সেদিনের পর থেকে মুশফিক কেমন আছেন, তা কে জানে! যেদিন বোর্ড সভাপতি পর্যন্ত বললেন, ‘মুশফিক বেশি আবেগী, ওর সমস্যা আছে’; যেদিন বোর্ড পরিচালকরা বলতে শুরু করলেন, ‘তার বিকল্প খোঁজার সময় এসেছে’; সেদিন থেকে মুশফিকের ভালো থাকার কথা নয়। এই রোববারের পর থেকে নিশ্চয়ই আগের চেয়ে একটু ভালো থাকবেন। নিশ্চয়ই অনুভব করবেন বুক থেকে পাথর নেমে যাওয়ার স্বস্তি। মাশরাফীর নেতৃত্বে টস জিতে ব্যাট করতে নামে তার অপরাজিত শতকে (১১০) ভর করেই তো সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ২৭৮ রান সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ।
দলকে লড়াইয়ের এই পুঁজি এনে দিতে মুশফিক যাত্রা শুরু করেন সাকিবের সঙ্গে। টেস্ট থেকে সাময়িক বিশ্রাম নেয়া সাকিব ভালো তাল মেলাচ্ছিলেন। দুজনে ৫৯ রানের জুটি গড়েন। ২৬তম ওভারের শেষ বলে মুশফিককে রেখে ফেরেন সাকিব। দেখার মতো এক গুগলিতে তাকে বোকা বানান ইমরান তাহির।
সাকিব তখন ২৯ রানে। তাহিরের হাত থেকে বেরুনো গুগলি বেশ খানিকটা টার্ন করে। সাকিব সামনে এগিয়ে খেলতে যেয়ে স্লিপে হাশিম আমলার হাতে ধরা পড়েন। দল ছিল ১২৬ রানে।
মুশফিকের পরের লড়াইটা রিয়াদকে (২৬) নিয়ে। সাকিব ফিরে যাওয়ার পর সাউথ আফ্রিকা রান চাপাতে মরিয়া হয়ে উঠে। একদিকে ইমরান তাহিরের গুগলি অন্যদিকে পেসারদের শর্টবল। মুশফিক সব সামলে নেন। বিপজ্জনক বাউন্সার রিস্ট রোল করে মাটিতে খেলেছেন। চকিত গুগলিগুলো সিঙ্গেলে পরিণত করেছেন। ১০৮ বলে শতকের পৌঁছানোর পর শুধু বুনো উল্লাসটাই করেননি। তথাকথিত আবেগ পাথরচাপা দিয়ে আকাশে দুহাত মেললেন। কী যেন খুঁজলেন। তারপর পিচের বুকে এঁকে দেন স্বস্তির চুমু। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে যখন উঠলেন, তখন মুখে যে জাদুকরী শান্ত, স্নিগ্ধ আভা তা কোনো লেখনি দিয়ে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। শুধু এতটুকু বলা যায় সাউথ আফ্রিকার এই দিনগুলো ভবিষ্যতের মুশফিককে আরো পরিণত, আরও বাস্তববাদী করে তুলবে।
মুশফিক এদিন ক্রিজে দাঁড়িয়ে সাকিবের পর একে একে ফিরে যেতে দেখেছেন রিয়াদ (২৬), সাব্বির (১৯), নাসিরকে (১১)।
রিয়াদ ফিরে যান ৩৯তম ওভারের প্রথম বলে। তাকে বেরিয়ে আসতে দেখে স্লোয়ার শর্ট বল করেছিলেন প্রিটোরিয়াস। রিয়াদ সময় মতো ধরতে পারেননি। বড় শট খেলতে যেয়ে টাইমিংয়ে হেরফের করেন। আকাশ থেকে নেমে আসা বল আটকে যায় এবি ডি ভিলিয়ার্সের নির্ভুল হাতে।
মুশফিকের লড়াই শুরু হওয়ার আগের গল্পটা অত সহজ ছিল না। তামিম একাদশের বাইরে। সৌম্যও বাদ। মাশরাফী-হাথুরুসিংহে ওপেনে নামিয়ে দেন ঘরোয়া ক্রিকেটের রানমেশিন লিটন দাসকে। সঙ্গে ইমরুল কায়েস। লিটন শুরু থেকে সাহসী সব শট খেলে কাগিসো রাবাদার গতিতে ভড়কে যেয়ে স্লিপে ধরা পড়েন।
নবম ওভারের পঞ্চম বলে গতি ছিল ঘণ্টায় ১৪৪ কি.মি। গুডলেন্থে পড়ে বল শেষ মুহূর্তে কিছুটা নিচু হয়ে যায়। লিটন সামনে শরীর নিয়ে ডিফেন্স করতে যেয়ে বাইরের কানায় লাগান। ব্যাট চুমু দিয়ে বল চলে যায় দ্বিতীয় স্লিপে। ওখানে ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা স্লিপ ফিল্ডার ফ্যাফ ডু প্লেসিস। মাটি ছোঁয়ার সেকেন্ড ব্যবধান আগে বল হাতে নেন। লিটন এই নিয়ে ১০টি ওয়ানডেতে মাঠে নামলেন। রোববার ২৯ বলে করে গেছেন ২১ রান। চারের মার ছিল চারটি। এরপর দ্রুত ফিরে যান ইমরুল কায়েস (৩১)।
প্রিটোরিয়াসের করা লেগ স্টাম্পে থাকা শর্ট বল আলতো করে খেলতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনেন। ধরা পড়েন কিপারের হাতে।
এই দুজন ফিরে যাওয়ার পর ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামেন সাকিব। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথমবার তিন নম্বরে ব্যাট করে গোল্ডেনডাক মেরেছিলেন। সেই সাকিব আজও তেমন কিছু করতে পারেননি। যেদিন মুশফিকের বুক থেকে অস্বস্তির পাহাড় নামবে, সেদিন সবকিছু আড়াল হবে বলেই হয়তো সাকিবের অমন ফিরে যাওয়া!
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ ইনিংস: ২৭৮/৭ (ইমরুল ৩১, লিটন ২১, সাকিব ২৯, মুশফিক ১১০*, মাহমুদউল্লাহ ২৬, সাব্বির ১৯ ও নাসির ১১, রাবাদা ৪৩/৪, প্রিটোরিয়াস ৪৮/২ ও তাহির ৪৫/১)










