বাংলাদেশে দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচিত হচ্ছে ক্ষতাসীন আওয়ামীলীগ ও বিরোধী বিএনপি- এই দুই প্রধান ও বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ক্ষমতাবলয় বহির্ভূত একটি বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প ঐক্যবদ্ধ শক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন। যে বিকল্প ক্ষমতা জনগণের সমর্থনে ক্ষমতা দখল করতে পারে উপরোক্ত দুটি ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতা বহির্ভূত শক্তিশালী দল কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে জঞ্জাল সমূহ দূরীভূত করে একটি প্রকৃত অর্তে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই ঘোষিত লক্ষ্যের কথা তাঁরা নানা বক্তৃতায় লেখনী প্রভৃতির মাধ্যমে লক্ষবার বলে আসছেন। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না।
এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে দফায় দফায় নির্বাচনের মাধ্যমে নানা সময়ে ক্ষমতাসীন হওয়া দল ঐ দুটির মধ্যেও যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তম দল এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তাদের নেতৃত্বেই হয়েছে। আবার নেতৃত্বের আসনে না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ়ভাবেই ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালী-মোজাফ্ফর), বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি, রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টলীগ প্রভৃতি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই মুক্তিযুদ্ধোত্তর সংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ। ঐ নির্বাচনে মাত্র একটি বাদে সব কটি আসনেই আওয়ামীলীগ বিপুল বিজয় অর্জন করেন। তাঁরাই হল প্রথম সংসদের সদস্য রাষ্ট্রপতির একটি ……ভিত্তিতে।
ঐ সংসদ বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনা করেন যার মৌলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সর্বাঙ্গীনভাবে অনুমোদন করায় দলটির গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি দেশে-বিদেশে বিপুলভাবে প্রসংসশিত হয়। উলেখ্য যে পাকিস্তান ছিল একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র যা পুরোদস্তুর ধর্মভিত্তিক এবং সাম্প্রদায়িকতায় পরিপূর্ণ। তদুপরি মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও পাকিস্তানে আজ পর্য্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হয় নি- আজও না।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্মই তো সামরিক শাসনের কঠিন জোয়াল ভেঙ্গে এক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। তার অঙ্গীকার গণতন্ত্র। কিন্তু সে অঙ্গীকার ও সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট ভোরে সামরিক বাহিনীর একাংশ ও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত দেশী-বিদেশীদের ষড়যন্ত্রে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল সামরিক শাসন জারী করে সকল গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে।
মেজর জিয়া মোশতাককে সামনে এনে শাসনক্ষমতা জোর করে দখল করে। শুরু হয় বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণ প্রক্রিয়ার। এই প্রক্রিয়ায় সামরিক শাসন উৎখাত হওয়া সত্বেও আজও অব্যাহত রয়েছে। এই অবস্থাতে মুক্ত হওয়ার কাজে ক্ষমতাশীন আওয়ামীলীগ সরকারের নিকৃষ্টহতা পরিস্থিতিকে দিন দিনই জটিল করে তুলছে। অবশ্য বর্তমান সরকারের এ ক্ষেত্রে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে।
১৯৭১ এ পাক-বাহিনীর দোসর সেজে পাকিস্তান ও ইসলাম রক্ষার নামে জামায়াতে ইসরামী যে ভায়াবহ তান্ডবলীলা চালিয়েছিল বাঙালি হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান নির্বিশেষে ৩০ লাখ স্বাধীনতাকামী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে, তাদের ঘর বাড়ী সহায় সম্পদ পুড়িয়ে দিয়ে, লক্ষ লক্ষ বাঙালী বিবাহিত অবিবাহিত নারীকে ধর্ষণ ও নির্মম নির্যাতন করে সেই কুখ্যাত ফ্যাসিবাদী দলের শীর্ষে নেতাদের একাংশকে ট্রাইব্যুনালে বিচারের ব্যবস্থা করে বহু প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে।
কিন্তু সারা বিশ্বের গণহত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইতিবাসকে উপেক্ষা করে জামায়াতে ইসলামীসহ সকল ইসলাম পন্থী দলকে আজও বে-আইনী ঘোষণা না করায় তারা স্বাধীন এই দেশে বৈধ আবস্থানের সুযোগ নিয়ে এই সুদীর্ঘ সময়ে তারা ফুলে ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে বিস্তর আর্থিক সক্ষমতা তৈরী হয়েছে দেশী-বিদেশী সহায়তায়, বেতনভ’ক নেতা-কর্মী পুষছে হাজারে হাজারে, সর্বত্র তাদের প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছে হাসাপাতাল-ক্লিনিক, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রভৃতি গড়ে তুলেছে, অর্থনীতির নানাক্ষেত্রে তাদের পুঁজি বিনিয়োগ করে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা আয়ের উৎস তৈরী করেচে, নাস্তিক আখ্যা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষীয় ব্লগার,বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিককে নির্মমভাবে হত্যা করছে প্রাণ নাশের হুমকী দিচ্ছে, মসজিদ মাদ্রাসাগুলিতে তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, ব্যাংক-বীমা, রিয়্যাল এস্টেট ব্যবসা বহুদিন যাবৎ নির্বিঘেড়ব পরিচালনা করছে।
গণদাবী সত্বেও এবং সুপ্রিম কোর্টের রয় জামায়াত প্রভৃতি নিষিদ্ধ ঘোষণার অনুকূলে থাকলেও সে পথে সরকার হাটছে না। উল্টো জানা যাচ্ছে, সরকার জামায়াকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রার্থনা জানিয়ে আদালতে মামলা দায়েরের দীর্ঘশুত্রিতার পথে যাবার কথা ভাবছেন। অপর পক্ষে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলে বহু এলাকায় জামায়াতীরা আওয়ামীলীগে সসম্মানে ঢুকে চেয়ারম্যান পদে বহু জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবর্তীণ হচ্ছে।
সাপ্তাহিক শনি রবিবারের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ছুটির পরিবর্তন ঘটিয়ে শুত্রবার শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন নির্বাচন করে ইসলাম পস্থীদের খুশী রাখার চেষ্টা করছে যা পাকিস্তান আমলেও ছিল না ছিল না ৯৬ সালে বর্তমানের আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পূর্ব পর্যন্ত ও। ফলে প্রতি সপ্তাহে একটি করে আমদানী-রফতানি ব্যহত হচ্ছে। ব্যবসায়ী সমাজের এই দাবী অস্বীকৃত হচ্ছে স্রেফ মোল্লা-মৌলভীদেরকে খুশী রাখতে। তদুপরি নানা সময়ে নির্বাচনকে উপলক্ষ্য করে অথবা সম্পত্তি দখল ও হিন্দুদের এদেশ থেকে বিতারণের লক্ষ্যে বাড়ীঘর জবর দখল প্রভৃতি কাজও বিনা বাধায় অব্যাহত আছে।
২০০১ সালের নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে ও পরে সংঘটিত বিশেষ করে দক্ষিণ বঙ্গে যে হাজার হাজার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছিল তার তদন্তের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমিশন প্রদত্ত কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার সাম্প্রদায়িক ঘটনার সাক্ষ্য-প্রমান খুঁজে পাওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে ঐ ঘটনা সমূহের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে শাস্তি বিধানের সুপারিশ কমিশনের চেয়াম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারক শাহাবুদ্দিন চুপ্পু জানান সত্বেও আজতক সরকার একটি মোকর্দমাও দায়ের না করে প্রকারন্তরে দায়ী আসামীদেরকে উৎসাহিতই করেছেন।
তা হলে এ দেশে সাম্প্রদায়িকাত প্রতিরোধে এবং শাষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার বঙ্গবন্ধুর প্রত্যয় যে বর্তমানের আওয়ামীলীগ পূরণ করতে অনাগ্রহী তা অত্যন্ত সুষ্পষ্ট।এখন তা হলে দেশকে পুনরুদ্ধারের পথ ও পস্থা কি হতে পারে ? মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ধারায় দেশটাকে ফিরিয়ে আনা যাবে পুনরায় কীভাবে ? এর কোন সোজাসাপটা উত্তর নাই। এক কথায় জবাব দেওয়াটাও দুরূহ বটে। তাই যতটুকু উপলদ্ধিতে আসে যদি মানুষের দিকে তাকাই মানুষের কাছে সোজা উত্তর। আওয়ামীলীগ ব্যর্থ। সুতরাং……….। সুতরাং কি ? প্রায় সকলেই বলে উঠবেন সমশ্বরে বি.এন.পি নেতৃত্বাধীন সাবেক চার দলীয় জোট অথবা বর্তমানের ২০ দলীয় জোট। এটা কি আমরা এত সহজে মেনে নিতে পারবো ? বিএনপি জিয়ার আমলে প্রায় ছয় বছর এবং খালেদা জিয়ার আমলে দশ বছরেরও বেশীকাল ক্ষমতাসীন থেকে কি করেছে ?
জাতীয় ভাবে বলতে গেলে দেশের পূর্বস্থাপিত কলকারখানাগুলিকে চালু করার নামে পুনরায় তা বেসকারী মালিকানায় ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। পরিণতি ? পরিণতি হলো বঙ্গবন্ধু সমস্ত শিল্প কারখানাকে জাতীয়করণ করেছিলেন, বি.এন.পি এসইে তা বিজাতীয়করণ করে উপযুক্ত মূল্যে বেসরকারী মালিকানায় হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে জলের দামে সেগুলি বেসরকারী শিল্পোদ্যোক্তাসহ চোর চোট্রারা কিনে নিয়ে তা আবার বেশী দামে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়। কেউই তা চালু করে না বরং মেসিনপত্র, দালান কোটা, চেয়ার-টেবিল এমন কি জমি জিরাত যা কিছু ছিলো সবই বিক্রি। আর সীমানা প্রাচীরের ইগুলি পর্যন্ত। মাঝখান থেকে ক্ষতি বা লোকসানের পালা গুনতে হলো সরকারকে ও অতীতের সেই লাখ লাখ কর্মচারীকে। কর্মচারী শ্রমিক সবাই বেকার হয়ে দারিদ্রের কষাঘাতে কেউ বা রিক্সা চালক, কেউ বা পথিপার্শ্বস্ত চায়ের দোকানের স্বল্প বেতনভুক কর্মচারী, কেউ বা ফেরিওয়ালা বাকীরা অনেকেই পেটের জ্বালায় কচু-ঘেচু খেয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে বাধ্য হলো।
এর নাম মুক্ত অর্থনীতি এখানে অর্থাভাবে অনাহারে দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতে মৃত্যুবরণের সীমাহীন স্বাধীনতা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চরম বিরোধীতা করেছিলো দিব্যি তারা আবার জেকে বসার অপ্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় রত। কৌশল হলো এমনই যে বাঙালীরা স্বাধীনতা চেয়েছিল পরে বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে। দেখুক তারা ঐ স্বাধীনতার মজাটা কি ?এই ভাবনা থেকেই হয়তো বা তারা আমাদের গর্ব ও অহংকারের গামেন্টস শিল্পকে টুটি টিপে মারার কৌশল নিয়েছে নানা শর্তের বেড়াজালে শ্রমিক স্বার্থের নাম করে। আমাদের বর্তমানকালের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ একের পর শর্ত মানতে মানতে যখন দেখলেন শর্তের আর শেষ নেই তখন প্রকাশ্যেই বলে ফেলতে বাধ্য হলেন, ইহ জীবনে পশ্চিমাদের শর্তপূরণ করা সম্ভব হবে না।
তবে এত কিছু সত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংক তথা আমেরিকার ষড়যন্ত্র উপক্ষো করে ঐতিহাসিক পদ্মাসেতু নির্মাণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তার বাস্তবায়নও শুরু করে দিয়েছেন নিজস্ব অর্থায়নে তা নিঃসন্দেহে গভীরভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। একমাত্র বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি যখন ১৯৭৪ এ কৃত্রিম দুভিক্ষের আভাস পাওয়া গেল তখন তিনি বাধ্য হয়ে আমেরিকার সাহায্য নিতে চাইলে তারা তাতে রাজী হলেও কিন্তু তাতে যেই তারা শর্ত জুড়ে দিলো যে তাদের অনুমতি ছাড়া আমাদের কৃষি বা শিল্পজাত পণ্য কোথাও রফতানী করা যাবে না তখন তিনি আমেরিকাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাট রফতানি করলেন ফিদেল ক্যাস্ত্রের সমাজতান্ত্রিক কিউবার কাছে। ক্রুদ্ধ আমেরিকা তখন জাহাজ ভর্তি ঐ গম ফিরিয়ে সমুদ্র থেকেই ফিরিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন এগিয়ে এলো বিনামূল্যে সমপরিমান গম পাঠাতে।
নেতৃত্বাধীন তাই আজকের আওয়ামীলীগ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামীলীগের সাথে কোন দিক থেকেই তুলনীয় না হলেও (দলীয় সাইনবোর্ড ও প্রতীক ছাড়া) তাদের সাংগঠনিক বিস্তৃতি সুদূর গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ায় নির্বাচনে তাদের বিজয় অর্জন অসম্ভব বা অস্বাভাবিক নয়। সেই সুবাদে কয়েকবার আদর্শ নির্বাচন ব্যবস্থায় তারা বিপুল সংখ্যক আসনে জয়ীও হয়েছে। কিন্তু ইদানিং দেখা যাচ্ছে আওয়ামীলীগ এত কিছু সত্বেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার এক মারাত্মক ক্ষতিকর ঝোকে আট্রন্ত। বিগত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি না এসে যেমন মারাত্মক ভুল করে সাংগঠনিক শক্তি অনেকটাই হারিয়েছে তেমনি আবার আওয়ামীলীগ সংসদে, পৌরসভা ওইউনিয়ন পরিষদ সমূহের সাম্প্রতিক নির্বাচনেও একই আতড়বঘাতী ঝোকে পেয়ে বসেছে। এর পরিণতি ও মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
গণতন্ত্র তো নিবর্ণ রূপ ধারণ করেছেই তেমনিই আবার তাদের আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব কলহে একদিকে যেমন অজস্র বিদ্রোহী প্রার্থী সৃষ্টি হয়ে বহু আসনে তাদের নিশ্চিত বিজয়কে গভীর অনিশ্চয়তার আবৃত করেছে। নির্বাচন কমিশন নামক কমিশনটিও কার্যত: একটি আজ্ঞাবহ কমিশনে পরিণত হয়েছে এবং তা বহুকাল পূর্বথেকেই। তাই নির্বাচনগুলি একেবারেই একতরফা ও প্রহসনমূলক হয়ে উঠেছে। তাই গণতন্ত্র আমাদের দেশে এক বিপদ সংকুল পথ অতিক্রম করছে। তবে কি বিকল্প হিসেবে ধরতে হবে অপর বিরোধী দল বিএনপিকেই ? বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ? একাত্তরে তো তার জন্মই হয় নি। মেজর জিয়া একটি সেক্টরের অধিকর্তা ছিলেন বটে কিন্তু তাঁকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে না। মতলব ছিল ভিনড়বতর যা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। আর তাঁর পতড়বী বেগম খালেদা জিয়া ? আজ যিনি বিএনপির কর্ণধার ? তিনি তো আটক ছিলেন পাক বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে মুক্তিযুদ্ধ চলাকাল পর্য্যন্ত।
মেজর জিয়া বার কয়েক লোক পাঠানো সত্বেও তিনি তাঁর কাছে যাননি। ঐ সময় পাক বাহিনীর কাছে কোন গোপন আঁতাতও তাঁর হয়ে থাকতে পারে যা আমাদের কারওই জানা নেই। তাই তাঁর কাজ কর্ম দেখে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ অছে। কার্যত তিনি পাকিস্তানের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে চলেছে জিয়া বিহীন বিএনপির কর্ণধার হয়ে এযাবৎ। চার দলীয়, ২০ দলীয় জোট কবে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামসহ নানা জঙ্গি সংগঠণকে সাথী বানিয়েছে। তারা তো প্রকাশ্যেই পাকিস্তান জঙ্গী ছিল তাদের হুকুমে বাঙালি নিধন করেছে সাম্প্রদায়িতকার ইন্ধন যুগিয়েছে। ২০০১ এর সাধারণ নির্বাচনে প্রাক্কালে ও পরবর্তীতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঘটলেও তিনি ক্ষমতায় বিষয়েও তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করেন নি। শত্রু সম্পত্তি আইন বা অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইন সব কিছুর প্রতিই নিশ্চুপ আছেন আজও।
এরা হবে আওয়ামীলীগের বিকল্প ? না, কখনোই তা হতে পারে না। কোন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাছে তা কদাপি কাম্য হতে পারে না। তা হলে, সত্যই তো বাম গণতান্ত্রিক শক্তির বিকল্প অবশ্যই নেই। যথার্থভাবে সে বিকল্প গড়ে তুলতেই হবে। তাতে শুধুই কি বামপন্থীরা থাকবেন ? না, তাতে হবে না। আমরা তো জানিই কারা তারা ? সি.পি.বি ঐক্য ন্যাপ, বাসদ, গণফোরাম প্রভৃতি যে সকল দল ১৪ দলের বাইরে অর্থাৎ আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন বলয়ের বাইরে অবস্থান করছেন শুধুমাত্র তাদেরকে নিয়ে? সেটকে বিকল্প বলে হাজারো প্রচার চালালেও পাবে কি তারা প্রয়োজনীয় জনসমর্থন। জনগণ কি তেমন কোন জোটকে বিকল্প শক্তি বলে সমর্থন জোগাতে উৎসাহী আদৌ হবে ? না, বাংলাদেশের জনগণ শক্তি দেখতে চায় শক্তিহীনকে নয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই এদের মিলিত শক্তিকেও কেউ আওয়ামী-বিএনপি বলয়ের বাইরে কোন বিকল্প শক্তি বলে মনে করবে না। এমনকি, ভ্রান্তি ভরা সিদ্ধান্ত নেওয়া ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ, গণতন্ত্রী এঁরা আওয়ামী বলয় থেকে বেরিয়ে এলেওনা ?
তাই, জরুরী নীতিগত কৌশল এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বামপন্থীদের উপযুক্ত মিলিত শক্তি নেই, নির্দ্বিধায় একথা মেনে নিয়ে আজকের জরুরী বাস্তবতা মেনে নিয়ে শত দুর্বলতা থাকা সত্বেও আওয়ামীলীগের সাথে ঐক্য মোর্চা গড়ে তোলা ছাড়া বস্তুত আর কোনো বিকল্প নেই। এটি বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমার ব্যক্তিগত অভিমত মাত্র। সকল বাম শক্তি মিলিত হয়ে নির্বাচনে দাঁড়ালে সংসদে তো দুরের কথা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও একটি আসনও পাওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই। এমন কি আওয়ামীলীগের সক্রিয় সমর্থন ব্যতীত তাঁরা একজন প্রার্থকেও বোধ করি খুঁজে পাবেন না যিনি সম্মত হবেন আওয়ামীলীগের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া নৌকা প্রতীক ছাড়া।
আওয়ামীলীগেরও একলা চলনীতি দ্রুতই পরিত্যজ্য। একলা চললে বিদ্যমান সমস্যাবলীর সামান্যতম কার্য্যকর মোকাবিলা করে পাকিস্তানীকরণ প্রতিরোধ করে মুক্তিযুদ্ধের, চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা যাবে না। তাই তাঁদেরই উদ্যোগী হওয়া উচিত পূর্বলিখিত শক্তিগুলির স্বার্থে ঐক্যমোর্চা গঠনের এবং কমপক্ষে ১০০ আসন তাঁদের জন্য ছেড়ে দিতে। একত্রে প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতেই এমনই ঐক্য আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যদি আমরা এই প্রসঙ্গে পশ্চিবঙ্গের অত্যাসনড়ব প্রাদেশিক বা বিধান সভার নির্বাচনী প্রতিক্রিয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি। সেখানে ক্ষমতাশীন দল মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। বিগত নির্বাচনে তারা কংগ্রেসের সাথে হাত মিলিয়ে ৩৩ বছরে একটানা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা বামফ্রন্টকে ধরাশায়ী করে বিপুল ভোটে আশাতীত বিজয় অর্জন করে।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এই চার-পাঁচ বছরেই তাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি প্রভৃতি এমন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যা অতীতে কদাপি ছিল না। এমন কি, আজ পশ্চিম বাংলায় মানুষের জীবনের গুণগত নিশ্চয়তা নেই। এমন কি নারী নির্য্যাতন, ধর্ষণ, প্রভৃতি বহুকিছুই অতীতের সকল সীমা অতিক্রম করেছে। তাই আসন্ন নির্বাচনে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস জোট বাঁধলো। লক্ষ্য তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে যৌথভাবে বাম-কংগ্রেসী মন্ত্রীসবা গঠনের। কতটা সম্ভব হবে তা কেউ জানে না। তবুও তেমন প্রত্যাশায় বাম-কংগ্রেসী জোট নির্বাচনী জোট গড়ে তুলেছে। জানা প্রয়োজন কংগ্রেসের সাথে বামের সম্পর্ক কদাপি ভাল ছিল না।
বামেরা পশ্চিমবঙ্গের জমিন থেকে কংগ্রেসকে কার্যত: উধাও করে দিয়েছিল। তারা এমন কি, বি.জে.পিকে ঠেকাতে কেন্দ্রে জ্যোতিবসুকে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের প্রস্তাব ও দিয়েছিল। কিন্তু বামফ্রন্টের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য কমিটি তা প্রত্যাখান করার হটকারী সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছিল। জ্যোতিবসু তখনই বলেছিলেন, (…….)। সেই …বামেরা আর করতে রাজী নন। তাই বাম-কংগ্রেসী নির্বাচনী জোট গঠন করে তৃণমুল নেতা মমতা বন্দোপাধ্যায়ের রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে। ক্ষমতা এখন দলীয় প্রার্থীদের অনুকূলে প্রচারণায় পথে পথে হাড় জোর করে ভোটভিক্ষা করে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। শুনা যায়, গোপনে মমতা বিজেপির সাথে আঁতাত গড়ে তুলেছেন বাম-কংগ্রেসের জোটের খবরে ভীত হয়ে। এ উদাহরণ টানলাম-এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বাম গণতান্ত্রিক ঐক্য গঠনে আওয়ামীলীগের সাথেও ঐক্যবদ্ধ হতে ন্যূনতম দ্বিধা করা আত্মঘাতী হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







