দূষণ থেকে একটি নদীকে বাঁচাতে আরেকটিকে মারা হচ্ছে, পরিবেশবাদীদের এমন অভিযোগ ছিলো আগে থেকেই। প্রকৃত অর্থে বাস্তবতা কি? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া হলো সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরীতে। বুড়িগঙ্গার চিত্রই কি ফিরছে…!
তাহলে, এতো পরিকল্পনা-আইনি যুদ্ধের কি প্রয়োজন ছিলো? পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০০১ সালে হাইকোর্ট চামড়াশিল্পসহ দূষণ সৃষ্টিকারী কারখানাগুলো এক বছরের মধ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেন।
এরপর, ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগর স্থাপনের অনুমোদন পায়। কথা ছিল ২০০৫ সালের মধ্যে কাজ শেষ হবে। এরপরই হাজারীবাগ ছেড়ে যাবে ট্যানারি কারখানাগুলো।
কিন্তু ট্যানারি মালিকদের টাল-বাহানায় যথা সময়ে সেটা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত কারখানা গুলোর বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিতে বাধ্য হয় সরকার। এ বছর ৮ এপ্রিল হাজারীবাগ থেকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় ট্যানারি কারখানা গুলো।যার স্থান এখন সাভারের হেমায়েতপুরে।বেঁধে দেয়া সময়ে ১৫৪টির মধ্যে ৩৪টি কারখানা স্থানান্তর করা হয়।
হাজারীবাগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পর অধিকাংশ ট্যানারিই তাদের কার্যক্রম সাভারে স্থানান্তর করেছে। এর মধ্যে উৎপাদন পর্যায়ে পৌছেছে ৪৫টি। বাকিগুলোর ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা শেষ বা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উৎপাদনে আসবে।
তবে স্থান বদলালেও হাজরীবাগ আর হেমায়েতপুরের চিত্র রয়ে গেছে অনেকটাই এক। রাস্তাদিয়ে হেঁটে যাবেন তার উপায় নেই। উৎকট গন্ধ আর সুয়ারেজ উগরে ওঠা চামড়ার বর্জ্য আপনাকে হাঁটতে দিবে না। শিল্প নগরীতে ঢুকতেই চোখে পড়বে এ দৃশ্য। এ ব্যাপারে অবশ্য দায় নিতে চান না কারখানা মালিকরা। তারা বলছেন: সরকার যে আশ্বাসের ভিত্তিতে আমাদের হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে নিয়ে আসছে তা অনেক আংশেই পূরণ হয়নি। দেখেন রাস্তা গুলো! হেঁটে যেতে পারবেন না। এজন্য নিম্নমানের সুয়ারেজ ব্যাবস্থাকে দায়ি করছেন তারা।
তবে সব দায় কি শুধু সরকারের? স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন: প্রধান বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র (সিইটিপি) নগরীর এক প্রান্তে হওয়ায় অনেক কারখানা মালিক পানি শোধন না করেই নদীতে ফেলছেন। যার কারণে দূষণের স্বীকার হচ্ছে ধলেশ্বরী। চামড়া শিল্পনগরী এলাকা ঘুরে এর সত্য পেলো প্রতিবেদকও।

এছাড়া আগে থেকেই সিইটিপি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চীনা প্রতিষ্ঠান জিনসু লিংঝি এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশ আগে থেকেই। ইতিপূর্বে চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করায় ৫০ লাখ টাকা জরিমানাও করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ: নিয়ম না মেনে সিইটিপি চালু করায় ট্যানারিগুলোর বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে ধলেশ্বরীরর পানিকে দূষিত করেছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখায় যায়: সিইটিপি চালু আছে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে কোনো কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী নেই। গেটে তালা লাগানো দেখে বোধ হয় অনেকদিন তালাও খুলে না কেউ।
তরল বর্জ্যের পাশাপাশি চামড়া শিল্পে রয়েছে ছাট বর্জ্য। যেমন: চামড়ার উচ্ছ্বিষ্ট, শিং কিং ক্ষুর। এগুলো ফেলার জন্য শিল্প নরগরীতে রয়েছে নির্দিষ্ট ভাগাড়। কিন্তু, তা মানার দায় আছে কার! যত্রতত্রই রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে ছাট বর্জ্য। দূষিত করছে বায়ুকে। যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

কথা হচ্ছিলো জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। চামড়া শিল্পনগরীর পাশেই তার বাসা। তিনি বলেন: আগে আমাদের বিনোদনের জায়গায় ছিলো ধলেশ্বরীর পাড়। ২০০৫ সালের পর নদীর পাড় বেধে দেয় সরকার। তখন আমরা খুশিই ছিলাম। পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধদের নিয়ে বসতে পারতাম। কিন্তু, ট্যানারি গুলোর আসার সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন আর নদীর ধারে বসা যায় না। বাতাসের সঙ্গে গন্ধ আসে।
এতো গেছে বাহ্যিক অবস্থা। ভেতরের অবস্থা আরও ভয়াবহ……..
বছরের শুরুতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষায় দেখানো হয়: ধলেশ্বরী নদীর পানিতে মানব ও প্রাণিদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক উপাদান ক্রোমিয়ামের পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি রয়েছে।
একই সঙ্গে পানির তাপমাত্রা থেকে শুরু করে দ্রবীভূত অক্সিজেন, ক্ষার, বিদ্যুৎ পরিবহন, ক্রোমিয়াম-লবণ-রাসায়নিক উপাদান এবং জৈব রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয় এ সময়।
পরীক্ষায় জানা যায়: অক্সিজেন ছাড়া বাকি সাতটিই উপাদানই ধলেশ্বরীরর পানিতে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে রয়েছে। আর অক্সিজেনের পরিমাণও প্রায় শূন্যের কোঠায়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, সিইটিপি থেকে নির্গত প্রতি লিটার পানিতে তাপমাত্রা পাওয়া গেছে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা থাকার কথা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ক্ষারের পরিমাণ থাকার কথা ৬ মাইক্রোগ্রাম, পাওয়া গেছে প্রায় সাড়ে ৮ মাইক্রোগ্রাম।
দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকার কথা সাড়ে ৪ থেকে ৮ মাইক্রোগ্রাম, পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ২ গ্রাম। জৈব রাসায়নিকের পরিমাণ স্বাভাবিক পানিতে থাকার কথা ১ গ্রাম, কিন্তু ধলেশ্বরীর ওই অংশে পাওয়া গেছে ২৭৫ গ্রাম।
রাসায়নিকের পরিমাণ থাকার কথা ২ গ্রাম, পাওয়া গেছে ৭ গ্রাম। এই দুটি উপাদানই আগেরবারের পরীক্ষায় অর্ধেকেরও কম পাওয়া গিয়েছিল। পানিতে দ্রবীভূত রাসায়নিক উপাদান থাকার কথা ২১ গ্রাম, রয়েছে প্রায় ৭৮ গ্রাম।

অক্সিজেন ছাড়া অন্য সাতটি উপাদান নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি থাকা পানি পান করলে এবং ওই পানি প্রাণিদেহের সংস্পর্শে এলে প্রাণী দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ওই পানিতে প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে যাবে। আর যেগুলো বেঁচে থাকবে, সেগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠবে। যা ওই নদীর তো বটেই, এর তীরবর্তী এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।
এতো গেলো মাত্র ৪৫টি উৎপাদনক্ষম কারখানা থেকে দূষণের হিসাব। প্রশ্ন হচ্ছে: ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য সাভারের হেমায়েতপুরে প্রায় ১৯৯ একর জমিতে চামড়া শিল্পনগরী করার তাহলে কি প্রয়োজন ছিলো? যখন পুরো ট্যানারি কারখানা গুলো উৎপাদনে চলে আসবে তখন কি হবে? ধলেশ্বরীরর ভাগ্যও কি তাহলে বুড়িগঙ্গার মতো হবে?








