বাংলাদেশ পাঁচশ ছুঁতেই ইনিংস ঘোষণা করে দিতে চেয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। পরে আরও ৮ রান যোগ হয়; হারাতে হয় ১৩৬ রানের ইনিংস খেলা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের উইকেট। অধিনায়ক কেনো একটু আগে ছাড়তে চেয়েছিলেন সেটি বুঝিয়ে দিলেন বল হাতে নেমেই।
মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে ভাগাভাগি করে সাকিব উইন্ডিজের ৫ উইকেট তুলে নিলেন ঝটপট। সবগুলোই বোল্ড। টেস্টে এমন ঘটনা আগে ঘটেছে মাত্র দুইবার। যেখানে শুরুর পাঁচ ব্যাটসম্যান ক্রিজ ছেড়েছেন বোল্ড হয়ে। তবে একটি নতুন ঘটনাও দেখেছে সাদা পোশাকের ইতিহাস। শনিবার বিকেলে বল হাতে নেয়া বাংলাদেশের পাঁচ বোলারই স্পিনার। টেস্টে ইনিংসের শুরুতে হাত ঘোরানো পাঁচ বোলারই স্পিনার, এমন বিরল দৃশ্যের দেখা মিলল সাকিবের দলের মাধ্যমেই।
বাংলাদেশের করা ৫০৮ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে উইন্ডিজের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ৭৫ রান। প্রথম ইনিংসে ক্যারিবীয়রা পিছিয়ে ৪৩৩ রানে, হাতে ৫ উইকেট। হেটমায়ার ৩২ ও ডওরিচ ১৭ রানে অপরাজিত থেকে গড়েছেন ৪৬ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি।
শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বিকেলে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৯ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বসে উইন্ডিজ। প্রথম ওভারেই বাংলাদেশ পায় সাফল্য। শেষ বলে অসাধারণ এক ডেলিভারিতে ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটকে (০) বোল্ড করেন সাকিব। মিরাজ নিজের তৃতীয় ওভারে কাইরেন পাওয়ালকে (৪) বোল্ড করলে চাপে পড়ে সফরকারীর।
খানিক বাদেই সুনিল আমব্রিস (৭) সাজঘরে ফেরেন সাকিবের দ্বিতীয় শিকার হয়ে। পরে আরও দুই শিকার ধরেন মিরাজ। রোস্টন চেজ (০) ও শাই হোপকে (১০) বোল্ড করে ক্যারিবীয়দের দুর্দশা নামান। ২৯ রানে প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানকে হারায় তারা।
দলীয় ৪৭ রানের মাথায় নাঈম হাসানের বলে রিভিউ নিয়ে বাঁচেন হেটমায়ার। এ বাঁহাতি তখন পৌঁছেছেন দুই অঙ্কে। এলবিডব্লিউর আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন আম্পায়ার। তবে রিপ্লেতে দেখা যায় অফস্টাম্প মিস করে বল চলে যেত বাইরে।
১৫৪ ওভার ফিল্ডিং করার ক্লান্তি আর বাংলাদেশের স্পিনজাদুতে কোণঠাসা ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চট্টগ্রাম টেস্ট জয়ের পর মিরপুরে জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বাংলাদেশের স্পিন-চতুষ্টয়। ব্যাটে রানের পাহাড়, বোলিংয়ে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে রাখা। এরচেয়ে ভালো দিন আর কীইবা হতে পারত! স্বপ্নের একদিন পার করেই ড্রেসিংরুমে ফিরেছে বাংলাদেশ দল।
ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের স্কোরকার্ডটা ছিল বাঁধিয়ে রাখার মতো। দুই অঙ্ক পেরিয়েছেন সব ব্যাটসম্যানই। আছে একটি সেঞ্চুরি, সঙ্গে তিনটি ফিফটি। দল হয়ে ব্যাটিং, জুটি বেঁধে ছুটে চলা, হোম অব ক্রিকেটের ২২ গজকে নিজেদের আবাস বানিয়ে উইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ তোলে ৫০৮ রান। প্রথম ইনিংসের দৈর্ঘ্য হয় ১৫৪ ওভার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয়বার পাঁচশ ছাড়ায় বাংলাদেশের ইনিংস। টেস্ট ক্রিকেটে ১৯ বছরের পথচলায় এটি টাইগারদের সর্বোচ্চ সংগ্রহে থাকছে সপ্তম স্থানে।
সেঞ্চুরির আশা জাগিয়ে সাদমান ইসলাম ও সাকিব আল হাসান সাজঘরে ফিরলেও ভুল করেননি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ছোট ছোট জুটিতে এগিয়ে গেছেন। ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরির দিনে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন রানের চূড়ায়।
অবশ্য বড় সংগ্রহের আশা জাগে আগের দিনই। সাকিব-মাহমুদউল্লাহ জুটি ৬৯ রানে অবিচ্ছিন্ন থেকে যখন শেষ করেন প্রথম দিনের খেলা। ৫ উইকেটে ২৫৯ থেকে দ্বিতীয় দিন শুরু করা বাংলাদেশের ইনিংসে যোগ হয়েছে আরও ২৪৯ রান।
স্পিনদূর্গে মোস্তাফিজকে একাদশ থেকে ছেঁটে ফেলে ব্যাটসম্যান বাড়ানোয় রানটাও বেড়েছে। অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে লিটন দাস নেমে করেছেন ফিফটি। শেষের দিকে তাইজুল ইসলাম খেলে গেছেন ২৬ রানের ইনিংস। নবম উইকেট জুটিও পেরিয়ে যায় অর্ধশতক ৫৬। দশম উইকেটে ৩৬।
ম্যাচের ৮০ ওভার পার হতেই নতুন বল হাতে তোলার সুযোগ ছিল উইন্ডিজের। সফরকারীরা নতুন বল হাতে নেয় দ্বিতীয় দিনের শুরুতে, ৯১তম ওভারে। চকচকে বলটার ধার কমিয়ে দেন সাকিব-মাহমুদউল্লাহ মিলে। রানও আসছিল দ্রুতগতিতে। শুরুর ৫ ওভারে আসে ৩১। দিনের প্রথম ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সাকিব-মাহমুদউল্লাহ জুটি ছুঁয়ে ফেলেন তিন অঙ্ক।
সাকিব নিজেও আশা জাগিয়েছিলেন সেঞ্চুরির। ব্যক্তিগত ৮০ রানে কেমার রোচের সাধারণ এক ডেলিভারিতে গালিতে ক্যাচ দিয়ে পেস আক্রমণে ক্যারিবীয়দের সফল করে দেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
ততক্ষণে অবশ্য ৩০০ পেরিয়ে গেছে বাংলাদেশ। আগের দিন ক্যারিয়ারের ২৪তম ফিফটি ছুঁয়ে ৫৫ রানে অপরাজিত ছিলেন সাকিব। খেলেন ১১৩ বল। এদিন ২৫ রান যোগ করেন মাত্র ২৬ বলে। মারেন দুটি চার। ইনিংসটি সাজান ৬টি চারে।
সাকিবের পর ওয়ানডে স্টাইলে ফিফটি করেন লিটন। লাঞ্চ বিরতির খানিক পর অফস্পিনার ব্র্যাথওয়েটের লেগস্টাম্প বরাবর ডেলিভারিটি রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড হন এ ডানহাতি। ৬২ বলের ইনিংস থামে ৫৪ রানে। সর্বোচ্চ ৮টি চার ও একমাত্র ছক্কাটি আসে লিটনের ব্যাট থেকেই। ততক্ষণে বাংলাদেশের সংগ্রহ চারশ ছুঁইছুঁই (৩৯৩)।
মাহমুদউল্লাহ আগাতে থাকেন চেনাছন্দে। বছরের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তোলার আগে কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে যখন ২ রান দূরে নাভার্স নাইনটিজের চাপ বেশ ভালভাবেই অনুভব করেন। বোলারদের একের পর এক ডট দিয়ে নিজের উপর কিছুটা বিরক্তও হয়ে উঠেছিলেন! গালিতে খেলে রান নিতে ছটফট করতে গিয়ে আরেকটু হলে রানআউটও হতে বসেছিলেন এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান। পরে অফস্পিনার রোস্টন চেজকে কাভার ড্রাইভে বাউন্ডারি মেরে তুলে নেন প্রত্যাশিত সেঞ্চুরি। খেলেন ২০৩ বল। ৬টি চারে সাজান ইনিংস। শেষঅবধি ২৪২ বলে ১০ চারে ১৩৬ রান করে আউট হন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। যেটা তার ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস।







