মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে আসন্ন নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ডো নাল্ড ট্রাম্প যেন ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। কথার বিষবাণ দিয়ে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ
হিলারী ক্লিনটনকে জর্জরিত করে ফেলছেন। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে তিনি
ইতিমধ্যেই ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন। আসন্ন নির্বাচন এখন আর শুধু দুই
প্রার্থীর লড়াইয়ে সীমিত নেই। সে দেশের মৌলিক ধারণাগুলির শিকড় ধরেই
অভূতপূর্ব টান মেরেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প আর এ ব্যাপারে তার সমর্থকরাও
তাকে সমানভাবে উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছেন।
ইতোমধ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যম ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এককাট্টা। ট্রাম্প ‘বর্ণবিদ্বেষী’, ট্রাম্প ‘মিথ্যেবাদী’, ট্রাম্প ‘মেল শভিনিস্ট’, ট্রাম্প ‘অভদ্র’, ট্রাম্প ‘মূর্খ’ এসব অভিধা দিয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যম। সর্বশেষ এই ট্রাম্পই বলেছেন, তিনি আর ‘ভালোমানুষি’ করবেন না, এবার দস্তানা খুলে ফেলবেন!
কিছু দিন হলো, যত বারই তিনি বক্তৃতায় তার প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিন্টনের নাম উচ্চারণ করেন, সমর্থকেরা ‘তাকে কয়েদ করো’ বলে চেঁচিয়ে উঠে। তাতে সাড়া দিয়ে, ট্রাম্প এই কথা বলেছেন। এত দিন ট্রাম্প যা করছিলেন, তা যদি ‘ভালোমানুষি’ হয়, তবে খারাপমানুষি জিনিসটি কী, ভেবে অনেকেই স্তম্ভিত হচ্ছেন। কারণ তিনি আগাগোড়া অভদ্রতা ও গালমন্দের উপর ভর করে চলছেন, তার পুরো প্রচারাভিযানটিই বিদ্বেষ দিয়ে সাজানো।

প্রশ্ন হলো, ভালোমানুষি কাকে বলে? অন্যের অসুবিধার খেয়াল রাখে যে এবং অন্যের অনিষ্ট করতে প্রবল অনীহা যার, সে-ই ভালোমানুষ। এই ‘অন্য’টি যে-ই হোক-চেনা, অচেনা, কিংবা চেনা হয়েও শত্রুমনোভাবাপন্ন-তার প্রতি ব্যবহারে আমি নিজ সুনীতি থেকে বিচ্যুত হব না: এটা ভালোমানুষের অঙ্গীকার। এগুলোই সভ্যতারও মূল শর্ত। তাই সভ্যতা মূলত যা শেখায়, তা হল আত্মসংবরণ। আকাঙ্ক্ষাকে লাগামহীন হতে না দিয়ে, আত্মসমীক্ষণ নিরন্তর জারি রাখার অভ্যাসই সভ্যতা।
বাসে যে আমি অন্যের পা মাড়াব না, তা মর্দিত পায়ের অধিকারীর কাছ থেকে আমাকে শিখতে হবে কেন, আমি প্রথম হতেই সচেতন থাকব, যেন কারও কষ্টের কারণ হয়ে না উঠি। কথা বলতে গিয়ে আমি নিজের প্রতি নজর রাখব, আসর জমাবার তাগিদে আমি যেন কাকেও, কোনও দূর দেশের অপরিচিত গোষ্ঠীকেও, অহেতুক অপমান না করে বসি। মুশকিল হল, এই সভ্য ভদ্র ভালো মানুষ চিরকালই সংখ্যাগরিষ্ঠ অশিষ্ট অমার্জিত কর্কশের কাছে হেরে বসে, সাময়িক ভাবে হলেও।
এখন অশিষ্টতা উদ্যাপনের যুগ। অশ্লীল আত্মবিজ্ঞাপনকে এখন বলে মার্কেটিং, অন্যকে অনর্গল অপমান করার প্রবণতাকে বলে সপ্রতিভতা, হিংসা ও আঘাত করবার অভ্যাসকে বলে আগ্রাসন। কেবল রাজনীতি নয়, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই, সকল নম্রতা নিয়ম রীতি নীতি ভুলে, আদিম দখল-মানসিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। 
ভালোমানুষও দেখছে, তার হাত থেকে অ-ভালোরা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে চাকরি সম্মান প্রেম যৌনতা আইসক্রিম। নিজেকে তার নিয়ত বিপন্ন মনে হতে থাকে, এক সময় আত্মসন্দেহ, এমনকী আত্মঘৃণার দিকেও সে ঢলে পড়ে। নীতিহীন উদ্ধত জয়ীদের অট্টহাসি তার মর্মে এসে আছড়ায় ও বস্তুগত ব্যর্থতার দায় তার ঘাড়ে ভূতের মত চেপে বসে। এ পরিস্থিতিতে ভালোমানুষও বিগড়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের কারণে তেমন কিছু ঘটবে কিনা সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বলা হয়ে থাকে মার্কিনীরা হলো একটি ‘সালাদ’ টাইপের জাতি। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত বছর ধরে দলে দলে মানুষ মার্কিন মুলুকে এসেছেন বা তাদের আনা হয়েছে। এই মানুষগুলো একে অপরের সান্নিধ্যের আহ্লাদে গলে একাকার হয়ে যায়নি। বরং এখানে এসে তারা একটি পাত্রে রাখা ‘সালাদ’-এর মত রয়েছে। শসা, টোমাটো, গাজর, লাল ক্যাপসিকাম, সবুজ ক্যাপসিকাম, কচি ভুট্টা, লাল বাঁধাকপি, সবুজ বাঁধাকপি, লেটুস, ব্রকোলি সব একে অপরের ঘেঁষাঘেঁষি করে একটা খাদ্য তৈরি করেছে যাকে এক সঙ্গে বলা হয়ে থাকে ‘স্যালাড’ বা সালাদ। প্রতিটির রং আলাদা দেখা যায়, স্বাদও আলাদা চাখা যায়। কিন্তু কী খাচ্ছেন জিজ্ঞেস করলে কেউ বলে না-শসা, টোমাটো, গাজর, ক্যাপসিকাম, বাঁধাকপি, লেটুস, ব্রকোলি খাচ্ছি। বলে ‘সালাদ’ খাচ্ছি।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে সালাদপাত্রটি আছড়ে পড়ে তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে সুশীল পশ্চিমী সমাজে একটা প্যানিক তৈরি হয়েছে। তার একটাই কারণ, গণতন্ত্র দিয়ে তাকে জব্দ করা যাচ্ছে না। সেই দুনিয়া যে গণ্ডির মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ককে সর্বদাই সীমিত রাখতে চায়, ট্রাম্প তাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন।
‘পলিটিক্যালি কারেক্ট ‘ থাকার যে কোড, যে বাধ্যবাধকতা, যে আচরণ-বিধি পশ্চিমী গণতান্ত্রিক বিতর্কে স্বীকৃত, তিনি সেটা মানছেন না। অনেকেই মানেন না। নোয়াম চোমস্কি মানেন না। অন্তত গত তিরিশ বছর ধরে চোমস্কি বলে আসছেন, বিশ্বের সব থেকে বিপজ্জনক সন্ত্রাসবাদী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷ বলার অধিকার মার্কিন দেশে অবাধ। কিন্তু চোমস্কির ক্ষেত্রে এক ধরনের উপেক্ষা দিয়ে তাকে এক কোণায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। পুরু কার্পেট পাতা যে সব বারান্দায় ক্ষমতার কুশীলবেদের চলাফেরা, সেখানে চোমস্কির কোনও প্রভাব নেই৷
আসলে যা কিছু এই মূল ধারার বাইরে , তাকেই কার্যত ‘মার্জিনালাইজ’ করে দেওয়ার, ‘সম্পূর্ণ আগডুম-বাগডুম’ তকমা সেঁটে দিয়ে চরম উপেক্ষা করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এবং মার্কিন সুশীল সমাজের৷ সালাদের বাটিতে তুমি সন্তর্পণে শসাটা বাড়িয়ে, ক্যাপসিকামটা এক্কেবারে কমিয়ে দিতে পারো, কিন্তু সালাদের বাটিটা আছড়ে ভেঙে ফেলতে পারে এমন কোনও লোককে গণতন্ত্রের উদ্যাপনের অনন্ত পার্টিতে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
এখানেই বেঁধেছে মহাগেরো। সহসা এই মার্কিন গণতান্ত্রিক ‘পার্টি-গোয়ার ‘-রা আবিষ্কার করেছেন যে, সেই মহা-পার্টিতে শুধু ঢুকেই পড়েননি, তাতে নাচের কী সুর বাজবে, ডিজে-কে তার নির্দেশ দেওয়ারও দাবিদার হয়ে বসেছেন ট্রাম্প। ঘাড় ধরে বার করে দাও না কেন এই গেট-ক্র্যাশারটাকে? সর্বনাশ। তা তো হওয়ার জো নেই। গণতন্ত্র যে। এ পার্টিতে কে থাকবে কে যাবে তা, অন্তত বাহ্যত, ঠিক করে দেবে জনতা।
এক্কেবারেই গোড়া থেকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমেছে সংবাদমাধ্যম। ট্রাম্পকে আটকানোর চেষ্টার কোনও কসুর করেনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তার দলের কথিত সতীর্থরা। লাভ হয়নি। প্রদেশের পর প্রদেশে হইহই করে দলীয় সমর্থকদের ভোটে জিতেছেন ট্রাম্প। মার্কিন দেশের গ্র্যান্ড ওল্ড রিপাবলিকান পার্টি তাকেই দলের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিতে বাধ্য হয়েছে।
আর যত জিতেছেন ট্রাম্প, ততই বেড়েছে তার মূলগত ভাবে খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ-শ্রেষ্ঠত্বের যুদ্ধবাজি হুঙ্কার। আর ততই উথলে উঠেছে তার সমর্থকদের উল্লাস। এ বার দেখা যাচ্ছে, শুধু ঘোষিত দলীয় সমর্থকদের মধ্যেই নয়, তার প্রতি সমর্থন ধীরে ধীরে জমে উঠছে সার্বিক ভাবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও।
কাজেই বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসলে তিনি মার্কিন গণতান্ত্রিক পার্টিতে গেট-ক্র্যাশ করে মোটেই ঢুকে পড়েননি। তিনি ওই পার্টি-র মধ্যেই জন্মেছেন, কিন্তু এখন সে জন্মের দায়িত্ব নিতে রাজি নন কেউ। আর এই রাজি না হওয়াটাই ট্রাম্পের তুরুপের তাস, যাকে বলে ‘ট্রাম্প কার্ড’।

অনেকেই বিশ্বাস করেন শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিন্টনই জিতবেন। কারণ তার হাতেই এখন মার্কিন ক্ষমতা-দুনিয়ার সব থেকে বড়ো অস্ত্র। কিন্তু ইতিমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটা বড় ‘নিউক্লিয়ার শক্তি’তে পরিণত হয়েছেন। তিনি শুধু রিপাবলিকান-প্রার্থী-হওয়া এক দুর্বিনীত ব্যক্তি নন। তিনি একটা টাইম বোমা। যার ঘড়িটা চালু হয়ে গেছে।
ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকুন বা না-থাকুন, সেই টাইম-বোমাটা থেকে যাবে। নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তার টিকটিক বন্ধ নাও হতে পারে। এই টাইম বোমাটির বিকট বিস্ফোরণও ঘটতে পারে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







