৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সব পত্রিকা, অনলাইন মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় দৈনিক সমকালের সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুলের মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে। পত্রিকায় লিখেছে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের মনিরাম পুরে বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের নেতা কর্মীদের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ দৈনিক সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুল মারা গেছেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে শাহজাদপুর পৌর আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত সভাপতি ভিপি রহিম ও তার শ্যালক ছাত্র লীগ নেতা বিজয় মাহমুদের সঙ্গে পৌর মেয়র হালিমুল হক মীরুর সহোদর পিন্টু ও তার সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এসময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আব্দুল হাকিম শিমুল মুখে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। শিমুলের মৃত্যুর খবর শুনে শোকাহত তার বৃদ্ধা নানী হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায় ঘটেছে আরেক ঘটনা। সেখানকার উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নূর হোসেন ছাত্রদের পিঠে চড়ে পাড় হয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। একজন পৌর মেয়র ও আরেকজন উপজেলা চেয়ারম্যান। দু’জনই দলীয় মনোনয়ন পেয়ে দলীয় প্রতীকে জয়লাভ করে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন।
হাইমচরে আওয়ামী লীগ অফিস কার্যালয় ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধরা। জনপ্রতিনিধি হয়ে জনতার বিরুদ্ধ ভূমিকায় নেমেছেন যেসব জনপ্রতিনিধি। ক্ষমতার দম্ভে নিজে ছাড়া আর অন্যদের মানুষ ভাবছেন না যারা। এরকম অনেকেই কিছুদিন পরপর সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন। এর দায়ভার কি দলের নয়? দলইতো তাদের যোগ্য ভেবে মনোনয়ন দিয়ে তাদেরকে দলীয় প্রতীক তুলে দিয়েছে। দলীয় সমর্থন ছাড়া কি তারা জনপ্রতিনিধি হতে পারত?
কোমলমতি শিশুদের পিঠ দিয়ে পাড় হয়ে সেটাকে পদ্মাসেতু পাড় হতে বলায় কিসের ইঙ্গিত। সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিশুদের পদ্মাসেতু বানানোর কথা বলে উপজেলা চেয়ারম্যানের পক্ষে সাফাই গাইছেন। এ বিষয়টাকে কী বলবেন সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
`ব্যবস্থা নেয়া হবে, কাউকেই ছাড় দেয়া হবেনা’ দলে মৌসুমী পাখি ও হাইব্রিডদের ঠাঁই নেই’ এসব কথা আর কত শুনবে জাতি? আপনি যে কথার রাজা হয়ে উঠছেন। কাজের বেলায় কিছুই নেই। মানুষ তা বুঝে উঠছেন। মন্ত্রী, সাংসদ, মেয়র, চেয়ারম্যানসহ দলীয় প্রতীকে জিতে যাওয়া অনেক জনপ্রতিনিধিই ধরাকে সরা জ্ঞান করে ক্রমশ জনবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ন হচ্ছেন। দলকে ও জনপ্রতিনিধিত্ব কে তারা করে তুলছেন বিতর্কিত।
সরকারের ভূমিকাকে করছেন প্রশ্নবিদ্ধ। শুনেছি ভেড়ামারার মেয়র ভাতিজীর বিয়েতে শর্ট গানের গুলি ছুঁড়েছে। এ প্রসঙ্গে মেয়রের ভাতিজা বলেছে, আমরাই আইন। আমাদের অনুমতি লাগে না। ৩০জানুয়ারি ২০১৭ পত্রিকার শিরোনাম হয়, চকরিয়ায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকাকে পেটালেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার সহধর্মিনী।
দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকা লিখেছে: চকরিয়ায় স্কুল চলাকালীন একটি বিদ্যালয়ে ঢুকে কথামত কাজ না করায় প্রধান শিক্ষিকাসহ ৩ জনকে পিটিয়ে আহত করলেন উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম ও তার সহধর্মিনী শাহিদা জাফর।
গত ২৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুঘাট রিংভং দক্ষিন পাহাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে মারধর ও শারীরিক নাজেহালের বিষয়টি উত্থাপন করেন আহত প্রধান শিক্ষিকা হুমায়রা আজাদী। জনপ্রতিনিধিদের জনবিরোধী বিতর্কিত ভূমিকার খবর প্রতিনিয়তই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে।
ক্ষমতার দম্ভে যে দলের পরিচয়ে ও সমর্থন সহযোগিতায় তারা জনপ্রতিনিধি হয়েছেন সে দলকেই ক্রমাগত বিব্রত করে চলেছেন তারা। শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত গ্রুপ ও আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বে প্রাণ গেল সমকাল সাংবাদিকের। এখন কি সেখানকার বর্তমান নেতৃত্বও বহিস্কৃত হতে যাচ্ছে। দুই গ্রুপই বহিস্কৃত হলে আওয়ামী লীগে থাকবেটাকে। দেরিতে শুদ্ধি অভিযান চালানোর এই পরিণতি। শাহজাদপুরে শিমুল হত্যার বিরুদ্ধে যে গ্রুপ হরতাল দিল।
এর পেছনেও সাংবাদিক প্রীতি নয় বিরোধী পক্ষকে ঘায়েলের ইস্যু সৃষ্টি। স্বার্থে আঘাত লাগলে তারাও যে সাংবাদিক পিটাতে দ্বিধা করবেনা তা নিশ্চিত করেই বলা যায় কক্সবাজারের আব্দুর রহমান বদি, ফুলবাড়িয়ার মুসলিম উদ্দীন, নাসির নগরের ছায়েদুল হক আরও কতজন নানা ঘটনায় সংবাদ পত্রের শিরোনাম হচ্ছে। জনবিরোধী জনপ্রতিনিধি, অনুপ্রবেশকারী বিএনপি জামাত ও অসাম্প্রদায়িক দলে সাম্প্রদায়িক নেতৃত্বের পাশাপাশি এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় আসছে ফ্রিডম পার্টির নেতারাও আওয়ামী লীগের নেতা বনে গেছে।
চাঁদপুরের হাইমচরে ছাত্রদের পিঠে চড়া উপজেলা চেয়ারম্যান নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিলের নেতৃত্বে সাবেক ফ্রিডম পার্টির নেতারাও ছিল। যে ফ্রিডম পার্টির নেতারা প্রকাশ্যে গর্ব ভরে বলে বেড়াত, আমরাই শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করেছি। তারা এদেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছে। এ দলটির প্রধান ছিল লেঃকর্নেল ফারুক রহমান।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় কথিত মেজর পীর (মেজর মতিউর রহমান) পীর সেজে ফ্রিডম পার্টি সংগঠিত করেছিল। আইন শৃংখলা বাহিনীর সাথে গোলাগুলিতে পাকুন্দিয়া রণক্ষেত্র হয়েছিল। লেঃ কর্নেল ফারুক রহমানের ফাঁসি হয়েছে কিন্তু তার দলের নেতাকর্মীরা গেল কই? যে দেশে আত্মস্বীকৃত খুনিরা সরকারী মদতে রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে। সে দেশে অপরাধীরা কেন ভয় পেতে যাবে?
আওয়ামী লীগের নৈতিক ও সাংগঠনিক বিশৃংখলা চরমে। বিএনপি আওয়ামী লীগ হয়ে যাচ্ছে, জামাত আওয়ামী লীগ হয়ে যাচ্ছে, ফ্রিডম পার্টি আওয়ামী লীগ হয়ে যাচ্ছে, রাজাকার আওয়ামী লীগ হয়ে যাচ্ছে, রাজাকারের সন্তান আওয়ামী লীগ হয়ে যাচ্ছে, সাম্প্রদায়িক অসাম্প্রদায়িকের মুখোশ পরে আওয়ামী লীগ হয়ে যাচ্ছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড.আবুল বারাকাত বলেছিলেন, ৫-১৫বছরের মধ্যে দেশে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে যেমন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট জনদের দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল তেমনই শেখ হাসিনার হিতাকাঙ্ক্ষীদেরও দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা খুবই বাস্তব কথা। দেশে এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বিতরণের জন্য যেমন মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই চলছে।
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা ভুয়ামোর অভিযোগে অভিযুক্ত এর চেয়ে লজ্জা আর কী হতে পারে?এ লজ্জা হতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল আওয়ামী লীগকেও শিক্ষা চনিতে হবে। আওয়ামী লীগেও দলে দলে ঢুকে গেছে ভুয়া আওয়ামী লীগ। ভুয়ারা নেতৃত্বের মূলে গেলে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তাই দেশের স্বার্থে, দলের স্বার্থে ও আসল আওয়ামী লীগদের নিজেদের স্বার্থে আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইকে ফলো করা উচিত।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







