকের জন্য সড়ক ব্যবস্থাপনায় সুপ্রিম পাওয়ার দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করুন।
বিশ্বাস করুন, ভিআইপি লেইন লাগবে না। শহরের চিত্র পালটে যাবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








