১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব বেতার দিবস (ওয়ার্ল্ড রেডিও ডে)। ২০১০ সালে স্প্যানিশ রেডিও একাডেমির প্রস্তাব অনুসারে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো’র (ইউনাইডেন নেশন্স এডুকেশন, সাইন্স এন্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন) ৩৬তম বার্ষিক সম্মেলনে এ দিবস ঘোষণা করা হয়।
১৯৪৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের রেডিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তাই এ দিনটিকেই বিশ্ব বেতার দিবস হিসাবে বেছে নেয়া হয়। ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিবসটিকে অনুমোদন করে। ফলে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত পৃথিবীর সব দেশের জন্য একটি বৈশ্বিক দিবস হিসাবে উদযাপন নিয়মের মধ্যে বর্তায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন, দূর্যোগ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী করণীয় নির্ধারণমূলক প্রচারণায় বেতারের বিশেষ অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে এ বছর বিশ্ব বেতার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘রেডিও ইন টাইমস অব ইমারজেন্সি এন্ড ডিজাস্টার’।
এ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বাণী দিয়েছেন। ১৯ শতকের শেষদিকে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল মাধ্যমে সৃষ্ট বেতার যন্ত্র এবং পরবর্তী সময়ে হেইনরিচ রুডল্ফ হার্টজ (তার নামানুসারে বেতার ওয়েব মেগা হার্টজ) এর মাধ্যমে বেতার সম্প্রচার শুরু হয়েছিলো।
ইউনেস্কোর এক তথ্যে জানা যায়, পৃথিবীর ৯৫% প্রাপ্তবয়সী মানুষ নানারকম বেতারের (শর্টওয়েব, মেগাহার্টজ, এফএম, অনলাইন) মাধ্যমে তথ্য পেয়ে থাকেন।
তাই গণমাধ্যমের অন্যান্য শাখার প্রভাব বাড়লেও মানুষকে সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে তথ্য পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে বেতারের ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ!
বাংলাদেশেও বর্তমানে সবরকম বেতার কেন্দ্র রয়েছে। ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্র চালু হবার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় বেতারের সম্প্রচার চালু হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তান ব্রডকাস্টিং সার্ভিস এবং এক বছরের মাথায় রেডিও পাকিস্তান-ঢাকা নামে সম্প্রচার হয়।
বেতারের সঙ্গে মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বেতারের শিল্পীকলাকুশলীরা ২১ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি সব ধরণের অনুষ্ঠার প্রচার থেকে বিরত থাকে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান-এর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর বেতারের শিল্পীকলাকুশলীরা অনুষ্ঠান সম্প্রচার বর্জন করে প্রতিবাদ জানায়। ফলে বাধ্য হয়ে পরদিন সকালে ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণ প্রচার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।
২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তান বাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল, তখন প্রতিবাদস্বরূপ চট্টগ্রামের বেতার কেন্দ্রকে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র হিসাবে অভিহিত করে শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রচার করে। যদিও রাজনৈতিক কারণে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
তবু এ কথা স্বীকার করতে হবে, পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা ওস্বাধীনতার মহান স্থপতি শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার বিবৃতি পাঠ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউর রহমান (পরে সেনাপ্রধান হিসাবে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন)। বিতর্কের কারণ, আওয়ামী লীগ জিয়ার অবদানকে অস্বীকার করে, অন্যদিকে বিএনপি বঙ্গবন্ধুকে উপেক্ষা করে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে তুলে ধরে।
মূলত, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের কারণে পাকিস্তান বিমান বাহিনী ৩০ মার্চ বোমাবর্ষণ করে চট্টগ্রামের বেতার কেন্দ্র গুড়িয়ে দেয়। কিন্তু তার আগেই গায়ক ও লেখক বেলাল মোহাম্মদ সহযোগীদের নিয়ে ট্রান্সমিটার নিয়ে ত্রিপুরায় পাড়ি দেন। সেখান থেকে ৩ এপ্রিল সম্প্রচার শুরু করেন। ৭১ সালের ২৫ মে এটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয় এবং সেখান থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামে সম্প্রচার শুরু করে।
স্বাধীনতা যুদ্ধে নিবেদিত মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবরের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবীত করতে গান, নাটক, কথামালার মত বিভিন্ন সংবাদ প্রচার করা হতো। চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার নামে দুটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানও ধারাবাহিকভাবে প্রচার হতো।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত যখন প্রবাসী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়, একই দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ‘বাংলাদেশ বেতার’ নাম ধারণ করে। এখন পর্যন্ত এ নামেই সম্প্রচার করছে। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয়ের পর ২২ ডিসেম্বর প্রবাসী সরকার দেশে ফিরে আসে এবং একই দিন থেকে ঢাকায় বেতারের সম্প্রচার শুরু হয়।
স্বাধীনতার পর বেতারের পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে। ঢাকার বেতার কেন্দ্র থেকে ৩টি আলাদা চ্যানেল (ক, খ ও গ) ছাড়াও বিভিন্ন বড় শহর থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর, বরিশাল, ঠাকুরগাঁও, রাঙামাটি, কক্সবাজার, কুমিল্লা ও বান্দরবান ইত্যাদি আঞ্চলিক কেন্দ্র অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ৫টি ভাষায় বেতারের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে আসছে।
বেতারে ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের খেলার ধারাভাষ্য শুনেছিলাম। যেদিন কেনিয়াকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়, সেই ঐতিহাসিক ধারাভাষ্য শুনে বারবার উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলাম। যখন খালেদ মাসুদ পাইলট ও হাসিবুল হোসেন শান্ত প্রান্ত বদল করতে সক্ষম হলেন, চারিদিকে উল্লাস শুরু হয়েছিলো।
সেই স্মৃতি অনেকদিন মনে থাকবে। বর্তমানে প্রায় সব খেলাই টিভিতে দেখা যায়, তাই এ প্রজন্মের তরুণদের কাছে এগুলো গল্পের মতই মনে হতে পারে। বাংলাদেশ বেতার এএম ব্যান্ড, শর্টওয়েভ-এ প্রচার হতো। এখন এফএম-এও প্রচার হচ্ছে। ১৪টি বেসরকারি এফএম বেতার কেন্দ্র এবং ১৬টি কমিউনিটি বেতার কেন্দ্র চালু হয়েছে এবং আরও অনেকগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
এফএম ও কমিউনিটি বেতারের অনুষ্ঠান মোবাইল সেট এর মাধ্যমে যে কেউ শুনতে পারে। তরুণদের বড় অংশ বেতারবিমুখ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এফএম-এর কল্যাণে তরুণদের বড় অংশ এখন আবার বেতারের শ্রোতা হয়ে উঠেছে। এছাড়া পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে অনলাইনেও এখন বেতারের অনুষ্ঠান শোনা যায়।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানের গ্রন্থণা, প্রতিবেদন ও চিত্রনাট্য বা পান্ডুলিপি তৈরি এবং উপস্থাপনার মাধ্যমে বেতারের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ১৫ বছরের বেশি। ২০০২ সাল থেকে বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিষয়ক একটি প্রামাণ্যের পান্ডুলিপি তৈরি ও গ্রন্থণার পাশাপাশি গত ৮ বছর উপস্থাপনাও করছি। প্রামাণ্য বলা হলেও বর্তমানে এটি অনেকটা টেলিভিশনে প্রচারিত কথামালা (টক শো) অনুষ্ঠানের আঙ্গিকে প্রচার হচ্ছে।
২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল সময়কালে বেতারের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান যুব তরঙ্গ অনুষ্ঠান গ্রন্থণা করি। একই সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিবেদন লিখেছি। এছাড়া বিশ্ব পরিবেশ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবস উপলক্ষেও নানা অনুষ্ঠানের গ্রন্থণা এবং ক্ষেত্রবিশেষে উপস্থাপনা করতে হয়েছে। ফলে বেতারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গভীর।
শুধু তাই নয়, ২০১১ সালের ২০ জুন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের বেতার (ইউএন রেডিও) কার্যালয় পরিদর্শন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তিসম্বলিত বেতার কার্যালয়ে আমার সাক্ষাতকারও গ্রহণ করা হয়েছিল, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে (ইংরেজি ভাষায়) প্রচার হয়েছিল। এটি আমার জন্য বিশেষ আনন্দের অভিজ্ঞতা।
গত দেড় দশকের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছাড়াও গত তিন দশক বেতারের সঙ্গে পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। ৮৫ সাল থেকে বেতারের নিয়মিত শ্রোতা। বাংলাদেশ বেতারে খেলার ধারাবিবরণী শুনতাম। বেতারে খোদাবক্স মৃধা, মঞ্জুর হাসান মিন্টু, আবদুল হামিদ, মোহাম্মদ মুসা’র মত ধারাভাষ্যকারদের ধারা বর্ণনার কল্যাণে ফুটবলার আসলাম, কায়সার হামিদ, বাদল রায়, জোসি ও নাইজেরিয়ান এমেকা শৈশব-কৈশোরেই আমাদের নায়ক হয়ে উঠে।
এখন টিভিতে খেলা দেখা ও ধারাভাষ্য শোনা যায়। কিন্তু সে সময়ে এসব কল্পনারও অতীত ছিল। বেতারের নিয়মিত শ্রোতা হিসেবে এখন অনলাইনে বাংলাদেশ বেতারের গান, বিবিসির সংবাদ ও নাটক, অডিও ব্লগে নানারকম অনুষ্ঠান শুনে থাকি। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্গোগের দেশ। ঘুর্ণিঝড়, সাইক্লোন, টর্ণেডো, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের সঙ্গী। এ সময়কালে উপকূলবর্তী জনগণসহ মানুষকে সচেতন করতে বেতারের ভূমিকা মূখ্য।
উপকূলবর্তী দরিদ্র মানুষের যেমন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ক্রয় সম্ভব নয়, তেমনি নিরক্ষরদের মধ্যে অনলাইনে সংবাদ পৌছানোও কঠিন। কিন্তু প্রায় সবার কাছেই ছোট ছোট রেডিও রয়েছে। মোবাইলের মাধ্যমেও এখন বেতারের অনুষ্ঠান শুনতে পাচ্ছে।
তাই দুর্যোগকালে বেতারের এ ভূমিকাকে যুগোপযুগী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আর এ কারণেই এ বছর বিশ্ব বেতার দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







