ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়সীমা পুনর্বিবেচনা করে ৩ লাখ টাকা করার জন্য আবারও জোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে লুটপাটকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় সংগঠনটি।
শনিবার রাজধানীর মতিঝিল ফেডারেশন ভবনে আয়োজিত বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি জানায় এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দীন। এ সময় সংগঠনটির অন্যান্য পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
শফিউল ইসলাম মহিউদ্দীন বলেন, বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জনগণের ক্রয় ক্ষমতা ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে এ সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করেছি। এটি পুনর্বিবেচনার জন্য আবারও জোর দাবি জানাচ্ছি।
প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জ হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিশাল অঙ্কের এই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকের মান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এটি বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।
মহিউদ্দীন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের টার্গেট ধরা হয়েছে। এটি অর্জন করতে হলে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। সাধারণত দুটি কারণে ব্যবসায়ীরা ঋণ খেলাপি হয়। একটি হলো- সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা লোকসানের সম্মুখীন হয়ে খেলাপি হয়ে যায়, অন্যটি ইচ্ছাকৃত। যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যাংকে রবারি (লুটপাট) করছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।
দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বিশ্ব দরবারে রোল মডেল হলেও ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে, যা পলিসির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার প্রস্তাব করছি – যাতে করে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বজায় থাকে।
ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে তিনি বলেন, বাজেটের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ীদের কাছে বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ আছে। কিন্তু সে টাকা বিনিয়োগ করতে প্রয়োজন ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম। অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়েছেন। আমরা আর ওই ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচী চাই না।
তিনি বলেন, একটি বড় দলের নেত্রী জেলে আছেন। এটা একটি বিচারিক প্রক্রিয়া। বড় বড় আইনজ্ঞরা এই বিষয়টি দেখছেন। যে কোনো বিষয়ে আন্দোলন করা তাদের রাজনৈতিক অধিকার। ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করে না, ব্যবসা করে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোন জ্বালাও-পোড়াও রাজনৈতিক কর্মসূচি আমরা সমর্থন করি না।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটের তুলনায় ১৬ দশমিক ০৬ শতাংশ বেশি। বাজেট বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও অর্থব্যয় সঠিকভাবে করতে না পারায় প্রতিবছরই বাজেট সংশোধন করতে হয়। এজন্য এ বাজেট বাস্তবায়নে বছরের শুরু থেকেই সুষ্ঠু মনিটরিং জোরদার করা জরুরি।
নতুন বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা (ব্যাংক ব্যবস্থা ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা) নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা ব্যাংক খাতের উপর নির্ভরশীলতা উৎপাদনশীল খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। কিন্তু এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অনেকক্ষেত্রে করদাতাদের উপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং আইন-কানুন-এর অপপ্রয়োগ ও কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা ক্ষমতার কারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হয়ে থাকে। আমরা ভবিষ্যতে এই ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবসা বাণিজ্য করার নিশ্চয়তা চাই। সেই সঙ্গে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিবিড় মনিটরিং ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যে গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং রাজস্ব আয় যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই হারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। তাই কর প্রশাসনকে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অটোমেশনসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে অধিক নজর দেয়ার জন্য প্রস্তাব করেন তিনি।







