অনেক রক্তপাত, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর ভবিষ্যতের জন্য শংকার বার্তা দিয়ে শেষ হয়েছে গুলশানের জিম্মি উদ্ধার অভিযান। শ্বাসরুদ্ধ বারো ঘণ্টা জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকা প্রায় দুই ডজন মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক দুঃস্বপ্নের রাত।
এদিন রাত পৌনে নয়টায় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলশান ২ এলাকায় ইতালিয়ান দূতাবাসের পাশের একটি আড়াইতলা বাড়ির নিচের তলায় ‘হলি আর্টিজান’ বেকারি ও দোতলায় ‘ও ক্রিচেন’ নামে একটি স্প্যানিশ রেস্টুরেন্ট আক্রান্ত হয় অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের হাতে। আর ফলাফল : বর্ষণসিক্ত ঋতুর রাতে বৃষ্টিতে নয়, রক্তে ভিজেছে গুলশান!
এই পৃথিবীর যত জন মানুষের মধ্যে প্রকৃত বাঙালির চেতনা জাগ্রত, তারা সবাই আজ রক্তাক্ত, চরম উৎকণ্ঠায় পীড়িত। যৌথ বাহিনীর দুঃসাহসী তৎপরতায় আপাতত জঙ্গিদের হাতে আক্রান্ত মানুষের কয়েকজনকে হয়তো রক্তের বিনিময়ে হলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, উৎকণ্ঠার তাতে অবসান ঘটেনি। মানুষ এখনও ‘ভোরের আলো’ দেখেনি। রাত পোহাবার কত বাকি-কে জানে?
বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থানের বিষয়টি অনেক পুরানো। এই জঙ্গিরা চান্স পেলেই রক্ত নিয়েছে। রক্ত ঝড়িয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা তাতে কাটেনি। সরকার ও প্রশাসনের যে সতর্কতা কাম্য ছিল, যে বোধোদয়ের দরকার ছিল, জঙ্গিবিরোধী যে সাঁরাশি অভিযান পরিচালনার দরকার ছিল, তা কখনও হয়নি। ফলে বিষবৃক্ষের চারাটি বাংলাদেশে এখন বেশ পোক্ত হয়েছে।
এ বার কি বুঝতে পারছি, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ? গুলশানের দৃষ্টান্ত দেখে কি উপলব্ধি করছি, বেখেয়ালে কোন বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছে গিয়েছি আমরা? কোমর বাঁধতে হবে এই বেলা। নচেৎ গুলিয়ে যাবে কোনটা কাবুল আর কোনটা ঢাকা, কোনটা মসুল কোনটা ঝিনাইদহ। গুলশানকে যে ভাবে দেখলাম শুক্রবার রাতে, তার চেয়ে আরও অনেক বেশি ভয়াবহ রূপ আমাদের দেখতে হতে পারে।
বাংলাদেশে এ যাবৎ যতগুলো জঙ্গি হামলা হয়েছে, তার মধ্যে এবারেরটিই সবচেয়ে ভয়াবহ, বিদেশিদের জিম্মি করে জঙ্গি আক্রমণের ঘটনা এবারই প্রথম। গুলশানের মত জায়গায়, যেখানে সবকটি বিদেশি দূতাবাস এবং মূলত বিদেশিদের বসবাস, সেখানে আট থেকে দশজনের একটি দল অস্ত্রসহ ঢুকে পড়েছে। ভেতরে ঢুকেই তারা এলোপাথারি গুলি চালায়, বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। মুহুর্তের মধ্যে পুরো রেস্তোরাঁর দখল নেয় তারা। পণবন্দি করে অন্তত ২০ জনকে, যাঁরা সবাই বিদেশি নাগরিক ।
পাল্টা আক্রমণের যথাযথ প্রস্তুতি না নিয়ে হামলার খবর পেয়েই পুলিশ দৌড়ে গিয়ে ওই বেকারিতে ঢোকার চেষ্টা করে। জঙ্গিদের ছোড়া বোমা ও গুলিতে পুলিশের অগ্রগামী দলের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। আহত হন অন্তত ৪০ জন পুলিশ সদস্য। এর পর বেশ কয়েক দফা পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে কৌশল হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পণবন্দীদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। জবাবে জঙ্গিরা আত্মসমর্পণের তিনটি শর্ত দেয়। শর্ত তিনটি হলো-
১. একদিন আগে ডেমরা থেকে আটক জেএমবি নেতা খালেদ সাইফুল্লাহকে মুক্তি দিতে হবে।
২. তাদেরকে নিরাপদে বের হয়ে যেতে দিতে হবে।
৩. ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাদের এই অভিযান- স্বীকৃতি দিতে হবে।
জঙ্গিরা বার বার রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে চিৎকার করে তাদের শর্তের কথা জানিয়েছে। খালেদ সাইফুল্লাহকে মুক্তির দাবিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি মাদারীপুরে একজন কলেজ শিক্ষককে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনার মূল হোতা হিসেবে গ্রেপ্তারের দুইদিন পরেই গুলশানে জঙ্গিরা হামলা চালালো এবং খালেদ সাইফুল্লাহর মুক্তি দাবি করল। তার মানে সাম্প্রতিক বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে গুলশানের হামলাকারীদের যোগ রয়েছে। অবশ্য এই ঘটনার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
বাংলাদেশে জঙ্গি ইস্যুটি বরাবরই আলাপ-আলোচনার খোরাক হয়েছে, কিন্তু ইস্যুটিকে কখনই আন্তরিকতা নিয়ে দেখা হয়নি। একদল মানুষ জঙ্গি ইস্যুকে এখনও ‘বানানো ইস্যু’ মনে করে। কেউ একে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার মনে করে। অনেকে আবার আইএস, পাকিস্তান আমেরিকা, ভারত প্রভৃতি দেশের সঙ্গে জঙ্গি-কানেকশন খোঁজার চেষ্টা করে এবং নিজেদের মত খুঁজে পেয়ে তুষ্ট হয়। এদিকে জঙ্গিরা বাংলাদেশকে একটি ‘ধর্মরাষ্ট্র বানানোর’ জন্য একের পর এক অনলাইন লেখক, প্রকাশক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বিদেশিদের হত্যা করে নিজেদের শক্তিমত্তা ও ধৃষ্টতা দেখিয়েই চলেছে। হিন্দু পুরোহিত-সেবাইতদের উপর সন্ত্রাসী আক্রমণ তো চলছেই।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিএনপি-জামায়াতের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই মূলত এক সময় দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটেছে, তারা তাদের শক্তি সংহত করার সুযোগ পেয়েছে। জঙ্গিরা যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য চাপাতি-বোমা-বন্দুক নিয়ে সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়েছে, চারদলীয় (বর্তমান ১৯ দল) জোটের মধ্যেই সে লক্ষ্যে বিশ্বাসীদের উপস্থিতি ছিল এবং আছে। তবে জঙ্গিবাদের উত্থানের জন্য শুধু বিএনপি-জামায়াতকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, এ জন্য কিছুটা দায়ভার আওয়ামী লীগকেও বহন করতে হবে। আওয়ামী লীগও যখন প্রয়োজন মনে করেছে তখন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে, আবার নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধার জন্য জঙ্গিবাদকে ব্যবহারও করেছে। আবার অনেকে বলছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটেই একে দেখতে হবে, বিবেচনা করতে হবে।
কারও বক্তব্যই এক কথায় বাতিল করে দেওয়ার মতো নয়। কেন, কীভাবে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটছে, একবাক্যে এবং একপেশে বক্তব্য দিয়ে তা ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করা যাবে কীভাবে অথবা দেশের মাটি থেকে ধর্মীয় জঙ্গিদের সমূলে উৎপাটন করার প্রকৃত উপায় কী এক কথায় এসব প্রশ্নের যারা উত্তর দেন বা খোঁজেন, তারা সমস্যাটিকে গভীরভাবে তলিয়ে দেখেন বলে মনে হয় না। রাজনৈতিকভাবে আমাদের দেশ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছে। একপক্ষ যেটা বলবে, অন্যপক্ষ বলবে তার উল্টোটা।
কোনো জাতীয় ইস্যুতেই একমত হওয়ার সুযোগ নেই। জঙ্গি সমস্যা মোকাবিলার জন্য জাতীয় ঐক্যের কথা যারা বলেন, তারাও বলতে পারেন না কীভাবে এ ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। উগ্র সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এক সুরে কথা বলবে এমন পরিস্থিতি যদি দেশে তৈরি হয়, তাহলে তো আর কোনো সমস্যাই থাকে না!
এটা দেখা গেছে যে, বিভিন্ন সময় জেএমবির সদস্য অথবা আত্মঘাতী জঙ্গি হিসেবে যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের অধিকাংশই ধর্মীয় ভাবধারায় বিশ্বাসী। ধৃত জঙ্গিদের স্বীকারোক্তি থেকে এটাও জানা যাচ্ছে যে, তারা বিদেশ থেকে অর্থসাহায্য পান, আফগানিস্তান অথবা অন্য কোনো দেশে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, জঙ্গি নির্মূলে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানই যথেষ্ট নয়। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব এবং ধর্মীয় শিক্ষা জঙ্গি তৈরির প্রধান সহায়ক ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। আজকাল ইংরেজি শিক্ষিত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে কেউ কেউ জঙ্গিবাদী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। তাই জঙ্গি দমন বা নির্মূল করার জন্য দেশ থেকে যেমন দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করা দরকার, তেমনি দরকার মাদ্রাসাগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন আনা।
একই সঙ্গে জঙ্গিদের সঙ্গে যে বিদেশি কানেকশন গড়ে উঠেছে তা ছিন্ন করা। তাদের অর্থের সরবরাহ বন্ধ করা। এ কাজগুলো কোনোটাই সহজ নয়। যারা ধর্মীয় রাজনীতি ব্যবহারের মাধ্যমে যুবসমাজের মগজ ধোলাই করছে, যারা জঙ্গিবাদী রাজনীতির পক্ষে কথা বলছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারও আওয়ামী লীগ দেখাতে পারছে না। যেসব বৈদেশিক উৎস থেকে জঙ্গিরা অর্থ ও অন্যান্য রসদের জোগান পাচ্ছে, সেই উৎসগুলো বন্ধ করার মতো পদক্ষেপও আওয়ামী লীগ সরকারকে গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দলগুলো সংগঠিত ও পরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মনে এক ধরনের মোহ সৃষ্টি করতে পেরেছে। দোজখের ভয়, বেহেশতের প্রলোভন অনেককেই দুর্বল করে। তা ছাড়া মানুষ দেখছে, সব শাসন আমলেই দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। কোনো সরকারই সুশাসন নিশ্চিত করতে পারেনি। তারা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে উন্নত বা আকর্ষণীয় কোনো বক্তব্য দিয়ে দেশের মানুষের সামনে হাজির হতেও পারেনি। মানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখানোর বদলে অতীতমুখীনতাই মূলধারার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হওয়ায় মানুষের মধ্যে তা কোনো উদ্দীপনা সৃষ্টি করে না। এর সুযোগ নিয়েছে ধর্মব্যবসায়ীরা, জঙ্গিবাদীরা। তারা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
এখন কেবল সেমিনার বা টকশোয় জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে কিংবা মাঠে-ময়দানে উচ্চৈঃস্বরে বক্তৃতা করে ওই শক্তিকে পরাভূত করা সহজ হবে না। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়জুড়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি তার শিকড় ছড়িয়েছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। তাদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ এখন অত্যন্ত মজবুত। তাদের শিকড় উৎপাটনের জন্য অব্যাহতভাবে আদর্শগত সংগ্রাম চালাতে হবে ব্যক্তিপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে। আদর্শগত লড়াইয়ে বিজয় অর্জন রাতারাতি হবে না, এ জন্য দরকার হবে লাগাতার প্রচারণা-লড়াই।
সে লড়াইয়ের মানসিকতা ও প্রস্তুতি আওয়ামী লীগসহ তার সহযোগী দলগুলোর কতটুকু রয়েছে, মানুষ সে ব্যাপারে সন্দেহমুক্ত না হলে অনুপ্রাণিত হবে না। মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করার জন্য আলো ছড়িয়ে জাগরণ তৈরি করার পরিবর্তে জঙ্গি দমনের শর্টকাট পথ খুঁজলে দেশের সামনে থেকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিপদ দূর হবে না। শুক্রবারের রাতের চেয়ে ভয়াভহ কোনো রাতের অন্ধকার আমাদের স্থায়ী ভাবে গ্রাস করতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







