‘বেগম’ সম্পাদক নূরজাহান বেগম ৯১ বছর বয়সে চলে গেলেও ‘বেগম’ নিজ বা অন্য নামে বেঁচে থাকবে শত শত বছর। মহীয়সী নারী নূরজাহান বেগমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পত্রিকাটির পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ীরা বলেছেন, নারীদের জন্য সবসময় বাতিঘর হয়ে থাকবে ‘বেগম’।
‘বেগম’ শুধু নারীদের জন্য প্রকাশিত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা। প্রকাশের পর থেকে সাংবাদিকতার জগতে পত্রিকাটি চালু করে নতুন এক ধারা। নারী সাংবাদিকতার পথ খুলে দেয় ‘বেগম’।
সেই ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম চলে গেলেন সবাইকে ছেড়ে। তবে, পাঠকরা বলছেন, ‘বেগম’ সবসময় জীবিত। বহুকাল যেন বেগম বেঁচে থাকে সবার মাঝে, এই কামনা তাদের।
বেগম-এর নিয়মিত পাঠক ছিলেন আলতাফুন নেসা। পত্রিকাটি দ্বারা তিনি এতটাই প্রভাবিত ছিলেন যে সন্তানদের নাম পর্যন্ত রেখেছিলেন বেগম-এ প্রকাশিত নাম দেখে দেখে।
এভাবেই প্রথম থেকে সাধারণ নারীর নিজেদের জগতের একটি অংশ হয়ে উঠে ‘বেগম’। 
নূরজাহান বেগম আর তার ‘বেগম’ পত্রিকা নিয়ে ২০০৫ সাল থেকে গবেষণা করছেন আলোকচিত্রী, ব্যাংকার ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সালমা আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘বেগম ছিল সে সময়ের একটি পত্রিকা, যেখানে একজন গৃহকর্মীর হাতাকাটা পোশাক পরা ছবি ছাপা হয়েছিল বলে এলাকার মানুষ পত্রিকার অফিসে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের (নূরজাহান বেগমের বাবা)
ওপর হামলা করতে উদ্যত হয়। এভাবেই একটি অবস্থান থেকে শুরু হয়েছিল বেগম-এর যাত্রা।
‘গবেষণাটি করতে গিয়ে আমি বুঝেছি, বেগম যদি চালু না হতো, নারীদের কথা বলার জন্য যে পথটা এখন তৈরি হয়েছে, সেটাও তৈরি হতো না। এই পথ, এই কণ্ঠটা তৈরি করেছে বেগম।’
নারী অঙ্গনে বেগমকে ‘বিশাল বিপ্লব’ বলেই উল্লেখ করেছেন প্রখ্যাত ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।
‘ছোটবেলায় আমরা নিয়মিত বেগম পত্রিকা পড়তাম,’ স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ওখানে একটা গল্প থাকত, সৌন্দর্যচর্চা নিয়ে একটা লেখা থাকত, এর সঙ্গে সম্পাদকীয়ও পড়তাম। অদ্ভুত ধরণের একটা আকার ছিল পত্রিকাটির। নামটাও ছিল তেমন সুন্দর। নারী আন্দোলনে বেগম একটি মাইলফলক ছিল বলা যায়। পত্রিকাটিতে নারী লেখকদের ছবি থাকত। অনেক ছবি ছাপা হতো। যাদের ছবি ছাপা হতো তাদের সবার নাম
আমার মুখস্থ ছিল।’
পত্রিকাটির সার্কুলেশন এখন কমে গেলেও আগে তা অনেক বেশি ছিল বলে জানালেন প্রিয়ভাষিণী। পত্রিকাটি সর্বোপরি ছিল আকর্ষণীয়।
তিনি বলেন: নূরজাহান বেগম আমাদের অতিরিক্ত দিয়েছিলেন। এ কারণেই হয়তো আমরা তাকে কিছু দিতে পারিনি। তিনি চলে যাওয়ায় নারী সাংবাদিকতার জগতে বিশাল এক শূন্যতা তৈরি হয়ে গেল। নারীদের জন্য প্রকাশিত এই পত্রিকার হাল নূরজাহান বেগমের পর এখন আমাদেরকেই ধরতে হবে। বেগমের জন্য আমার সাধ্যের মধ্যে করার মতো কিছু থাকলে আমি অবশ্যই করব।
বিপ্লবী বেগম সম্পর্কে সাংবাদিক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, বেগম পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। প্রথম চার মাস এর সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন নূরজাহান বেগম। প্রথম কলকাতায় প্রকাশ শুরু হলেও দেশ বিভাগের পর ঢাকা থেকে প্রকাশ শুরু হয় ‘বেগম’ পত্রিকাটি।
‘এর আগে নারীদের লেখালেখির তেমন একটা সুযোগ ছিল না। বেগমের সৃষ্টিই হয়েছিল এই সুযোগ তৈরি করে দেয়ার জন্য। অনেক নারীই এর আগে পত্রিকায় লিখতেন, কিন্তু পুরুষের নামে। কারণ নারীদের লেখা ছাপা হতো না। পত্রিকাগুলো তাদের লেখা ছাপার যোগ্য মনে করত না।
নারীদের পর্দার বিষয়টাও এখানে ছিল। মনে করা হতো নারীদের হাতের লেখাও বাইরের কেউ দেখলে পাপ হবে। তাই তাদের লেখাও নিষেধ ছিল।’
তিনি বলেন, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন প্রথম নারীদের জন্য বেগম প্রকাশ করেন। নারীরা সেসময় ঘরে ঘরে পত্রিকাটি রাখতেন, কখনো একটা কবিতা, কখনো কোনো সেলাই-ফোঁড়ের টিপস, অর্থাৎ যা পারতেন লিখে পাঠাতেন। তাই নারীদের কাছে বেগম হয়ে উঠেছিল নিজেদের কিছু, নারী জাগরণের নতুন পথ।
বর্তমানের সুপরিচিত নারী সাংবাদিকদের অনেকেই বেগমে লেখালেখি করেছেন বলেও উল্লেখ করেন ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি জানান, নারী বিপ্লবের এই পথ ধরেই গঠিত হয়েছিল বেগম ক্লাব।
ফরিদা ইয়াসমিনের সুরেই সে সময়কার নারীদের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু। তিনি বলেন, সে সময় মেয়েদের হাতের লেখা বাইরের কেউ দেখলেই
সর্বনাশ হয়ে যেত। এই বেগম পত্রিকাই প্রথম সেই নারীদের লেখা প্রকাশ করে, ছবি ছাপায়। সেটা সেই সময়ের তুলনায় একটা বিপ্লবই ছিল।
ঢাকায় প্রকাশ হওয়ার সময় থেকে ঢাকাসহ গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে বেগম পত্রিকা রাখা হতো। এই বেগম পত্রিকার পথ ধরেই মূলতঃ নারীদের আলোর জগতে প্রবেশ। ঘরের আঙ্গিনা পেরিয়ে পৃথিবীর খবর তাদের কাছে পৌঁছে দিত এই বেগম। একদিকে পত্রিকা হিসেবে বেগম, অন্যদিকে সম্পাদক-প্রকাশক হিসেবে নূরজাহান বেগম – এ দুয়ের সাহসী ভূমিকা নারীদের মাঝে নিয়ে এসেছে বিপ্লব।
মিনু বলেন, নূরজাহান বেগম শুধু নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নন, বাংলাদেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব সাংবাদিকদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। ‘বেগম’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নারী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। 







