দেশের রাজনীতিতে দ্বি-দলীয় বলয়ের বাইরে গিয়ে “মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পূরণ ” করার ডাক দিয়েছে কিছু বাম সংগঠন। ভালো কথা। অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
দ্বি-দলীয় শাসনব্যবস্থার বাইরে বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার নামে আরো কয়েকটি জোট গঠনের চেষ্টা আমরা অতীতেও দেখেছি। দেখেছি “বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ” “বিকল্প ধারা, “এলডিপি” , নাগরিক ঐক্য গণফোরাম জোট” “জাতীয় পার্টি আর চরমোনাইয়ের জোট” “ওয়ান ইলেভেনের কিংস পার্টি” আরো অনেক কিছু। কিন্তু এসব জোট রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু এর কোনো কোন নেতা অবতীর্ণ হন স্রেফ পলিটিক্যাল কমেডিয়ান হিসেবে। ফলে দ্বি-দলীয় বলয়ের বাইরের কার্যকর বিকল্প শক্তির ব্যাপারটি শুধুমাত্র টিভি টকশো আর ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে অদ্যবধি।
নতুন হিসেবে সংযোজিত হলো বামদলগুলোর এই সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম। এই সমাবেশের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও সমাজতান্ত্রিক দল। এদের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে সিপিবি সাবেক রুশপন্থী আর বাকিরা পিকিংপন্থী বলে পরিচিত। বাসদ অবশ্য ভারতবিরোধী হলেও ভারতীয় বাম তাত্বিক শিবদাস ঘোষের অদম্য সেনানী।
গত ২৩ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে চৈনিকপন্থী বলে পরিচিত বাম তাত্ত্বিক বদরুদ্দিন উমর, যার প্রায় প্রতিটি লেখাতেই বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচনা থাকে, (জামায়াতের সমালোচনা করেছেন এমন লেখা আমার চোখে কখনো পড়েনি যদিও) বলেছেন: “একাত্তর সালে কমিউনিস্টদের বিরাট নির্বুদ্ধিতার কারণে ভীষণ ক্ষতি হলো। মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি তো আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে গেল; আর পিকিংপন্থী বলে যারা ছিলেন, তাদের কাণ্ডজ্ঞান কিছু ছিল বলে তো মনে হয় না। আমি তো পিকিংপন্থীদের সঙ্গে ছিলাম, একাত্তর সালে আমি তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখেছি, দেশের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। তারা মাও সে-তুংয়ের যুক্তফ্রন্টের কথা বলতেন, কিন্তু আমাদের এখানে এ রকম একটা যুদ্ধের সময় যেখানে যাঁরা আছেন, সবাইকে নিয়ে যে একটা যুক্তফ্রন্ট গঠন করা দরকার, এই বিষয়টা গুরুত্ব পেল না।
“অবশ্য প্রথমে এ রকম একটা সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে সবার সঙ্গে মিলে কাজ করা হবে, এমনকি আওয়ামী লীগের সঙ্গেও; মাওলানা ভাসানীও একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর ১৪ এপ্রিল চৌ এন লাইয়ের যে বার্তাটা এল, তাতে তিনি বললেন যে পূর্ব পাকিস্তানে যে লড়াই চলছে, সেটা কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদীর কাজ, পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একসঙ্গে থাকতে চায় এবং পাকিস্তান অখণ্ড থাকলেই পাকিস্তানের জনগণের সমৃদ্ধি ঘটবে। তাদের তো এই কথা বলার এখতিয়ার ছিল না। আমি তখন যশোরের একটা গ্রামে ছিলাম, শোনার পরে তাড়াতাড়ি ঢাকায় ছুটে এলাম, এসে দেখি সর্বনাশ হয়ে গেছে। প্রথম দিকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটা দেখলাম একদম উল্টে গেছে। বলা হলো এখন আওয়ামী লীগকে শত্রু মনে করতে হবে; দুই কুকুরের লড়াই আরম্ভ হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে সেই সময় পার্টির দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়। ডিসেম্বরে আমি পার্টি থেকে ইস্তফা দিলাম।”
বদরুদ্দিন সাহেবের বয়ানে উঠে এসেছে তিনটি বিষয়,
এক: দেশে যখন রক্তের বন্যা বইছে তখন উনারা পাকিস্তানের পরম মিত্র চৌ এন লাই এর কথামতোই মুক্তিযুদ্ধ ছিলো “দুই. কুকুরের লড়াই” আর তাদের ভাষ্যমতে শত্রু (!) লীগের (পাকিস্তান আর্মি বা রাজাকার নয়) সাথে মুক্তির লড়াইয়ে যোগ দেয়া ছিলো মস্কোপন্থীদের ভুল।
দুই: ৭১ এ পাকবাহিনী নয়, আওয়ামী লীগকেই শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতেন তারা।
তিন: এ ব্যাপারে মতপার্থক্য হয়ে তিনি ডিসেম্বরে পার্টি থেকে ইস্তফা দেন। মানে পুরো যুদ্ধের ৯ মাস “প্যায়ারে পাকিস্তানে”র সমর্থন করে স্বাধীনতার ঊষা লগ্নে অবস্থা বেগতিক দেখে ‘পল্টি’ খান।
কিন্তু গতকাল মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়া সিপিবির সাথে এক মঞ্চে দাড়িয়ে যখন উনারা “মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পূরণ” করার হুংকার ছাড়েন, তখন আসলেই হাসি চেপে রাখতে কষ্ট হয়। রাজনীতি আসলেই এক বিরাট নাট্যশালা।
আর বাসদের ভাইয়েরাতো নিজেদের ছাড়া অন্যদের “সহি বাম” বলে মনেই করেন না। চট্টগ্রাম দোস্ত বিল্ডিংয়ের বাসদ অফিসের নীচে “সিপিবি হচ্ছে লীগের বি টিম” এই ডায়ালগ দিতে অসংখ্য বাসদ কর্মীকে নিজের কানে শুনেছি। আবার সেই “বি টিম” এর সাথে জোট বাঁধেন কী করে সেটাও একটা গবেষণার বিষয় বটে। কে জানে হয়তো ভারত থেকে “শিবদাস ঘোষ” এর আত্মা আধ্যাত্মিক ই -মেইলে নির্দেশনা দিয়েছেন এই ব্যাপারে। পৃথিবীতে অনেক কিছুই তো সম্ভব।
মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সমর্থক মস্কোপন্থী হিসেবে পরিচিত সিপিবির সাথে চীনের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা এই পিকিংপন্থীদের দলীয় মোর্চা আসলে কতদিন থাকে আর কতটুকু যেতে পারে, সেটা জানার জন্য তাই অধীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষায় রইলাম।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)






