নতুনকে স্বাগত জানাতে আমরা ভয় পাই। পুরনোকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার মধ্যে আনন্দ খুঁজি। সীমাবদ্ধতার এ শৃঙ্খল থেকে বের হওয়ার চেষ্টাও অনেকের কাছে অপরাধ! ফুটবল বিশ্বকাপের মৌসুমে এমন কঠিন কথা কেউ শুনতে, পড়তে চাইবে না জেনেও লিখে যাচ্ছি। মোবাইলে রিদমিক কী-বোর্ডের সাহায্যে বাংলা টাইপ করতে গিয়ে বারবার শব্দ গঠনে ভুল করে যাচ্ছি। ব্যাক-স্পেস দিয়ে ঠিক করতে গিয়ে বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। যা মনে আসছে তা ভাষায় রূপ দিতে পারবো কিনা সে শঙ্কা নিয়েই লিখে যাচ্ছি।
আসলে আলোচনাটা বিশ্বকাপ ঘিরেই। শিরোনামের প্রসঙ্গ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে কথা বলবো শেষে। গত রাতের ম্যাচটা (জাপান-বেলজিয়াম) নিয়ে কিছু কথা না বলেই পারছি না। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে নাসির শাদলির গোলে বেলজিয়ামের জয় নিশ্চিতের পরপরই ঢুকলাম ফেসবুকে। নিউজফিডে জাপানকে সমবেদনা জানিয়ে একের পর এক স্ট্যাটাস চোখে পড়ল। আমাদের মহাদেশের দেশ জাপান, যারা কিনা প্রথমবার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট প্রায় কেটেই ফেলেছিল! দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ায় তাদের কোয়ার্টারে দেখে ফেলেছিলাম আমরা। আমি চেয়েছিলাম ম্যাচের ফল জাপানের পক্ষেই যাক। প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় অবশ্য আফসোস হয়নি। ম্যাচে বেলজিয়ামের অসাধারণ কামব্যাক দেখে মনের ভেতরে সুপ্ত থাকা স্পোর্টিং সত্ত্বা দারুণভাবে জাগ্রত হয়েছে। জাপানের খেলোয়াড়দের থমকে যাওয়া, অশ্রু দেখে খারাপ লাগলেও ম্যাচে বেলজিয়ামের দুর্দান্তভাবে ফেরা বড় করে দেখতে বাধ্য হয়েছি।
যারা ৪ মিনিটের ব্যবধানে ২ গোল হজম করে আবার ৫ মিনিটের ব্যবধানে তা শোধ করতে পারে, তারা তো সাফল্য পাওয়ারই যোগ্য। শেষ মিনিটে চোখের পলকে কাউন্টার অ্যাটাক থেক জয়সূচক যে গোলটি এলো, এমন আরেকটি মুহূর্ত না দেখা পর্যন্ত সোমবার দিবাগত রাতের ম্যাচটি মনে গেঁথে থাকবেই। ২-২ গোলে সমতায় থাকা ম্যাচে ৯৩ মিনিটে কর্নার পেয়েছিল জাপান। সেটি কাজে লাগাতে পারেনি তারা। বলটা গ্রিপ করেই দ্রুত সতীর্থকে দিয়ে দেন বেলজিয়াম গোলরক্ষক কোর্তোয়া। তিন খেলোয়াড়ের পায়ের স্পর্শে পার হল ১২০ গজ জায়গা। এ’প্রান্ত থেকে ও’প্রান্ত, চোখের নিমেষেই বল পার। যেকোনো মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানো যায় তার বড় একটি বিজ্ঞাপন হয়ে রইল ম্যাচ শেষের ৩০ সেকেন্ড আগের গোলটি। রোস্তভের ম্যাচ থেকে প্রেরণা নিতে পারেন সবাই। খেলার মাঠ তো বটেই, এমনকি জীবনের কঠিন সময়েও। সে কারণে বেলজিয়াম দল বিশ্ববাসীর কাছ থেকে একটা ধন্যবাদ পেতেই পারে।
ম্যাচ শুরুর আগে সরাসরি সাক্ষাতে এক বন্ধু বলছিল, শুনছি বেলজিয়াম নাকি ফেভারিট। ফুটবল ফলো করেন এমন কয়েকজনের মুখে আমিও শুনেছি এমন কথা। অথচ জাপান ২ গোল করার পর বেলজিয়ামের কাছ থেকে ফেভারিট তকমা সরিয়ে নিতে চাইলাম আমরা। দেখে ফেললাম তাদের বিদায়! সুন্দর ফুটবল উপভোগের চেয়ে নিজ পক্ষকে বড় করে দেখতে চাইলে যা হয় আরকি! বেলজিয়ামের কামব্যাক নিয়ে তেমন কারও মন্তব্য না দেখে হতাশায় কেটেছে সারারাত।
বিশ্বকাপ এলেই আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে একটি দৃশ্য: গ্রামের বাড়ির বারান্দায় মান্নান প্রফেসর লাল রঙের একটি চায়ের ফ্ল্যাক্স পাশে রেখে খেলা দেখতে বসেছেন। একটু পরপর চা খাচ্ছেন আর বিশ্বকাপ উপভোগ করছেন। রাতভর যে কয়টা ম্যাচ হবে সবগুলো দেখবেন। আব্বা খেলাধুলাপাগল মানুষ ছিলেন না। সহকর্মী যেন হতাশ না হন, সেজন্য কিছুক্ষণ খেলাও দেখতেন, কথা বলতেন। শুয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতেন কখন শেষ হবে খেলা। মান্নান সাহেব বের হলে সদর দরজার খিল আব্বাকেই লাগাতে হবে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কথা স্পষ্ট মনে আছে। মান্নান প্রফেসর যেবার প্রথম পুরো বিশ্বকাপ আমাদের ঘরে দেখলেন যেটি তার আগেরবার, মানে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ। তখনকার সময়ে ১৭ ইঞ্চি রঙিন প্যানাভিশন টিভিতে খেলা দেখে কতটা মজা পেতেন তা এখন বুঝতে পারছি।
আমাদের বারান্দায় বসেই তিনি দুটি বিশ্বকাপের সব ম্যাচ দেখেছেন। অথচ কখনও জানতে পারিনি তিনি কোন দলের সমর্থক। এখন বুঝতে পারি তিনি আসলে ফুটবলভক্ত। মনে মনে কোনো দলের সাপোর্ট হয়ত ঠিকই করতেন, তার চেয়ে বড় হয়ত ছিল ফুটবলের নান্দনিকতা, শৈল্পিকতা। আর বৈশ্বিক আয়োজনে নিজেকে যুক্ত করা। নইলে সব দলের খেলা সমান মনোযোগ নিয়ে কীভাবে দেখেন!
এখন দেখছি বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশের মানুষ ভাগ হয়ে যান ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায়। এটা বেশ পুরনো রীতি। যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সেভেন আপ, ডিমের হালি, এসবের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছি আমরা! ফেসবুকে ট্রল দেখে এক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম এটা(সেভেন আপ) কেনো বলা হচ্ছে। সে আকাশ থেকে পড়ল, গত বিশ্বকাপে ব্রাজিল ৭ গোল খেয়েছে সেটাই। জার্মানির সঙ্গে সেই ম্যাচ পুরোটাই দেখেছিলাম টিভিতে। তারপরও কেনো ব্যাপারটা রিলেট করতে পারলাম না ভেবে হতাশ হলাম!
মান্নান সাহেবের মতো লোকেরা চার বছর পর বিশ্বের সব দল সম্পর্কে ধারণা নিতেন বিশ্বকাপ দেখার মাধ্যমে। চেষ্টা করতেন যতটুকু সম্ভব তাদের সংস্কৃতি, মানুষের আদব বুঝে নিতে। অথচ গত দুই বিশ্বকাপ ধরে শুধুই কাঁদা ছোড়াছুড়ি নিয়ে ব্যস্ত আমরা। ফুটবলের নান্দনিকতা, শৈল্পিকতার কথা না বলে বলছি সেভেন-আপ টাইপের কিছু। আর্জেন্টিনার সমর্থক মাদক নিয়ে গ্রেপ্তার, ব্রাজিল সমর্থক মসজিদে জুতা চুরি করতে গিয়ে আটক! এমন ট্রল তো দেখা শুরু করেছি বিশ্বকাপ শুরুর আগেই।
তবে ভিন্নতাও আছে। কাঁদা ছোড়াছুড়ির বাজারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দু’দলের খেলাই ভালো লাগে এমন মানুষও আছেন। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা একজন তার ছেলের ছবি পোষ্ট করে জানিয়েছেন দু’দলের সমর্থের কথা। আমাদের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শ্রী বীরেন শিকদারের কথাই যদি বলি, তিনি এই দুটি দলেরই খেলা পছন্দ করেন। দুই প্রজন্মের দুইজনকে পেলাম যারা এসবের বাইরে। এমন অনেক মানুষ হয়ত আছেন আমাদের আশেপাশেই।
আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা ৯ জন ক্রীড়া সাংবাদিক রাশিয়ায় বিশ্বকাপ কাভার করতে গেছেন। তাদের কারও কাছ থেকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে ট্রল করতে দেখেনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে। মজা করেও কেউ কিছু লেখেননি। ভেন্যুতে থেকে হয়ত তারা উপলব্ধি করছেন বিশ্বকাপের আবেগ, মাহাত্ম্য, গৌরব। কাছ থেকে দেখতে পারছেন লাখো মানুষের স্বপ্ন। স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাও। আর কান্নার দৃশ্যায়ন। বিশ্বকাপ যে শুধুই মাঠের খেলা না, বৈশ্বিক মেলবন্ধন ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের উপলক্ষ, সেটি যেন আমরা বুঝেও বুঝছি না। দুটি দলের মাঝে ঘুরপাক খেতে খেতেই কী এ দশা আমাদের?








