অ্যাথেলেটিকসের অভিজাত ইভেন্ট একশো মিটার স্প্রিন্টের বিশ্ব-সেরা টাইমিং
জ্যামাইকার বিস্ময়-মানব উসাইন বোল্টের। ২০০৯-এ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপে নয়
দশমিক পাঁচ আট সেকেন্ড সময় নিয়ে স্বর্ণ জিতে ‘বোল্ট রাজা’র বিশ্বসেরার
সিংহাসনে জাঁকিয়ে বসা। অলিম্পিকে সেরা রেকর্ড ও স্বর্ণপদক তারই গলায়
২০০৮ সালের বেইজিং গেমস থেকেই।
২০১২’র লন্ডন গেমসে নয় দশমিক ছয়-তিন সেকেন্ডে’র এক ঝলকানি বোল্টকে দেয় টানা দ্বিতীয় অলিম্পিক স্বর্ণ। একই ইভেন্টে লন্ডন গেমসে মেয়েদের সেরা বোল্টেরই স্বদেশী শ্যালি অ্যান ফ্রেসারের। জ্যামাইকান সুন্দরী সময় নিয়েছিলেন দশ দশমিক সাত-পাঁচ সেকেন্ড। এবার চোখ ফেরাই ঘরের দিকে।
বাংলাদেশের দ্রুততম মানব মেজবাহ’র একশো মিটারের সেরা টাইমিং এগারো দশমিক সাত-পাঁচ সেকেন্ড, দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তারের বারো দশমিক দুই শূন্য সেকেন্ড। ছেলেদের ৫০ মিটার ফ্রি ষ্টাইল সাঁতারে কুড়ি দশমিক নয়-এক সেকেন্ডে বিশ্বরেকর্ড ব্রাজিলের সিজার সিয়েলো’র। 
একই ইভেন্টে ২০১২’র অলিম্পিকের স্বর্ণ জিততে ফ্রান্সের ফ্লোরেন্ট মানদু’র লেগেছিলো একুশ দশমিক তিন-চার সেকেন্ডঅ। আমাদের মাহফিজুর রহমান সাগর চব্বিশ দশমিক ছয়-চার সেকেন্ডে সাঁতার শেষ করে বিদায় নিয়েছেন বাছাই পর্ব থেকে।
চার বছর আগে’র লন্ডন অলিম্পিকস কভার করার সোনায় বাঁধিয়ে রাখা সেই স্মরণীয় দুই সপ্তাহ আমার সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারের আজীবনের সঞ্চয়। অ্যথেলেটিকসের মাঝারি পাল্লার দৌঁড়ে ব্রিটেনের কালো মানুষ মো ফারহা”র সাফল্য, স্প্রিন্ট ইভেন্টে আমেরিকানদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর জ্যামাইকার বোল্ট, ফ্রেশার, ব্লেকদের সঙ্গে স্বর্ণ জয়, সাঁতার পুলে মাইকেল ফেল্পসের রূপকথাকে হার মানানো সাফল্য, ফুটবলে নেইমারের ব্রাজিলের বিপক্ষে মেক্সিকোর সোনার জয় কিংবা টেনিসের ফাইনালে সেরেনা উইলিয়ামসের কাছে রুশ সুন্দরী মারিয়া শারাপোভার নাকানি চোবানি খাওয়ার সাক্ষী হওয়া স্মৃতির মনিকোঠায় অমলিন চিরদিন।
সেই গেমসেই আমার কাছে বাংলাদেশ অধ্যায় মানেই মাহফিজুর রহমান সাগরের আধা মিনিটের সাঁতার। এরআগে বা পরে নেই কিছু। আমরা সাংবাদিকরা গেমস কভার করছি চাপমুক্ত হয়ে। দেশে অফিসের বিশেষ কোন চাওয়া নেই। বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদের পদক জয়ের নেই কোন সম্ভাবনা। আমাদের টেনশন নেই, ক্রীড়াবিদ কর্মকর্তারাও নির্ভার। সবাই কমবেশী পর্যটকের ভূমিকায়।
ল্যাপটপ, ভিডিও ক্যামেরা, ইন্টারনেট, বুম, .ট্রাইপড নিয়ে মাইলের পর মাইল ঘুরছি, ভয়েস ওভার, পিটিসি দিয়ে দিনে দুটো রিপোর্টও পাঠাচ্ছি, কিন্তু তারপরও কি যেন নেই। বারবার নিজেকেই প্রশ্ন করছি, এই বিশাল যজ্ঞে কেন আমি? কেন আমার বাংলাদেশ! আয়োজকদের আমন্ত্রণ আছে, সেই আমন্ত্রণে হয়তো আন্তরিকতাও আছে। কিন্তু আমন্ত্রিতের আমন্ত্রণ রক্ষার দায় নেই!
টিভি সাংবাদিকের ভিডিও ক্যামেরা, ল্যাপটপ, রিপোর্ট, পিটিসি নিয়ে যতটা ব্যস্ততা তার চেয়ে হাজারগুণ ব্যস্ততা পর্যটকের (তখনো সেলফি এতটা সর্বগ্রাসী জনপ্রিয় হয়নি) ডিজিটাল ক্যামেরার। ছোট-বড়, অখ্যাত-বিখ্যাত, সেলিব্রেটি, ইন্টারন্যাশনাল স্টার, লিজেন্ড যাকেই দেখছি হ্যাংলার মতো তার পাশেই দাঁড়িয়ে ক্যামেরার বোতামে আঙ্গুল চালাচ্ছি।
‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আমার কিংবা বাংলাদেশের কাছে ১৯৮৪ সালে যেমন ছিল দূর আকাশের চাঁদ, ২০১২ কিংবা এবারের রিও আসরও তাই। আমাদের ভাঙ্গা কুঁড়ে ঘরের ছাউনির ফুঁটো দিয়ে কখোনো-সখোনো হয়তো ছড়াবে বোল্ট-ব্লেক, ফেল্পস কিংবা নতুন কোন তারকার চাঁদের মতো উজ্জ্বল দ্যুতি। আমরা কুঁড়েঘরবাসী দূর আকাশে চেয়ে দেখবো সেই চাঁদের আলো।
বর্তমান কিংবা নিকট ভবিষ্যতে তাকে ভালোবেসে বুকে তুলে নেয়া হবে না। কেন অলিম্পিক বাংলাদেশের আপন হবে না তার তথ্য-উপাত্ত পরিসংখ্যান আছে লেখার শুরুতে। চার বছর পরপর অলিম্পিকের দামামা বাজলে বাংলাদেশের খেলার জগত আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠে। সচল হয় সাংবাদিকদের কলম, কম্পিউটারের কি-বোর্ড।
অলিম্পিকের সাফল্য কিভাবে ধরা যায় তার প্রেসক্রিপশন লেখা হয় বেশুমার। তবে অপ্রিয় সত্য মেনে নেয়া উচিত অলিম্পিকের পদক বাংলাদেশের জন্য নয়। পৃথিবীতে অলৌকিক কাণ্ড ঘটার অজ উদাহরণ আছে, কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারি লাল-সবুজের অলিম্পিক পদক জেতার কোন সম্ভাবনা নাই , যুক্তিসঙ্গত কিংবা বৈজ্ঞানিক কারণও নেই। অলিম্পিকের ইভেন্ট অ্যাথেলেটিকস, সাঁতার, ভলিবল, বক্সিং কিংবা অন্য কোন খেলার চর্চা হয় দেশের কোন প্রান্তে কিংবা প্রতিষ্ঠানে? ১৬ কোটির বাংলাদেশে একটি মাত্র খেলার চর্চা নিয়মিত ও পরিকল্পনামাফিক, সেটা ক্রিকেট।
দূভার্গ্যজনক হলেও সত্যি এদেশে যে খেলার তুমুল জনপ্রিয়তা তার সিরিয়াস চর্চা সারা পৃথিবীর মাত্র দশ থেকে বারোটি দেশে। সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, অলিম্পিক এসোসিয়েশন এমনকি বিকেএসপি’র মতো স্পোর্টস একাডেমি আছে, ফি’বছর সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হয় কোটি কোটি টাকা। কিন্তু সেই শ্বেতহস্তির দল ৪৫ বছরেও দেশকে দিতে পারেনি নুন্যতম এশীয় মানের কোন অ্যাথেলেট। 
খোদ রাজধানীতে আছে মাসে হাজার কুড়ি থেকে লাখ টাকার টিউশন ফি’র একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কটা প্রতিষ্ঠানের আছে নিজের মাঠ, সার্টিফিকেট পাওয়া স্পোর্টস টিচার? অলিম্পিক এসোসিয়েশন, ক্রীড়া পরিষদ কিংবা ক্রীড়া ফেডারেশনের এশিয়ান গেমস, অলিম্পিক নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিকল্পনা খুঁজেও পাওয়া যাবে না।
কর্মকর্তারা জেগে ওঠেন কোন আন্তর্জাতিক গেমস শুরু’র আগে। সেটাও দলকে প্রস্তুত করার জন্য নয়, বরং নানা কূটচালে বিদেশগামী দলে নিজেদের এবং নিজেদের ইয়ার দোস্তদের নাম নিশ্চিত করতে।
রিও গেমসে ক্রীড়া দলের সঙ্গে কোচ না পাঠিয়ে নিজেই বিমানে চড়ার মতলব হাসিল করে ফেলেছেন একটি ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী। মিডিয়া কোমর বেঁধে নামছে সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। তাতে কিইবা আসে যায়! এই নির্গমনের সঙ্গে পদক পাওয়া বা না পাওয়ার কোন সম্পর্ক আছে ?
শুধু ফেডারেশন কর্মকর্তারা গেলেই দোষ! অলিম্পিক, এশিয়ান গেমসের মতো মেগা আসরে ক্রীড়াবিদ, সাংবাদিকরা গিয়ে দেশের জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন কি সাফল্য অর্জন করে এনেছেন! এই মহাযজ্ঞ দর্শনে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদ, কর্মকর্তা কিংবা সাংবাদিকদের অভিন্ন লক্ষ্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয়, ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া কিংবা নিজের বায়োডাটা সমৃদ্ধ করা।









