চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবা (পর্ব: বারো)

মিলন ফারাবীমিলন ফারাবী
১:১২ অপরাহ্ণ ১৪, মে ২০১৬
অন্যান্য, শিল্প সাহিত্য
A A

আজ এই রাতে হাজারো মানুষ ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অধীর উৎকণ্ঠায়। খস খস করে শাল পাতা এসে পড়ল গাড়ির পাশেই। মৃদু এক শিহরণ এই পাতা ঝরায়। তির তির করে হালকা ঢেউয়ের মত বয়ে চলা রাতের সময় প্রবাহেও অদ্ভুত শিহরণ।

আব্বা নিশ্চয়ই সবকিছু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে থাকবেন। বড় কন্যা হিসেবে বাবাকে হাসিনার চেয়ে বেশি কে জানে। বাবার রয়েছে বিশাল আকাশ হৃদয়; তার রয়েছে অলৌকিক অনুধাবন শক্তি। তিনি নিশ্চয়ই হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে বাংলার মানুষের সাড়া পাবেন। ঠিকই টের পাবেন মানুষ কী চায়! আম্মা ঠিক বিশ্বাসটিই করেন, সংসারের নিত্য কাজে ভুল হতে পারে; তিনি বেখেয়াল থাকতে পারেন – কিন্তু জনমানুষের কাজে শেখ সাহেব ভুল করতে পারেন না। তারপরও যতক্ষণ না জানা যাচ্ছে ভেতরে কী হচ্ছে; পিন্ডির কুটকচালি শর্ত তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করলেন কিনা; ততক্ষণ টেনশন থাকছেই।

প্রায় এক ঘণ্টা পেরুবার পর দেখা গেল ফৌজী শকটগুলো আবার সচল। হর্নের শব্দ। হেডলাইটের তীব্র ঝলসানো আলো। রাতের আঁধার ফুঁড়ে সেগুলো চলে মেস-গরাদের দিকে। কী হলো? আব্বার কী হলো? আজও কি তবে দেখা মিলছে না তার? মিলছে না পরম আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি!

তরুণ সেই ব্যারিস্টার ছুটে এলেন গাড়ির কাছে। আম্মার মুখোমুখি তিনি। জানালেন, মাথা নত করেননি শেখ সাহেব। তিনি পরিষ্কার ট্রাইব্যুনালকে জানিয়ে দিয়েছেন – আগরতলা মামলা বানোয়াট। ভিত্তিহীন। এই মিথ্যা মামলায় তিনি প্যারোল নেবেন না। এই ষড়যন্ত্রমূলক চক্রান্তের মামলা থেকে নিঃশর্তে মুক্তি দিতে হবে সকল নির্দোষ নিরপরাধ রাজবন্দিকে। অন্যথায় পড়ে থাক পিন্ডির গোলটেবিল। ওই বৈঠকে শেখ মুজিব যাবে না।

ব্যারিস্টারের কাছে জানা গেল – নিঃশঙ্কচিত্তে আবেগমথিত কণ্ঠে শেখ সাহেব নিজেই বলেছেন কথাগুলো। তার উচ্চারণ ছিল দৃপ্ত প্রত্যয়দীপ্ত। মনে হচ্ছিল অক্ষয় আগুনের গোলা বেরুচ্ছে। প্রতিটি শব্দ ছিল লক্ষ্যভেদী। ব্যারিস্টার বললেন, এখন শেখ সাহেবকে নিঃশর্ত মুক্তি না দিয়ে আইয়ুবের সামনে কোনো রাস্তা খোলা নেই। আইয়ুবি চালবাজি শেষ। তার অন্তিম সময় উপস্থিত। লাশ-প্রায় আইয়ুবের ফাঁদে পা দেবেন না শেখ সাহেব।

ব্যারিস্টারকে এবার বেশ উদ্দীপ্ত মনে হলো। আগের সেই দোনোমনার খোলসটি নেই। তার মস্তিষ্কের ভেতরেও মুক্তির মন্দিরের হাজার জানালা খুলে গেছে। তার সেই ম্রিয়মান ভাবটি নেই। কোনো এক প্রবল উচ্ছ্বাসে আন্দোলিত সেও।

Reneta

ব্যারিস্টার বললেন, শেখ সাহেবের বক্তব্যে বেকুব বনে যায় ট্রাইব্যুনাল। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। ট্রাইব্যুনাল আশা করেছিল শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি চাইবেন। কিন্তু মুজিব নিজের কথা নিজেই বলেছেন। এমন অনড়, দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী মানুষটার সাহসী উচ্চারণ শুনে ওরা ভড়কে যায়। পরে আর কী করে! অনির্দিষ্টকালের জন্য কোর্টের শুনানি মুলতবি করে দিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, বল আইয়ুবের কোর্টে ঠেলে দিয়েছেন মুজিব। আর শেখ সাহেবকে ফাঁদে আটকাতে গিয়ে আইয়ুবই এখন অতল চোরাবালিতে পড়েছে। রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি ছাড়া তার সামনে অন্য পথ খোলা নেই। শেখ সাহেব সোজাসাপটা বলেছেন, আইয়ুব খান যা পারে করুক। যদি আমাকে ফাঁসিতে লটকায়; লটকাক। জহুরুল হককে হত্যা করেছে বেইমান-বিশ্বাসঘাতকরা। বিনা বিচারের খুন। ওরা মানবতার কলঙ্ক। ওরা রক্ত ঝরাচ্ছে বাংলার মাটিতে। বাঙালির খুনে বাংলা রঞ্জিত। এই রক্তের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই শেখ মুজিব বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। যদি আইয়ুব খাঁ তাকেও হত্যা করে, সেই শ্রেয়। মুজিব প্রস্তুত। এই মৃত্যু বাঙালিকে দেবে চিরন্তন জীবন-সঞ্জিবনী। তখন বাংলার মানুষ বদলা নেবে আইয়ুবের। নিষ্ঠুর, নির্মম হবে সেই বদলা।

ব্যারিস্টারের কাছে থেকে আব্বার বীরত্বব্যাঞ্জক উচ্চারণমালা শুনে উদ্দীপ্ত হাসিনাও। সত্যিই ভুল করেননি আব্বা। মানুষের ভালবাসায় সিক্ত তিনি। জীবন দিয়ে হলেও ভালবাসার মূল্য দেবেন, সেটাই ধ্রুব সত্য। হাসিনার হৃদয় ও চিত্ত অসীম আকাশের মত উদার বিশাল হয়ে গেল।

মনপবনের নাও বড় উচাটন। ছেঁড়াখোড়া মেঘের মত ধূসর পাল উড়িয়ে কেমন করে ময়ুরপঙ্খী হয়ে পৌছে গেছে বাইগা নদীর বন্দরে – হাসিনার অনেকটাই স্বপ্ন-স্বপ্ন বলেই ঠেকছে। সেই চালতাগাছ; লাল চালতে ফল; একটু কষালো সুমিষ্ট স্বাদ; হলদে ডেউয়া ফল – টক-মিষ্টি মিলিয়ে অপূর্ব খেতে – খালের কিনারে শান্ত হিজল; পলাশ-শিমুল সব অবিকল। বাবার সঙ্গে বাড়ি ফেরা নতুন কিছু নয়। সেবারেরটা ছিল অন্যরকম। আস্ত একটা লঞ্চ রিজার্ভ করে পরিবারের সবাই তাতে যাত্রী। ওয়াজেদও ছিলেন সঙ্গে। বিয়ের পর সেই প্রথম। দাদা-দাদীর দোয়ায় অনেক বরকত। দাদী কপাল ছুঁয়ে দোয়াদরুদ পড়ে ফুঁ দিতেন। আব্বার চোখ বন্ধ। তিনি শান্তটি হয়ে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। দোয়া যখন শেষ – দাদী বলতেন, ভালো থাকিস। সকলের কল্যাণ যখন তোর মোক্ষ ও লক্ষ্য বাবা, তোর জয় সুনিশ্চিত। তুই নিশ্চিন্তে তোর কাজ চালিয়ে যা। এলাহি ভরসা। দাদা ছিলেন অসম্ভব নরম মানুষ। তিনি সন্তানের কপালে বেশ কিছুক্ষণ হাত রাখতেন। স্পর্শ করে দেখতেন। বিড়বিড় করে দোয়া পড়তেন তিনিও।

টুঙ্গিপাড়া সেবার লোকে লোকারণ্য। গ্রামের বাড়িতে মানুষের এমন অঢেল ঢেউ কেউ কখনও দেখে নি। সবাই একনজর মজিবরকে দেখতে চায়। সকালে লঞ্চ যখন গোপালগঞ্জ শহরে ভিড়েছিল।সেখানেও এত মানুষ আগে কেউ দেখে নি। সবাই উৎসুক সত্যিই শেখ মুজিব বেঁচে ফিরল কি না। আইয়ুব সত্যি তাহলে মারতে পারেনি তাকে। অনেকে বাবার খুব কাছে গিয়ে স্পর্শ করেও দেখল। বাবা তখন অসম্ভব আপ্লুত। চোখের কোণে পানি। যে-ই তাকে স্পর্শ করে দেখছে, অদ্ভুত কাণ্ড বাবাও তাকে স্পর্শ করে দেখছেন। কোলাকুলি করছেন। তারচেয়ে মুরুব্বি হলে গভীর বিনয়ের সঙ্গে তার দোয়া নিচ্ছেন। প্রতিটা মানুষ তার আপনজন। প্রতিটা মানুষই চেনা। বাল্যবন্ধুদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। যারা এসেছে বাড়িতে – সবার সঙ্গে সমাদরে বসে কথাবার্তা বলছেন। দেখে মনেই হল না এই গ্রাম, এই বাড়ি ছেড়ে তিনি কখনও অন্য কোথাও ছিলেন। তিনি এখানেই ছিলেন, আছেন থাকবেন।

দাদার বাড়িটা সেই ছোটবেলার মতোই আছে। বদলায়নি। চারপাচঁটা ঘর। ঢেউটিনের চৌচালা ঢেউ খেলানো। দূর করাচি থেকে এক মস্ত শিল্পপতি এই বাড়িতে উড়ে এলেন। হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়ায় এসে নামলেন। সেও এক বিস্ময় তখন। এইভাবে বাতাস উড়িয়ে পিন্ডি করাচি থেকে আগে কেউ কখনো এই সবুজপল্লীতে আর আসেনি। তিনি এসেছেন বাবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে। একটু দেখা করা তার চাই-ই। দেখা না করে তিনি যাবেন না। ব্যাপার কী! বিজনেস টাইকুন হারুন হন্যে হয়ে টুঙ্গিপাড়ায় কেনো? কানাঘুষা শোনা গেল – তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর হতে চলেছেন। রাওয়ালপিন্ডিতে দরবার চূড়ান্ত। আশ্চর্য! তাতে শেখ সাহেবের কী দায়!

বেচারা বুদ্ধিমান। তিনি বৈরী করতে চান না মুজিবকে। পশ্চিমারা হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছে – বাঙালি আর মুজিবকে চটিয়ে মসনদে বসলে তা শরশয্যা বই কিছু নয়।

অথচ মাত্র কয়েকটা দিন আগে চিত্র ছিল ঠিক উল্টো। আইয়ুব আন্ডা-গুণ্ডা নিয়ে শেষ কামড় পর্যন্ত দিয়েছে। মুজিবকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার কত কসরতই না করেছে। মুজিব টলেননি। তাকে প্যারোলে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে বসিয়ে লোক-দেখানো নাটক করতে চেয়েছিল। মুজিব পরিষ্কার নাকচ করে দেয়ায় সে বদ্ধ-কুয়ায় পড়ে যায়। তারপরও তার জল্লাদিপনা যায়নি। বরিশাল, পাবনা রংপুরসহ সারা বাংলায় লাশ ফেলতে থাকে। রাজপথ জনপদ হয়ে ওঠে রক্তাক্ত। বাংলাও পাল্টা ফুঁসে ওঠে। কিসের আইয়ুবি খানসেনা আর খানসামা সরকার! মিছিল আর মিছিল । সভা। জনসভা। পথসভা। ছাত্র-জনতা সবাই বিক্ষুব্ধ। গঞ্জে-হাটে বাজারে শহরে শ্লোগান আর ঝাঁঝাল   শোভাযাত্রা – জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব।

পুুলিশ, ইপিআর, সেনাবাহিনী – কোনো কিছু দিয়ে আর গদি রক্ষা হয় না। গুলি, লাশ, রক্ত – কোনো কিছুতেই আর শেষ রক্ষা হয় না। রক্তের ধারায় জ্বলে ওঠে স্ফুলিঙ্গ। অগ্নিগর্ভ বাংলা। মুজিবকে আর ফৌজীখানায় মৃত্যুকুপে রাখা চলবে না। কারফিউ দেয় পিন্ডি। সেনাটহল-সাতখুন মাফ ফৌজী জঙ্গীদের আর পাত্তা দেয় না মানুষ। বাঙালি ক্রমশই নির্ভিক-দু:সাহসী। মুজিবের অসম সাহস সবার চিত্তে জ্বালিয়ে দিয়েছে নবচেতনার মশাল। রাস্তা যাদের দখলে, লাশের ভয় দেখালেও তারা ঘরে ফিরে যাচ্ছে না।

শেখ মুজিব মুক্ত। বাবাসহ সবাইকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়েছে। আইয়ুব কেমন করে এই জনস্রোত রুখবে? সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআরের সশস্ত্র জওয়ানের কতটাই বা সাধ্যি। গুলি করলে; লাশ ফেললে যে মানুষ পিছু হটে না; তাদের ঠেকানোর কোনো ফৌজীবিদ্যা ওদের জানা নাই। মুক্ত মুজিবকে দেখতে ফেব্রুয়ারির শীতার্ত বিকেলে সারা ঢাকা জনতার অরণ্য। সবাই ছুটে আসছে বত্রিশ নম্বর বাড়িতে। মুক্ত মুজিবকে একনজর না দেখে কেউ বাড়ি ফিরে যাবে না। একদিন আগে ছিল বাঙালির বিক্ষোভ, ঘৃণার বিস্ফোরণ – আইয়ুবের মসনদ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে ঘৃণার বহ্নুৎসব। কয়েক ঘণ্টা না পেরুতেই তা ভালবাসার বিস্ফোরণে পরিণত হলো। একটা মানুষকে অপরিসীম ভালবেসে মানুষ এইভাবে রাস্তায় নেমে আসতে পারে – সে অবিশ্বাস্য দৃশ্য। ঢাকা শহরে ভালবাসার উৎসবের অবিস্মরণীয় মঞ্চায়ন সেই প্রথম। লাখো মানুষের সেই উৎসবের নায়ক বাঙালি এবং শেখ মুজিব। শ্লোগানে উৎসবে একই উচ্চারণ – মুজিব, মুজিব। সম্মিলিত সেই উচ্চারণ গগনবিদারি হচ্ছিল।

পরদিন বিকেলে রেসকোর্সে অভুতপূর্ব দৃশ্য। মুক্ত মুজিব আসবেন। কাল কিছুতেই মানুষকে সামলানো যাচ্ছিল না। সবাই বত্রিশ নম্বর বাড়ির সামনে। শত শত মানুষ বাড়ির ভেতরে ঢোকার উপক্রম। তিলধারণের ঠাঁই নেই। ঘরের মানুষ যে চলবে ফিরবে তারও যেন উপায় নেই। মুজিবভক্তদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও হচ্ছে। সবাই সিঁড়ি বেয়ে একদম বাবাকে ছুঁয়ে দেখতে চায়। কিন্তু বাড়ি তো খোলা ময়দান নয়। সিড়িও বেশ সংকীর্ণ। বাবা কখনও বসার ঘরে, কখনও পূবদিকের নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ওদিকটায় কয়েকটা নারকেল গাছ। অত্যুৎসাহী লোকজন সেই গাছ বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এপাশে ওপাশে আমগাছ, লকট, জামগাছ বেয়ে উঠে পড়েছে মানুষ। গাছগুলো ভেঙে যাবার দশা হলো। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলছে না। কে বলবে কাকে! বাবা বারবারই আবেগে অশ্রুরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন। এ জানালায় ও জানালায় গিয়ে ভক্তদের দেখছেন। হাত নেড়ে সাড়া দিচ্ছেন। লোকজন তাকে দেখে বিপুল উল্লাস করে উঠছে। মুক্ত মুজিবকে দেখতে পেয়েছে তারা।

বাবা ঘরে বসে মোটেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। কেউ একজন নারকেল গাছ থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল। ঠিকই টের পেলেন তিনি। তার তখন ভীষণ উৎকণ্ঠা, ছেলেটা ব্যথা পেল নাকি! তিনি খোঁজখবর নিতে ছুটে যাচ্ছেন জানালায়। মৃত্যুকূপ থেকে হায়েনাদের রক্তপায়ী জিহ্বার নাগাল থেকে বেঁচে ফিরেছেন। শরীর সুস্থ নয়। বিশ্রাম দরকার। বাবাকে কে বলবে সে কথা। কার সাহস! হাসু দুয়েকবার অবশ্য বলেছে। কে শোনে কার কথা! বাবা উল্টো বলছেন, বুঝলি মা, এই ভালবাসাই দিচ্ছে আমায় শক্তি। ওদের আশা-আকাঙ্ক্ষাই আমার দায়। ওরা যেটা চাইছে সেটাই আমার চাওয়াপাওয়া। মানুষ আসলে আমাকে দেখতে আসে নাই। ওরা এসেছে এই ভরসায়, ওদের স্বপ্নসাধ আমি সম্ভবত বাস্তবায়ন করতে পারব। ওরা বিশ্বাস করেছে আমাকে। ওদের বিশ্বাস, তাদের স্বপ্ন সফল হবেই ইনশাল্লাহ। মানুষের এই ভালবাসার প্রতিটি কণায় রয়েছে স্বাধীকারের আকাশচুম্বি স্বপ্ন।

হাসু কী বলবে এই বাবাকে? তার চোখ বারংবার অশ্রু ভারাক্রান্ত মানুষের ভালবাসা দেখে। অন্যদিকে আত্মীয় স্বজন, পরিজন, দলের নেতাকর্মী ভক্ত যে যারাই ভীড় ঠেলে ঠুলে বাবার কাছে আসতে পারছেন – তাদের চোখে কেবলি আনন্দ-বেদনার অশ্রু। শেখ সাহেবকে দেখে তারা অদ্ভুত ধারায় কেঁদে চলেছে। আর চোখ মুছছে। কী করবে! অনেকেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বাসাটা যে একটু খালি করা দরকার, কারও খেয়াল নেই। সবাই যতক্ষণ পারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছে। আম্মা কোথায় বলা মুশকিল। তিনি যে বিশ্রাম নেবেন, কোনো উপায় নেই। তার ধকল গেছে সবচেয়ে বেশি। তিনি এখানে ওখানে ছুটে ফিরছেন। হাসুর বাবার কিছু লাগে কিনা, আত্মীয় পরিজন যারা এসেছেন তাদের দেখভাল; যে ভক্তরা গাছে উঠতে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে তাদের দেখাশোনা – সব তিনি এক হাতেই করছেন। আম্মা তখন অনেকগুলো আম্মা হয়ে সারাবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

কিন্তু সেখানে বত্রিশ নম্বরের সামনে এক চিলতে উঠোন। সমুদ্রের এই উপর্যুপরি ঢেউ ধারণের জায়গা সেখানে কই। বাড়ির সামনে পূবে ও পশ্চিমে, পাশেই উত্তর-দক্ষিণের রাস্তায় উল্লসিত মানুষের পদচারণা। সন্ধ্যে ছাড়িয়ে গেলেও ভীড় বাড়ছেই। বারান্দায় গিয়ে বেশ কয়েকবার বাবা জনতার সান্নিধ্যে দেখা দিয়েছেন। তাতে মানুষের আশা ও সাধ মিটছে না। তারা মুজিবের কণ্ঠ শুনতে চায়। বজ্রকণ্ঠ শুনে আশ্বস্ত হতে চায় – মুক্ত মুজিব বাঙালি ছেড়ে কোথাও যাবে না। তখনই সিদ্ধান্ত পরদিন রেসকোর্সে হবে মানুষের সঙ্গে দেখা। বাবা কথা কইবেন। এত ধকলের মধ্যেও বাবা শহীদ মিনার ঘুরে এসেছেন। ফুল দিয়েছেন শহীদ বেদিতে। ওই জায়গাটা বাঙালির শপথের। ওই জায়গাটা বাঙালির শক্তি অর্জনের। ট্রাকে চড়ে বাবা গিয়েছেন। জনতাও গেছে পিছু পিছু। গভীর রাত অব্দি মানুষ বত্রিশ নম্বর ছাড়ল না। বত্রিশ নম্বর আর মুজিবের বাড়ি নয়। এই ঠাঁই হল বাঙালির আশা আকাঙ্ক্ষার ঠিকানা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ যেখানে; সেটির সামনে রাস্তা। এপারে রেসকোর্স ময়দানের উত্তর কোনা। মঞ্চ হয়েছে সেখানে। বেশ উঁচু। মুজিব দাঁড়ালে বিশাল ময়দানের সব জায়গা থেকে দেখতে পাওয়া চাই। সেটা না হলে জনতাকে প্রশান্ত করা যাবে না। বত্রিশ নম্বরের গতকালকের ঢেউ বিশাল ভয়ংকর হয়ে রেসকোর্সে আছড়ে পড়ল। মানুষ আর মানুষ। লাখে লাখে মানুষ। সবাই উৎকীর্ণ। অনেকেই গতকাল থেকেই রাস্তায়; বত্রিশ নম্বরের ঠিকানায় কাটিয়ে দিয়েছে সারাটা রাত। বাড়ি ফেরে নাই। বাবা যখন বিকেলে মঞ্চে উঠলেন – মুজিব মুজিব জিকিরে ময়দান মুখরিত। মিলিতকণ্ঠের সেই উচ্চারণ শব্দ-গোলার মত আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করছিল। মনে হচ্ছে আইয়ুবশাহীকে পায়ের নিচে দাবড়ে ফেলার জন্য শিঙ্গা বাজছে। বাবা দাঁড়াতেই যুদ্ধ দামামার মত অবিরাম হাততালি। থামতে চায় না সেই গগন-প্রকম্পিত শব্দ। সেই শব্দের মাঝেই তরুণ তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা দিলেন – বাংলার মানুষ আজকে থেকে মুজিব ভাইকে বঙ্গবন্ধু বলে ডাকতে চায়। তোফায়েলের উচ্চারণ মাইকে কতদূর শোনা গেছে বলা মুশকিল। দামামা বদলে গেল – এবার হাততালি আর বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু সম্মিলিত আওয়াজ। সেই জিকির থামানোর কারোরই সাধ্যি নেই।

বাবা দাঁড়িয়ে। জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু। চোখের জলে আবেগরুদ্ধ মানুষটার উচ্চারণ অনিরুদ্ধ রইল না। জনতাও কাঁদছে। বঙ্গবন্ধু কী বলবেন – সবাই শুনতে উদগ্রীব। বাবা পরিষ্কার বললেন, এই গণসংর্বধনা আমার চাই না। আমি সংবর্ধনা নিতে আসি নাই। এই বঙ্গবন্ধু সম্বোধন আমি চাই না। এই সম্মান আর সম্বোধনের জন্য আমি আসি নাই। আমি শুনতে এসেছি বাংলার মানুষের অন্তরের আহবান। আপনারা, বাংলার মানুষ যা চাইবে – সেটাই আমার শিরোধার্য। আপনারা যা চাইছেন সেটাই আমার চাওয়া পাওয়া। ফাঁসির মঞ্চ বানিয়ে কোনো লাভ নাই। জেলজুলুম ফাসি কারাগার ওসবের ভয় দেখিয়ে বাংলার দাবি আটকানো যাবে না। আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নাই। একদিন না একদিন মরবোই। ভয়কে আমরা জয় করতে শিখেছি।

এদেশের মুক্তি অনিবার্য। বাংলার জনগণের জয় হবেই। জনগণের দাবি মানতে হবেই। বাঙালি যে গুরুভার দায়িত্ব আমায় দিয়েছে, সে মহাকর্মভার আমি মাথা পেতে নিলাম। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, বিশ্বাস রাখুন – আমি যদি এদেশের মানুষের মুক্তি আনতে না পারি; জনগণের দাবি আদায় করতে না পারি; এই সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা থেকে পিছু হটব না। জনগণের জন্য জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাব। এ দেহে যতক্ষণ আছে প্রাণ, যায় যদি যাক প্রাণ; জেলজুলুম কারাগার কোনো কিছুই আমাকে লক্ষ্যবিচ্যূত করতে পারবে না। বাংলার মাটি আমাকে ভালবাসে। বাংলার মানুষ আমাকে ভালবাসে। আমিও বাংলার মাটি ও মানুষকে ভালবাসি। ভালবাসার এই অচ্ছেদ্য ঋণ আমি জীবন দিয়ে হলেও শুধব।

বিশাল সেই জনসভায় সেদিনই বোধ হয় প্রকাশ্যে বাবার শপথ গ্রহণ হয়ে গেল। তিনি শপথ নিলেন বাঙালির সামনে দাঁড়িয়ে। কোনো রাখঢাক করেননি। সব পরিষ্কার অকৃত্রিম অনির্বাণ বজ্র উচ্চারণ। হাসিনাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন। বাবা আজ শপথ নিলেন তার জীবনকে বাজি রেখে। হাসু জানে, এই কথা বাবা রাখবেনই। কোনো বন্ধন দিয়ে তাকে আর আটকে রাখা যাবে না। বাবা বার বার মৃত্যুর কথা কেনো বলছেন? একের পর এক মৃত্যুকূপ , মৃত্যুভয়ংকর অগ্নিকুণ্ড তিনি অকুতোভয়ে পেরিয়ে আসছেন। সর্বশেষ আইয়ুবি ফাঁসির দড়িও তিনি তুচ্ছ করে বাঙালির দাবির পক্ষে দাঁড়ালেন। এখনো কি তার অগ্নিপরীক্ষার কালাকাল কাটেনি? এখনো কি অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর কোনো ভবিষ্যত? আব্বা কি সেই ঝুঁকিপূর্ণ আগামীর প্রতি ইঙ্গিত করলেন? হাসুর মনটা কেমন বিষাদে ভরে গেল। মানুষকে ভালবাসার রাজনীতি কি তবে জীবন হাতে নিয়েই চালিয়ে যেতে হয়? নিজের প্রাণকে রাখতে হয় আত্মোৎসর্গের যুপকাষ্ঠে!

এই মহাকর্মভার কবে শেষ! বাবার কবে মিলবে ছুটি! কবে তিনি বিশ্রাম নিতে পারবেন। মৃত্যুর সংজ্ঞা কী! মৃত্যু কি কেবলি রুপান্তর? জীবন যদি হয় সচলতা, প্রাণের স্পন্দন। তাহলে মৃত্যু কি প্রাণের অবসান! মৃত্যু মানে কি প্রবল, অবর্ণনীয় যন্ত্রণা, কষ্ট-বেদনা আর ভয়-আতঙ্কের সমাহার? কিন্তু বাবা যে মৃত্যুকে ভয় পাননি মোটেই। তিনি সহজভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছেন সবসময়। মা গো জন্ম মাত্রই মৃত্যু একটি অলঙ্ঘনীয় সত্য। কাপুরুষ ভীতু পলায়নপর আতঙ্কগ্রস্তের জন্য মরণ বড় ভয়ংকর। বড়ই কষ্ট ও যন্ত্রণার। কাপুরুষ অনেক আগেই মরে যায় ভয় ও কষ্ট-যন্ত্রণার কল্পনায়। কখন তার প্রাণ দেহ ত্যাগ করে সে টেরই পায় না। সে যে মরেই ছিল জীবনভর। এজন্য তাকে মৃত্যুভয় দেখিয়ে যন্ত্রণা কষ্ট দেয়া যায় বার বার। তাকে দিয়ে অন্যায় করিয়ে নেয়া সম্ভব। কিন্তু মরণেরে নিয়েছে সহজে, যে কিনা মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুত, তাকে আর ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। আমি যখন শৈশবে কৈশোরে বাইগার আর মধুমতির তীব্র স্রােতে সাঁতার কেটেছি – এপার ওপার করেছি – তখন তো আমাকে কুমিরে টেনে নিতে পারত। সে আশঙ্কা আশৈশব আকৈশোর তো ছিলই। কম দুরন্তপনা করিনি।

পশ্চিমা পাঞ্জাবিরাও সেই যৌবন থেকে কম চেষ্টা করেনি। আর যখন টের পেল আমি বাঙালির স্বাধীকারের কথা বলছি। আমার কণ্ঠ দিয়ে বাঙালির স্বাধীন চেতনা শত পুষ্প-পল্লবে বিকশিত – তখন তো ওরা পাগলা ডালকুত্তা হয়ে যায়। আমাকে হত্যা করার জন্য পদে পদে ষড়যন্ত্র করেছে। ভয় দেখিয়েছে। আমাকে আতঙ্কে নীল করতে চেয়েছে। ওরা চাইলে ক্যান্টনমেন্টে আমাকে সার্জেন্ট জহুরুল হকের মতো হত্যা করতে পারত। ওদের যেমন মাথা মোটা আর ওরা যেমন বর্বর। ওদের পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব ছিল না। জঙ্গি আর বর্বরদের যেটা হয় – ওরা নিজেরা মরণকে বড্ড ভয় পায় বলে ভাবে অন্যদেরও মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে কাবু করতে পারবে। সে কারণে সার্জেন্টের কেসটা ছিল টেস্ট কেস। ওরা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছে – ওই মৃত্যুটা সামলাতে পারে কিনা। আগরতলা মামলা পুরোটাই ওদের উর্বর মস্তিষ্কের অতি উর্বর ষড়যন্ত্র মাত্র। বিচার ট্রাইব্যুনাল সবই ছিল প্রহসন। পিন্ডিতে বসে আইয়ুব আগেই রায় চূড়ান্ত করে বসেছিল। তার একটু বিচার-নাটক করাটা ছিল ওর বুনিয়াদি গণতন্ত্রের ভড়ং। কিন্তু সার্জেন্ট জহুরুল হককে পিন্ডির চাল মতো হত্যা করতেই সব পণ্ড হতে শুরু করে। বাংলার মানুষ এইভাবে ফুঁসে উঠবে ওরা হয়তো কল্পনাই করেনি। ওরা স্বাভাবিকভাবেই ভড়কে যায়। তখন পাততাড়ি গুটাতে শুরু করে। আইয়ুব খাঁ মরতে চায় না। ওদের ধ্যানজ্ঞান হচ্ছে অবিরাম ভোগ-বিত্তব্যাসন। জমকালো প্রাসাদ; রাজকীয় জীবন – এই অফুরন্ত ভোগবিলাসের লোভ কেমন করে ওরা সামলাবে?

ইসকান্দার মির্জা যেমন রাতের আঁধারে পিন্ডির রাজ্যপাট সম্পদ লুট করে পালিয়েছে। আইয়ুবও ঠিক তেমনটাই করবে। ওর গদি সরে গেছে। শুধু তার প্রাণ আর বাদশাহী সহায় সম্পদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি পেলেই আইয়ুব সরে যাবে। পিন্ডির মসনদ ওদের কাছে পাকিস্তানকে লুটে পুটে কঙ্কাল বানানোর হাতিয়ার মাত্র। মানুষ ওদের কাছে মোক্ষ নয় – ওদের মোক্ষ আত্মভোগ। এ কারণে পশ্চিমারা যুগের পর যুগ ধরে ঠকবে। কখনও ধর্মের নামে, কখনও ফৌজী লেবাসে ওদের ঠকানো চলবে। ইসলাম ধর্ম কখনোই এই জনগণকে ঠকানোর পারমিশন দেয়নি। বরং সাম্য সমতার শিক্ষা দিয়েছে এই ধর্ম। পাকিস্তানকে ধর্মের এই অপব্যবহারমুক্ত করা না গেলে পশ্চিমারা কখনোই অভিশাপমুক্ত হতে পারবে না। যতই দিন যাবে, বছর যাবে, যুগ যাবে, ওরা ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে আপন ভাইদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করবে। এক মুসলমান ভাই আরেক মুসলমানকে হত্যা করবে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে। ধর্মে মতি ভাল। ধর্মাচরণ অবশ্যই কল্যাণের। কিন্তু ধর্মান্ধতা কখনোই ভালো নয়। ধর্ম যার যার, কিন্তু কর্ম রাষ্ট্র-সমাজ সকলের। নিজ নিজ ধর্ম অবশ্যই ধর্মপ্রাণ পালন করবেন। কিন্তু সকলের কল্যাণ, সমষ্টির কল্যাণ আর রাষ্ট্রের কল্যাণ প্রশ্নে থাকতে হবে নিরপেক্ষ। তখনই আসবে সর্বময় নিখিল সংহতি ও অটুট ঐক্য। এ ছাড়া কোনো দেশ বা জাতি কখনোই অগ্রসর হতে পারে না। মাগো, আজ যদি আমরা ধর্মকে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে নিরপেক্ষ করে দিতে না পারি, তবে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এই ধর্মের নামেই এক মুসলমান তার আরেক মুসলমান ভাইয়ের ওপর হত্যার ফরমান জারি করবে। পাকিস্তান হবে হত্যা ও ধর্মের নামে আত্মহত্যার লীলাভূমি।

বাবা তার নানা বক্তব্যে ব্যক্তিজীবনে ধর্মপালনের সমধিক গুরুত্ব এবং সামষ্টিক জীবনে সকলের সম্মিলিত নিরপেক্ষ ও দেশ কল্যাণী উদ্যোগের কথা সহজভাবেই বোঝাতেন। কিন্তু জামাতে ইসলাম, নিজামে ইসলাম এইসব ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী দেশ জুড়ে অপব্যাখ্যা শুরু করে। ধর্ম গেল ধর্ম গেল রব তুলে তারা রাতের আঁধারে পিন্ডির পদলেহন শুরু করে। ধিক্কৃত ঘৃণ্য মওদুদী পাকিস্তানে মুসলমান বনাম মুসলমান মহা দাঙ্গা বাধিয়ে হাজার হাজার মানুষ খুনে ইন্ধন ও প্রকাশ্য উস্কানি দিয়ে রাতারাতি মশহুর হয়ে যায়। বাংলায় এই বাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় গোলাম আযম নামের এক কলেজ শিক্ষকের নেতৃত্বে। এই লোক সঙ্গোপনে এক ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তৈরি করে, যারা মুসলিম সমাজের প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের তালিকা তৈরি শুরু করে। বাংলায় তারা হিন্দু-মুসলিম ভেদবুদ্ধিকেও সুকৌশলে কাজে লাগায়। আততায়ী কতল ক্যাডার তৈরির তৎপরতা চলে ছাত্রসঙ্ঘ নামক সংগঠনের নামে। কোনো মুসলমান অগ্রসর চিন্তা চেতনার ধারক বাহক হলেই হলো – ওরা টার্গেট করে তাকে। দেশের জেলায় জেলায় এরা তালিকা প্রণয়ন শুরু করে। এরা নাস্তিক, কম্যুনিস্ট, হিন্দুস্থানের দালাল বলে কুৎসা রটনা শুরু করে। মুজিব যেখানে বাঙালিদের একাট্টা করার লড়াইয়ে পুরো জাতিকে অটুট বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ করছিলেন; আততায়ী গোলাম চক্র করছিল ঠিক উল্টো। জনগণের মাঝে সাড়া না পেয়ে হয়ে উঠতে থাকে হিংস্র, বেপরোয়া।

মুসলমানদের আলাদা বাসভূমি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে জিন্নাহ তার স্টেনোকে নিয়ে জন্ম দিয়েছিলেন পাক-ই-স্থান। বৃটিশদের ভেদবুদ্ধির ষোলআনা ফায়দা নিয়েছিলেন জিন্নাহ। বৃটিশদের মনস্তত্ত্ব তার ছিল কাছে থেকে জানা। যে কারণে কীটদষ্ট পোকায় কাটা একটা রাষ্ট্র রাতারাতি জন্ম দেয়া তার জন্য কোনো তিতিক্ষার ব্যাপার ছিল না। তিনি যুগন্ধরও ছিলেন না। ভারতবর্ষের জনগণের কয়েক যুগের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আন্দোলনে সক্রিয়ও ছিলেন না জিন্নাহ। দ্বিজাতি তত্ত্ব আর মুসলিম ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে হঠাৎ সওয়ার হয়েই এই বিলাতি ব্যারিস্টার রাতারাতি নায়ক। সেই জিন্নাহও সিজারিয়ান জন্মোৎসবের লগ্ন শেষেই নবগঠিত পাকিস্তানকে ধর্মনিরপেক্ষ করতে চেয়েছেন। পারেননি। ধর্মান্ধরা তাকে কিস্তি টুপির বাবায়ে আযম বানিয়ে পাকিস্তানকে ক্রমশ বানিয়েছে মানুষ হত্যার কসাইখানা আর স্বদেশ লুটের লীলাভূমি। জিন্নাহর মুসলিম পাকিস্তান অচিরেই মুসলমানের হাতে মুসলমান হত্যার লীলাভূমি হতেও বিশেষ সময় নেয়নি।

শেখ সাহেবের কথা যে এত দ্রুত পাকিস্তানের ললাট লিখন হয়ে দাঁড়াবে, অনেকেই তা কল্পনাও করতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তানি পিন্ডিচক্র আর বাংলার মুণ্ডুখেকো নগণ্য সংখ্যক গোলাম এ আযম ধর্ম-আলখেল্লা পরে ধর্মবল্লম হাতে অচিরেই হত্যার নিষ্ঠুর রক্তনেশায় মত্ত হয়। তাদের টার্গেট বাঙালি হিন্দু। তাদের লক্ষ্য বৃহত্তর বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী। আর টার্গেট ছিল শেখ সাহেব।

বাবাকে হত্যার কম চেষ্টা হয়নি। কিন্তু তিনিও নির্ভীক। এবার রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল। আইয়ুবি চালবাজি। নানা মুনির নানা মত। গোলটেবিল বয়কটের দাবি তুললেন কেউ কেউ। বাবা সবার কথা ধীরস্থিরভাবে শুনলেন। কয়েকটা রাত আক্ষরিক অর্থেই নির্ঘুম কাটালেন। গোলটেবিলে জয়েন, না বয়কট। দু’পক্ষের যুক্তিবিদরা ভারী ভারী তত্ত্ব হাজির করল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কেবল তত্ত্ব-তাত্ত্বিক হলে চলবে না। কর্মভারও যে তার। তাকে নিতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। নেতার দোনোমনার কোনো সুযোগ নেই। তার সিদ্ধান্ত হতে হবে নির্ভুল। আইয়ুব তার গলায় ফাসিঁর দড়ি পরিয়েই ফেলেছিল একরকম। তার চালবাজি ছলবাজি চলবেই। এই চালকেই বাঙালির দাবি বাস্তবায়নের ঢাল বানাতে হবে। আইয়ুবকে ফাঁকামাঠে গোল করতে দেয়া যাবে না। আইয়ুব চায় ওয়াকওভার। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আলাপ করলেন তিনি। মওলানা বয়কট করবেন। গোলটেবিলে যাবেন না। মওলানা ভাসানীকে শ্রদ্ধা করেন বাবা। কিন্তু তিনি শেষমেশ মওলানার পথে গেলেন না। ভিন্নপথে হাঁটলেন। তার মাথায় রাজনীতির কুটকচালির চেয়ে বাঙালির স্বাধীকার আদায়ের প্রশ্ন আগে। এই প্রশ্নে কোন আপোস নেই। যে পথে স্বাধীকার আদায় সুগম ও সহজ – সেই পথই শেখ মুজিবের। গোলটেবিল বয়কট করলেই মওকা নেবে আইয়ুব। বিশ্বকে বলবে, সে সমঝোতা-শান্তি চেয়েছিল। শান্তি বৈঠকে কেউ আসেনি। তাই তার সদিচ্ছা পূরণ হল না।

সে সুযোগ পিন্ডিকে বাবা দিলেন না। ঠিক করলেন, বাঙালির স্বাধীকার আদায়ের জন্য তিনি গোলটেবিলকেও ব্যাবহার করবেন। সতীর্থ অর্থনীতিক, রাজনীতিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নিয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে হাজির। আইয়ুবি চালকে সম্মুখ-সংলাপে নস্যাৎ করতে দু’দফা গোলটেবিলে বসলেন। পিন্ডিকে বেকুব বানিয়ে তিনি সেখানে স্বাধীকারের ইশতেহার – ছয়দফা আর এগারো দফা টেবিলে রাখলেন। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাখলেন। বললেন, এছাড়া জনগণের মুক্তি নেই। রক্ত ঝরেছে বাংলায়। লাশ ফেলা হয়েছে অসংখ্য। জনগণের এই মুক্তির সনদই হবে রক্ত ও শহীদানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। বললেন, ভোটাধিকার হবে সার্বজনীন। সরকার হবে পার্লামেন্টারি। আইন পরিষদ হবে সার্বভৌম। ফেডারেল সরকার দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি দেখবে। দেশ হবে ফেডারেশন রাষ্ট্রসংঘ। অন্য সব বিষয়ে অঙ্গরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় লাহোর প্রস্তাবে যেটা ছিল মূলমন্ত্র। মুদ্রা, অর্থ, রাজস্ব, কর, শুল্ক, বিদেশ বাণিজ্য সব কিছু হবে সংঘভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের স্ব-অধিকার ভিত্তিক। স্ব স্ব হিস্যাভিত্তিক। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত ফেডারেশন যে কেতায় চলছে – এই রাষ্ট্রসংঘ তা থেকে পিছিয়ে থাকবে না।

আইয়ুব খাঁ আর গোলামে আইয়ুবমার্কা সাঙ্গপাঙ্গ দল গোলটেবিলে এই মহত্তম প্রস্তাব মানতে অস্বীকৃতি জানায়। এই প্রস্তাব মানলে পিন্ডির সেন্ট্রাল লুটশাহী আর কায়েম থাকে না। লুটতরাজ ধ্বংস হয় চিরতরে। বাবাও আইয়ুবকে প্রকাশ্য গোলটেবিলে ছিবড়ে-বর্জ্য বানিয়ে ওয়াক আউট করেন বীরের স্পর্ধায়।

যেদিন বাবা ঢাকায় ফিরলেন, বাঙালি বিশাল ভালবাসায় তাকে বরণ করে নিল। বাবা বললেন, পিন্ডিকে লাল সঙ্কেত দিয়ে এলাম। ওরা জনগণের শাসন চায় না। সার্বজনীন বাঙালির দাবি আদায় না করে আমরা ঘরে ফিরব না।

পিন্ডিতে ফৌজী বান্দর নাচ চলছেই। আইয়ুবি মসনদ দু’দিন না যেতেই বাঙালির হুংকারে লণ্ডভণ্ড। তছনছ খান খান। কিন্তু সেটা খানশাহীর মুখোশ বদল মাত্র। আইয়ুব খানশাহীর বদলে পিন্ডির ঘাড়ে চড়ে বসল ইয়াহিয়া খানশাহী। ইনি আবার মদ্যমাতাল। মাথায় মাকাল ফল। পাকিস্তানকে তুঘলকি তাল্লুক ভেবে মার্শাল ল’র পাগলা ঘোড়া দাবড়ে দিল। সুখস্বপ্নে তারা বিভোর – এটা করলে লুটশাহীর মসনদ টলবে না। অটুট থাকবে। সারাদেশে সভা-মিছিল শোভাযাত্রা ধর্মঘট হরতাল রাজনীতি অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করার শাহী ফরমান জারি করে তারা।

বাবা গিয়েছিলেন লন্ডনে। লন্ডন হয়ে বিভিন্ন শহরে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছিল। সার্বজনীন গণতন্ত্র ও বাঙালির স্বাধীকার কায়েমের ইস্পাত-দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা তিনি বিশ্বসভায় তুলে ধরছিলেন। পৃথিবীর পূর্ব দিগন্তে লালসূর্যের মত সমুজ্জ্বল একটি নবীন জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠা ঘটতে চলেছে – সে ধারণা পাচ্ছিল বিশ্ব।

বাংলায় আবার দুঃসময়। ইয়াহিয়ার খানখানান চক্র আর সদ্য-ভূত আইয়ুবের প্রেতাত্মারা বাংলায় আততায়ীর মত ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। ঢাকার আদমজী, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, পার্বতীপুর, রংপুর, সৈয়দপুর সব জায়গায় ওরা বিহারী অবাঙালিদের উস্কে দিতে লাগল। সেই পুরানা ফন্দি। এসব জায়গায় বিহারীদের বসতি বেশি। সুকৌশলে বাঙালিদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হল। এরা ভারত থেকে এলেও মাত্রাতিরিক্ত পশ্চিম পাকিস্তানপন্থি। এই জোশ ও জজবাকে কাজে লাগানো হলো। বেচারারা বাঙালিদের সঙ্গে দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ল। পিন্ডির পান্ডা হয়ে রক্তপাত ঘটাল। ফৌজীশাহী প্রমাণ করতে চাইল বাংলায় অবাঙালি পাকিস্তানিরা অনিরাপদ। পায়ে পাড়া দিয়ে দাঙ্গাফ্যাসাদ আর কি। পিন্ডির মাস্টারমাইন্ড তখন থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছিল। এ কাজে গোলাম আযমের আততায়ী পান্ডাদেরও পেল। ছাত্রসঙ্ঘের জঙ্গিকর্মী-ক্যাডাররা এই সুযোগে তাদের গোপন যুদ্ধের মহড়াও করে নিচ্ছিল। সবকিছু প্ল্যানমতোই এরা করছিল। বাবা লন্ডন বসেই প্রমাদ গুনলেন। তিনি সফর মুলতবি রেখে দ্রুত ছুটে এলেন। যেসব জায়গায় দাঙ্গাবাজি হচ্ছিল – সফর করলেন উপদ্রুত শহরগুলোতে। তিনি রক্তপাতের একদম বিপক্ষে। কিন্তু পিন্ডিরাজ ও গোলামি পান্ডারা রক্তের হোলি খেলে সব কব্জায় রাখতে চায়। মানুষ তাদের কাছে গিনিপিগ বই কিছু নয়। বাবা কঠিন ভাষায় তিরস্কার করলেন। বললেন, এই পুরানা খেলা বাংলার পবিত্র মাটিতে খেলো না। এই বদমাইশি অনেক দেখিয়েছ। মানুষের জানমাল নিয়ে এই রক্তারক্তি বন্ধ করো। এর পরিণতি ভাল হবে না। বাঙালি জাতির দাবি ষড়যন্ত্রমূলক পন্থায় নস্যাৎ করার চেষ্টা করবেন না। বোকার স্বর্গে বাস করবেন না। আমরা জানি, পিন্ডির শাসক গোষ্ঠী কী চায়! আইয়ুব পারেননি। এমনই অনেক ষড়যন্ত্র করেছেন। লাভ হয়নি। সেই খেলার পরিণতিতে তাকে শোচনীয়ভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। সুতরাং টালবাহানা বাদ দিন। অবিলম্বে ইলেকশন দিন। এক মানুষ, এক ভোট। আর কোনো খেলতামাশা নয়। আমরা ইলেকশন, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্বশাসনের দাবি নিয়ে চিরকাল অপেক্ষা করতেই থাকব, এমনটা ভাবা উচিত হবে না।

পিন্ডির ফৌজী পান্ডারা মার্শাল ল’ দিয়ে আইয়ুবি খোলসের মধ্যে থেকেই মসনদকে রক্ষায় নানা ষড়যন্ত্র আঁটতে লাগল। একবার শামুকের খোলসের বাইরে একটু মাথা বের করে। দেখা গেল বিকাল বেলাই আবার খোলসের মধ্যে ঢুকে গেল। ফৌজীশাহীর সঙ্গে মওদুদি-গোলামি নফরজাদারা মিলেমিশে একাকার হতে লাগল। গোলাম দেখল – এই মওকা-এ-আজম কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যায় না। এমনিতে বাংলায় জামাতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম মার্কা পার্টিগুলোর কোনো ভোট নেই। এরা গণতন্ত্র ও জনতন্ত্রের গলা কাটতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। হাতে নিল ধর্ম কার্ড। নাফরমান। বেঈমান। মুশরিক। মোনাফেক এই চক্র। ধর্ম গেল, ইসলাম গেল – ধ্বনি তুলে এরা মওদুদি-গোলামি তত্ত্ব সঙ্গোপনে প্রচার করছিল। কিন্তু বাংলায় কোনো সাড়া নেই। বাঙালির এই বিরাগ তাদেরকে আরও বেপরোয়া করে তুলল। এই কালনাগিনী বেড়ে উঠছে সবার অগোচরে। ওদের বিষ থলিতে বিষ বাড়ছেই। ওরা ধর্মকে বিষাক্ত করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। নাস্তিক-কমিউনিস্ট ধুয়ো তুলে ফৌজীদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। গোলাম সারা বাংলায় আর মানুষ দেখতে পাচ্ছে না। সারা বাংলায় কোনো মুসলমান দেখতে পাচ্ছে না। সারা বাংলায় কোনো বাঙালিও দেখতে পাচ্ছে না। ওরা কেবল নাস্তিক আর নাস্তিক; কমিউনিস্ট আর কমিউনিস্ট দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু বাঙালি তখন স্বাধীকার আর স্বায়ত্বশাসনের জন্য একাট্টা। গোলাম-নেজামীরা ঘেয়ো-কুকুরের মত ছুটে বেড়াতে লাগল নীরবে। নিঃশব্দে। পাগলা-কুকুরের মত বিষাক্ত হয়ে উঠছিল তারা। বাঙালিদের কামড়ে জলাতঙ্কে ভুগিয়ে মারবে – সেই দিবাস্বপ্নে তারা তখন হিংসাকাতর।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির স্মরণসভা মাজার প্রাঙ্গণে। চারিদিকে ইয়াহিয়ার শীতল রক্তচক্ষু। আততায়ী রক্তপায়ীরাও রাতের শ্বাপদ। ৫ ডিসেম্বর। ১৯৬৯। জীবনের মায়া তুচ্ছ বঙ্গবন্ধুর কাছে। জেলজুলুম তার অভিধানে আর নেই বললে চলে। অনেক সহ্য করেছে বাঙালি। অনেক দেখেছে। অনেক অপেক্ষা করেছে। পিন্ডির ফৌজীশাহী বাঙালির ভাগ্য বদলে দেবে না। বাঙালির আদায় করতে হবে বাঙালিকেই। বাবা এ দিন সাফ জানিয়ে দিলেন। পূর্ব পাকিস্তান – ওই লেজুড়ি নাম আর বাংলায় চলবে না। বাংলার নাম হবে বাংলাতে। বাংলার নাম হবে আজ থেকে বাংলাদেশ। আর পূর্ব পাকিস্তান নয়; পূর্ব বাংলা নয়। শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দির মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের পক্ষ থেকে ঘোষণা করছি – আজ থেকে বাঙালি জাতির এই আবাসভূমির নাম হবে বাংলাদেশ।

এ নাম হবে অমর অজর অক্ষয়। এ নাম চিরন্তন ও অনির্বাণ। স্মরণসভাটি বিশাল পরিসরে হয় নি। যারা ছিলেন সবার চোখে আনন্দ অশ্রু। সবাই অনিরুদ্ধ আবেগে কাঁদলেন। কতকাল ধরে সবাই অপেক্ষায় এই নামটির। হাজার বছর ধরে বাঙালি স্বপ্ন দেখছিল। নিজের মতন জ্বলজ্বলে ধ্রুবতারার মতো একটি নাম হবে। যে নাম লাখো বছরে কোটি মন্বন্তরেও থাকবে অমর অক্ষয়। সেই নাম পাওয়া হয়ে গেল।

কিসের ইয়াহিয়ার শীতল রক্তচক্ষু। কিসের গোলামি হায়েনাদের কালনাগিনী ফণা। হায়েনা সর্প কালঘাতক আততায়ীরা চলার পথে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকবেই। কিসের ডর। কিসের ভয়। ওরা অন্ধকারের জীব। বিশাল মিছিল বেরুল অচিরেই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস মুখরিত গানে গানে। শ্লোগানে শ্লোগানে। বাংলাদেশ বাংলাদেশ। আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হলো। হাওয়া জেনে গেল। পাখিরা জেনে গেল। প্রকৃতিও শুনল প্রাণভরে। পাখির কুজনে, শীতের মৃদুমন্দ সমীরণে আর বাঙালির প্রাণের উচ্চারণে সারা বাংলায় আপন নাম বাংলাদেশ।

৭ই মার্চের মাহেন্দ্রক্ষণ আসছে এগিয়ে। শৃঙ্খল আর শিকল ভাঙতেই হবে। শিকল পরার ছল আমাদের শিকল পরার ছল। এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবো রে বিকল। চলছে প্রস্তুতি। চলছে মহড়া। ৭ই মার্চ ।সত্তুরের সেই দিনে ভয়াল ঝড়ের পূর্বাভাস। মুক্ত মুজিব মানেই বাংলামুক্তির সঙ্গীত দিকে দিকে বেজে উঠবেই। অন্যরকম পরিবেশ। অন্যরকম দিন। বাঙালি অধীর অপেক্ষায় বাবা কি বলেন। মুজিবের কন্ঠে জয়ের কোন জয়োল্লাস বেজে ওঠে। রেসকোর্সে সেদিন তিলধারণের ঠাই ছিল না। মানুষ এতই উম্মুখ। মানুষ এতই উদগ্রীব। বিশাল জনসমুদ্র। ময়দান ছাপিয়ে মানুষ মুক্তির আদেশের অপেক্ষায়। বাঙালি ক্রমশই উত্তাল,দুর্বার হয়ে উঠছিল। আইয়ুবকে টেনে নামিয়ে সকলের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। ইয়াহিয়ার নয়া ছলবাজি চালবাজি ক্রমশ অসহনীয় উঠছে। ফৌজীদের দৌড় কদ্দুর, তা জানতে বাকি নেই। পিন্ডির উপর কারও আর ভরসা নেই। পিন্ডি মানেই পাঞ্জাবী। পিন্ডি মানেই খানসেনা। পিন্ডি মানেই লেফট রাইট। সেখানে বাঙালির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। খানসেনারা হাস্যকর হয়ে উঠতে লাগল। তারা নানা প্রচার চালাতে লাগল। খুব নাকি তারা বীর। তাদের এমনই ভয়ংকর বীরত্ব এক একজন একশ জন শত্রুকে ঘায়েল করতে পারে। মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়াতেই এই গাল গল্প। লোকমুখে ভিন্ন পরিহাসও চলছে। এক জজ সাহেব তরল করে বললেন, খানসেনারা মহাবীর। তাদের বীরত্বজ্বালায় পাকিস্তানের প্রান ওষ্ঠাগত। খানসেনারা আর যা পারুক বা না পারুক তারা বার বার নিজের দেশকে জয় করতে পেরেছে। পাকিস্তান আর রাওয়াল পিন্ডি জয়ে তাদের বীর-বীর্য ভূমিকা খাটো করার কোন উপায় নেই। বাঙালির কাছেও খানসেনাদের সেই সাত খুন মাফের আশকারা আর রইল না। ওদের আর মসনদে দেখতে চাইছে না মানুষ। বাবা সব খেয়াল করছেন। কোটি বাঙালির মনের ভাষা তার ঠিক জানা। তাকে পাড়ি দিতে হবে বিশাল পথ। কোন ভুল করা চলবে না। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ অকূল দরিয়ায় বাঙালির জীবননৌকার বৈঠা হাতে নিয়েছেন তিনি। কোটি কোটি মুক্তিপাগল প্রাণ তার নৌকায় সওয়ারী। এই নৌকাকে তার নিয়ে যেতে হবে মুক্তির বন্দরে। তাকে আবেগে ভেসে গেলে চলবে না। খানসেনারা সশস্ত্র। ওদের হাতে মৃত্যু। ওরা রক্তপানের আকাঙ্খায় মত্তহস্তি। ওরা এর মধ্যেই বার বার রক্তাক্ত করেছে রাজপথ। রক্তাক্ত করেছে বাংলা। ওদের পাষাণ হৃদয় কাঁপেনি। ওরা পথ বেছে নিয়েছে হত্যার। হত্যার পর হত্যা দিয়ে বাঙালিকে ওরা দমন করতে চায়। কন্ঠনালী চেপে সকল দুর্বার আকাঙ্খার চিরবিনাশ ঘটাতে চায়। বাঙালির হাতে কোন অস্ত্র নেই। তাদের হাতে একমাত্র মহাশস্ত্রতা হল মুক্তির অবিনাশী আকাঙ্খা। এই নির্বিষ, নিরীহ শস্ত্র দিয়েই বাবাকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। অসম এই যুদ্ধে বাঙালির জন্য এনে দিতে হবে পরম মুক্তির অশেষ নি:শ্বাস। তিনি অভয় বানী শুনতে পেলেন তার অন্তরাত্মার কাছে। অন্তরের অন্তস্থল থেকে অনুভব করলেন বরাভয় উদয়ের পথে শুনি কার বানী ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। বাবা অনুভব করলেন মহাপ্রান মহাজনতার মৃত্যু নেই। মহাজনতার মহাপ্রান আকাঙ্খাই সুনিশ্চিতভাবে বাঙালিকে নিয়ে যেতে পারবে জয়ের বন্দরে। কিন্তু তাকে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলতে হবে সুচিন্তিতভাবে ভেবেচিন্তে। পিন্ডি পদে পদে কন্টক বিছিয়ে রাখছে। বাঙালির মধ্যে নানা বিভক্তি তৈরীর জন্য গোলাম আযম, মুসলিম লীগ রন্ধ্রে রন্ধ্রে তৎপর। বাঙালির মুক্তির তারা বিপক্ষে। তারা পিন্ডির মসনদের ছুড়ে ছিটিয়ে দেয়া হালুয়া রুটি পেয়েই পরম তৃপ্ত। বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন স্বাধীকার অনিবার। অনিবার্য। ৬ দফা বাস্তবায়ন ছাড়া কোন বিকল্প নেই।মানুষ চায় ভোট। সারা বাংলাদেশ পায়ে চষে তিনি দেখেছেন বাঙালির ম্যান্ডেট ৬ দফা। কোন রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজি চলবে না। যারা ইসলাম বিপন্ন বলছেন তারা ধাপ্পাবাজ মোনাফেক বই কিছু নয়। বাঙালির মুক্তির আকাঙ্খায় ধর্ম কোন অবস্থাতেই বাঁধা নয়। বাঁধা হতে পারে না। বরং সকল ধর্ম মানুষের , জাতির মুক্তির দাবিকে সমর্থন করে। সেদিন বাঁধভাঙা জোয়ার উঠেছিল ময়দানে। বাবার কন্ঠে ধ্বনিত হল অমর উচ্চারণ জয় বাংলা। মনে হচ্ছিল হিংস্র গুন্ডা পশ্চিমকে লক্ষ্য করে তিনি বধ ভয়ংকর শব্দবাণ ছুঁড়ে দিলেন। দুটি মাত্র শব্দ। বাংলার জয় কামনা। কিন্তু তা এমনি বিধ্বংসী দিকবিদিক প্রলয়ংকরী জয়োল্লাসে মুখর করে তুললো। লাখ লাখ মানুষ সমস্বরে উচ্চারণ করল জয় বাংলা। আনবিক বোমার চেয়েও তীব্র তেজে সেটি ছারখার করতে চলল পিন্ডিকে। জয় বাংলার জয় । বাংলার জয় অনিবার্য। সেই প্রথম বাঙালির হৃদয়ে দৃপ্ত শপথ দৃঢ়মূল হল। জনজোয়ারে শ্লোগান আর থামতেই চায় না। তোমার দেশ আমার দেশ;বাংলাদেশ, বাংলাদেশ। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। জেগেছে জেগেছে, বাঙালি জেগেছে। অযুত নিযুত শ্লোগানে মুহুর্মুহু শব্দ বান রেসকোর্স ছাড়িয়ে সারা ঢাকা শহরে; ঢাকা শহর মাতিয়ে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। পদ্মা মেঘনা যমুনা কীর্তনখোলা সন্ধ্যা ইছামতি পায়রা নদীতে নদীতে সুর প্রতিধ্বণি তুলে জলের চল চল ছল ছল কল কল ঐকতানে বয়ে চলল সর্বত্র। এই সময়টাতেই বাবা সময়ের নায়ক থেকে সময়ের মহানায়কে পরিনত হলেন। পিন্ডি তখন নিজেদের মস্তক চটকাচ্ছে। মুজিব কেন জয় বাংলা বললেন, মুজিব কেন বাংলাদেশ বলে আপন দেশমাতৃকাকে আহবান করলেন ওদের মস্তিষ্কে চেতনায় কেবল কিলবিল করছিল ঘুনপোকা। আর ঘুঁটে পোকারা তো আছেই। ওরা বাঙালির আপন উচ্চারণকে বাঙালির উচ্চারণ বলে স্বীকার করল না। বরং সরল উচ্চারণকে ঘোলা করে শিকার করতে চাইল বাঙালিকে। কিন্তু বাঙালি তখন আর মৃগয়ার ভীরু হরিনী নয়। জেগেছে জেগেছে , বাঙালি জেগেছে ; জেগেছে হাজার বছরের ঘুম ভেঙে। এই জাগরণ আর স্তব্ধ হওয়ার নয়। জয় বাংলার যে ঢেউ পল্লবিত হয়েছিল রেসকোর্সে সে ঢেউ গিয়ে দুর্বার উৎসবে তছনছ করে দিল রাওয়ালপিন্ডির তখতে তাউস। মদিরার তীব্র নেশা আর জেনারেল রানীদের নিয়ে মত্ত ইয়াহিয়া । তার কাছে একের পর এক দু:সংবাদ আসছিল। বাঙালির জয়োল্লাস এইভাবে রাওয়ালপুরী লন্ডভন্ড করতে ছুটে আসবে খানশাহী তা কল্পনাও করে নি। কুমির-কান্না কাঁদতে বসল গোলাম-নেজামী-খানসবুর চক্র। সত্তুরের জাঁকালো শীতে ওরা পালাবার পথ খুঁজছিল। আর আতিপাতি করে খুঁজে চলছে নতুন ষড়যন্ত্র। রক্তপানের নতুন পেয়ালা। জয় বাংলার জয়নেশায় বাঙালি ওদের ধর্ম-ধাপ্পাবাজি, মোনাফেকির গালে থাপ্পরের বন্যা বইয়ে দিল। যে বাংলাদেশ নাম উচ্চারণকে ওরা নাস্তিক-কমিউনিস্ট দুর্নাম-দুর্গন্ধ ছড়িয়ে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল সেই বাংলায় কোথাও ওদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না। সর্বত্র শেখ মুজিবের জয়। জয় বাংলা, বাংলাদেশ আর ৬ দফার প্রতি নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট। পূর্ব পাকিস্থানের স্থায়ী কবর রচনা করে ভোটের অমোচনীয় কালিতে লেখা হল বাংলাদেশ। সত্তুরের ডিসেম্বরের সর্বপ্লাবী ভোট। বাংলার জন্য নির্দিষ্ট ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০ জিতে নিল আওয়ামী লীগ। রাওয়ালপিন্ডির মসনদ এক ম্যান্ডেটেই ছিনিয়ে নিল বাঙালি। ইসকান্দার-আইয়ুব-ইয়াহিয়ার তখতে তাউস ধুলিসাৎ হয়ে গেল। বাবা কান্ডারি নৌকার। হাজার নদীর অববাহিকা বেয়ে নৌকা নোঙর করল বিজয় বন্দরে। রাওয়ালপিন্ডির মসনদ ছিল দূর পশ্চিমে। সেই পিন্ডি এসে বাবার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। পাকিস্তান এসে পদচুম্বন করল বাংলার।কিন্তু পিন্ডির পান্ডারা তা হতে দেবে কেন! তাদের ছলাকলা শয়তানির শেষ নেই। একটা জায়গায় ওরা বড়ই একাট্টা পিন্ডিতে ওরা বাঙালি রাজ মেনে নেবে না। বাঙালি রাজ মানেই জনগনরাজ এটা মানলে পশ্চিমের জামিনদারি থাকে না। কিন্তু ভোটের ম্যান্ডেট মানলে পিন্ডির বাদশাহী নত মস্তকে ছাড়তে হয়। বাংলার চারণরাজা মুজিবকে রাজাধিরাজ মানতে হয়। জনরাজাধিরাজের কাছে কেমন করে দুর্বুদ্ধিরাজ হেরে যেতে রাজী হবে সে হয় না। ধর্ম নিয়ে দুর্বুদ্ধি;সম্প্রদায় নিয়ে চালবাজি;সাধারণ মানুষের সরল ধর্মবিশ্বাস নিয়ে খেলবাজিতে মেতে উঠল ওরা। ধর্ম গেল, ধর্ম গেল রব তুলল। বাঙালিরা ধর্মপ্রাণ মুসলমান কিনা অবান্তর ফালতু প্রশ্ন তুলে সময় ক্ষেপন করতে লাগল। ফেউগুলো তাদের সঙ্গে আছেই। তাদের ঘেউঘেউ থামছেই না। পিন্ডিঅলাদের হাড়ে হাড়ে বাবা চিনতেন। ওদের বাকাঁনো লেজ যে সোজা হওয়ার নয় ঠিকই জানতেন। ওরা নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করবে কিন্তু সিধে রাস্তায় হাঁটবে না সে কথা বাবার চেয়ে ভাল কার জানা। মুহুর্তের মধ্যে নামকাওয়াস্তে শাসনতন্ত্র পয়দা করে; আবার বলা নেই কওয়া নেই ছিবড়ে বানিয়ে ছুঁড়ে ফেলা সে যে পিন্ডির সেকেন্দারদের নিত্য কর্ম পাকিস্তান পয়দা করার পর এই অনুশীলনীই ধারাবাহিকভাবে চলছিল। জনরাজ কায়েম হতে না হতেই ফৌজী ফরমানে তা বাতিল বন্দুকের নলের সামনে সরকার, সংবিধান জলাঞ্জলি এক ফৌজীশাহর লেজ গুটিয়ে পলায়ন পলায়নপর বাতিলশাহকে ধনদৌলত দিয়ে সহায়তা এই কর্ম করেই পিন্ডির শাহীখানা ভন্ডুল ও লুটপাট চলছিল। পশ্চিমের পাগলাশাহীতে কিছুতেই জনগনরাজ স্থায়ী করা যাচ্ছিল না। বরং তা পরিনত হয়েছিল বিপদজনক তামাশায়। ফৌজীরা জনতার ম্যান্ডেটকে বার বার পদদলিত করে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিল। এই রঙ্গ-একাঙ্কিকা অনন্তকাল ধরে চলতে দেয়া যায় না। কিছু একটা করতেই হবে। যে বাঙালি একবার জেগেছে তাদের আর ঘুম পাড়াতে দেয়া হবে না। বাবা সকল প্রস্তুতিই নিয়ে রাখতে চাইলেন। পিন্ডি যেন আর বাংলাদেশের ম্যান্ডেটকে পদদলিত করতে না পারে সেই ভবিষ্যতের দিকে তিনি তাকালেন।নিরঙ্কুশ অবিনশ্বর জনরায় দিয়েছে কেবল জয় নয় দিয়েছে স্বাধীকার অর্জনের দুর্দমনীয় স্পৃহা ও সৎ সাহস; বাবা ধীরস্থির ভাবে ভেবেচিন্তে এগুতে বদ্ধপরিকর। নতুন বছর ১৯৭১। নতুন যুগেরও শুরু। যুগন্ধর হয়েই তাকে যুগান্তরে যেতে হবে। জানুয়ারি থেকেই নব উদ্দীপনার শুরু। বাতিল নষ্ট জঞ্জাল আর নয়। জনসভাও হলো রেসকোর্সে। শপথ সভাও হল। নৌকার আদলে বিশাল মঞ্চ হল। এই নৌকাই বাঙালিকে নিয়ে এসেছে জয় বাংলার কাছে আবহমান নৌকাকে অস্বীকার করলে চলে না। শিল্পীরা মনের মাধুরী দিয়ে মনোজ্ঞ নৌকা-মসনদ বানালেন। সেখানে জাতীয় পরিষদের বিজয়ী সদস্যরা উঠলেন। শপথ নিলেন শেখ সাহেবের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে। বেইমানী তারা করবেন না। বাঙালি ও বাংলাদেশের সঙ্গে কখনওই বিশ্বাসঘাতকতা নয়। স্বাধীকার , স্বায়ত্বশাসন জনগনের স্বার্থ আদায়ে অটল আপোসহীন থাকবেন। কোন কম্প্রোমাইজ নয়। বাঙালির স্বভাবধর্ম হল তার সংস্কৃতি; তার কালচার। বাঙালির স্বভাবধর্ম হল সকল ধর্মের মেলবন্ধন। সকল ধর্মমত ও সম্প্রদায়ের অটুট ঐক্যে এক হয়ে থাকা। শপথ নেয়া হল তা রক্ষার। কয়েকদিন ধরে চলল নানা অনুষ্ঠান। বাঙালির গান, বাংলার সুর ধ্বনিত হল। প্রানে প্রাণে ছড়িয়ে পড়ল সুর ও সঙ্গীত। ধনে ধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদেরি বসুন্ধরা দ্বিজেন্দ্রলাল গীত হল হাজারো কন্ঠে। সবাই মিলে অযুত কন্ঠে গাইল আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি। বাবার বড্ড প্রিয় রবীঠাকুর। বাবার বড্ড প্রিয় রবীঠাকুরের এই গান। চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রানে বাজায় বাঁশি এমন অমল ধবল অনাবিল অনুভব আর হয় না। বাবার চোখে মহৎ এক স্বপ্ন যদি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়;যদি বাঙালি নিজ ঠিকানা পায় তবে রবীঠাকুরের এই গানখানা যেন জাতীয় সঙ্গীত হয়। ভীষন গম্ভীর; আবেগ আপ্লুত বাবা। তখনই ভবিষ্যতকে বুঝি খোলা চোখেই দেখতে পাচ্ছিলেন। তার মধ্যে বড্ড শঙ্কা সেই মুক্ত স্বদেশে তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা; পিন্ডির রক্তপায়ীরা তাকে বেঁচে থাকতে আদৌ দেবে কিনা কিন্তু কিসের পরোয়া; কিসের ভয় জীবন বাজি রেখে হলেও বাঙালির মুক্তি তার পরম কাম্য। রাওয়াল পিন্ডি যেভাবে দু যুগ ধরে জনগনকে নিয়ে তামাশার খেল খেলছে কেবলি চালবাজি আর খেলবাজি তাতে পিন্ডির তখতে আদৌ জনরাজ কায়েম হবে কিনা সে শঙ্কা ক্রমশ:ই প্রবল হচ্ছিল। ইয়াহিয়া তার খানসেনাশাহী ছাড়ার কথা প্রকাশ্যে বললেন। কিন্তু আইয়ুবি মন্ত্রী ভুট্টো বড়ই দড়বাজ। তার ছলনা ছলাকলার শেষ নেই। ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর কথাবার্তা তালগোল পাকানো। বেশ গোলমেলে। ইয়াহিয়া তার হুকুমকন্ঠকে নমনীয় করলেও ভুট্টোর কন্ঠে বেসুরো বোলচাল। সে আবিস্কার করে বসল ৬ দফা মানলে পাকিস্তান টুকরো টুকরো খন্ড বিখন্ড হবে। উর্দালি উর্দুলা জগাখিচুরি পাকিস্তান টিকবে না। আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছিল পিন্ডির পাকা পান্ডারা সব কিছু পন্ড করতে পাকাপোক্তভাবেই এগুচ্ছিল। লুটরাজের জায়গায় তারা পাবলিকরাজ কায়েম হতে কেমন করেই বা দেয়। স্বদেশ লুটের যে লকলকে জিহবা তারা শানিয়েছে তা কেমন করে সম্বরণ করে। বাঙালিকে আবার বোকা বানাতে হবে। ধোকাবাজি ধাপ্পাবাজি করে বাঙালিরাজ কোনভাবেই পোক্ত হতে দেয়া যাবে না। লুটরাজ কায়েম রাখাই মূল লক্ষ্য তাতে জিন্নাহ পানশালার পাকিস্তান ধুলিসাৎ হোক ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর কিছু যায় আসে না। একাঙ্কিকায় ইয়াহিয়া আর ভুট্টো আলাদা দুই স্পটলাইটে তাদের নাটুকে শৈলী দেখিয়ে যেতে লাগলেন। ইয়াহিয়া বললেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে ঢাকায়। ভুট্টোর কন্ঠে তখন অন্য সুর। সে গলাবাজি করে বললো ৬ দফা নিয়ে মুজিবকে আপোসে আসতে হবে। নইলে ঢাকা অধিবেশনে তার দল আসবে না। তার মানে পিন্ডির ঘড়েল নেপথ্য দখলবাজরা বেঁকে বসল। ভুট্টোর সঙ্গে গোলামচক্র হাত মেলালো। ভুট্টো বেশ রক্তরাগে হুমকিও দিল। বললপশ্চিম পাকিস্তানের কোন সদস্য ঢাকা অধিবেশনে গেলে তার পা ভেঙে দেয়া হবে। ঢাকা হবে পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের কসাই খানা। এই কসাইগিরির গুরু দায়িত্ব ভুট্টো নিজের কাঁধে সাড়ম্বরে নিয়ে নিল। এই খেলতামাশা ভুট্টো ও ইয়াহিয়া জোট পাকিয়ে করছিল। তাদের চালাকি ধরা পড়তে সময় লাগল না। ভুট্টো রক্তপাতের হুমকি ধমকি দিয়ে নির্বিকার। তার আনন্দ রঙ্গ ধরে না। বাবা তখন প্রবল উৎকন্ঠায়। তিনি যে ভবিতব্য দেখতে পাচ্ছিলেন সেই কালোমেঘ ক্রমশই ঘনীভুত হচ্ছিল। তিনি ছিলেন শান্তির সপক্ষে। কিন্তু পিন্ডিঅলারা চায় রক্তপাত। রক্তনেশায় তারা খুবই খোশমেজাজ। তাদের রাজকীয় মৌঁতাতে কোন ঘাটতি পড়ল না। ইয়াহিয়া খান গিয়ে লারকানায় ভুট্টোর বাগানবিলাসে হাজির। সিন্ধুবনে তারা হারিয়ে গেলেন। জানা গেল পাখি শিকারের উৎসবে ভুট্টো ও ইয়াহিয়া মত্ত হয়ে পড়েছেন। ইয়াহিয়ার শিকার খুঁজে দিচ্ছে ভুট্টো। ইয়াহিয়া নিপূন নিশানায় গুলি ছুঁড়তে নিমগ্ন। দুই ফক্করবাজের পাখি নিধন উল্লাসে বলিকাঠে উঠতে চলল জনগনের পরম আরাধ্য ম্যান্ডেট।কিসের জনরায়। ওরা নির্বিকারচিত্তে ক্রমশ পাকিস্তান নিধনযজ্ঞে মেতে উঠল। ওদের কিছু যায় আসে না তাতে। ওদের কাছে গনতন্ত্র, জনরায়, স্বদেশভূমি শিকারের টার্গেট বৈ কিছু নয়। লারকানায় সিন্ধু বনভূমির মুক্ত বিহঙ্গ মারতে মারতে ওরা মত্ত উল্লাসে জগৎ সংসার বেভুল হয়ে পড়ল। মদমত্ত রসে ভরপুর হয়ে রাওয়াল পিন্ডি এসে পৌঁছাল। ইয়াহিয়ার হাতে সদ্য নিহত অজস্র পাখির তাজা রক্ত। মুখে সেই পাখির মাংসের স্বাদ। রসনার ঘোর না কাটতেই সে বললো ঢাকা অধিবেশন বসবে না। বাতিল করা হল তার ঢাকা বৈঠকের ঘোষনা। অনিবার্য কারণে দোহাই দিয়েই সে ক্ষান্ত নয়। সে শাপ-শাপান্ত করল জাতীয় ঐক্য ও সংহতির স্বার্থেই নাকি সে ঢাকা-বধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভুট্টো দিল ইন্ধন। লারকানার জঙ্গলে মায়াহরিনীর পেছনে ছুটোছুটি। গুলি করে হত্যার নৃশংস আনন্দ। উড়ন্ত পাখিকে গুলি করে ফেলে দেয়ার উল্লাস। ভুট্টোর রসে বশে আকন্ঠ নিমজ্জিত মাতালশাহ ইয়াহিয়া পিন্ডির মগডালে বসে কীটদষ্ট পোকায় খাওয়া পাকিস্তানের হৃদপিন্ড বরাবর করাত চালাতে উম্মাদ। বাবা বসে ছিলেন না। পিন্ডির পাগলামো , পাকামো ব্যারাম তিনি জানতেন। ওই ব্যারামখানায় সুস্থ কোন কর্মকান্ড হবে কিনা , তিনি ছিলেন সন্দিহান। তিনি উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন। তিনি হোটেল পূর্বানীতে জনগনের সংবিধানের খসড়া তৈরীর কাজে বিরামহীন খেটে যাচ্ছিলেন। সেই খাই খাটনির দিনেই এলো ইয়াহিয়ার ফরমান। বাঙালির কাছে এই এলান বড়ই আকস্মিক। বড়ই বেদনাদায়ক। মুহুর্তের মধ্যে বাংলা ফুঁসে ওঠে। সারা ঢাকায় প্রতিবাদের তীব্র ঝড়। লাখো মানুষ রাস্তায়। ঢাকা স্টেডিয়ামের পাশে খোলা মাঠে জনতা উপচে পড়ছে। লোকারন্য। কাছেই পূর্বানী হোটেল। মানুষ বাবার কথা শুনতে চায়। উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল জনস্বর। পিন্ডির মসনদে আগুন লাগিয়ে দেয়ার প্রত্যয় সবার মুখে মুখে। জনতার মুখোমুখি বাবা এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ওরা করে চলেছে ষড়যন্ত্র। আর আমরা দিনরাত খেটে চলেছি জনগনের জন্য। ওদের হাতিয়ার চক্রান্ত আর আমাদের হাতিয়ার অটুট মনোবল আর সুদৃঢ় ঐক্য। গত দুই সপ্তাহ ধরে জাতীয় পরিষদে পেশ করার জন্য জনগনের সংবিধানের খসড়া প্রনয়নের কাজ করে চলেছি। জাতীয় ঐক্য আর নিরাপত্তা সংহত রেখে সাংবিধানিক সুরক্ষার বিভিন্ন উপায় আমরা বের করেছি। কিন্তু ওদের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র চলছেই। ঢাকা অধিবেশন বাতিল ঘোষনা গভীর ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি। সকল শুভ প্রয়াসকে ওরা বানচাল করতে চায়। কিন্তু ওদের শেষ রক্ষা হবে না। জনগনের জাগরণ রোখা যায় না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সকল বাঙালি জীবন দিয়ে হলেও এই অশুভ চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে। বাংলা আবার ক্ষুব্ধ মানুষের নি:শ্বাসে প্রকম্পিত। জনতা আবার রাস্তায়। আন্দোলন-সংগ্রামেই আদায় হবে লক্ষ্য। হরতালে অচল হয়ে পড়ল ঢাকা। সারা বাংলাদেশ। তিনদিনের লাগাতার হরতালে অগ্নিমুখর হয়ে উঠল বাংলা। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির জনসভা। বাংলাদেশ জন্মের জনসভা। হাজার বছরের ঘুম ভেঙে জাগবার পূনর্জন্মসভা। জাগ্রত বাঙালি ঘরে ফিরবে না দৃপ্ত শপথ সারা দেশ জুড়ে। লারকানা থেকে রাওয়াল পিন্ডি। ইয়াহিয়ার হাতে বন্দুক। পাইকবরকন্দাজরা সিদ্ধি সাজিয়ে দিচ্ছে কলকেতে। ধুরন্ধর ভুট্টো পাশার গুটি সাজিয়ে দিচ্ছে নিপূণ নৈপূণ্যে। সে জানে, শেখ মুজিব পশ্চিমে এলে সিন্ধুজঙ্গলের নিত্য চড়ই ভাতি লাটে উঠবে। বিত্তবেসাত থাকবে না। বাংলা বসন্ত পশ্চিমেও আনবে মানবমুক্তির জাগরণ। আফিম-ঘুমন্ত পশ্চিমারাও মানুষ-মর্যাদা চাইবে। তারা আর ভূমিদাস থাকতে চাইবে না। মুজিব বড় ভয়ংকর। তার মুক্তির বাঁশির সুর অদম্য;অনিরুদ্ধ। ফৌজীশাহীও ফর্দাফাই হবে। মুজিব একরোখা; বেপরোয়া। পশ্চিমের এই হারাম বাদশাহী সে ছারখার তছনছ করে দেবে। ফৌজী-ফক্করবাজি দিয়েও তার জয়যাত্রা আটকানো যাবে না। ধুরন্ধরের সঙ্গে গোলাম আযমরাও গোপন চক্রান্তে লিপ্ত। ধর্মঢাল ফেলো; এন্টি ইন্ডিয়ান কার্ড ফেলো;অখন্ড পাকিস্তানের ধুয়ো তোল ধুরন্ধর শৃগাল,রক্তপায়ী হিংস্র নেকড়ে-ফৌজ,হায়েনা-ফেউ নি:শব্দ আততায়ীরা লারকানার জঙ্গলে নিকষ অন্ধকারে শলাপরামর্শে ব্যস্ত। একে অপরকে দেখে হাসে। উল্লাস করে। মদ্য-বুদ্ধি ইয়াহিয়াকে শিখন্ডি বানাও। যে কোন মূল্যে শেখ মুজিবকে ঠেকাও। যত রক্তপাত দরকার। কুছ পরোয়া নেই। যত হত্যা দরকার মচ্ছব করো। লাশের পর লাশ ফেল। মুজিবকে রোখো। মুসলিম লীগ-ফৌজী আলামপানা মিলে পিন্ডিতে জাহান্নাম-গুলজারের পরদায়েশী জাহিলিয়ত কায়েম করেছে। ভোগবিলাসের চুড়ান্ত আলোকসজ্জায় রাওয়ালপিন্ডি স্বর্ন-সোহাগা রমনী এই সম্রাজ্ঞী ভোগ পন্ড করতে দেয়া যাবে না। ঢাকা তখন ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। ছাত্র-জনতা এককাতারে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ইপিআর-পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। লাশ পড়ছে। রক্ত ঝরছে। তা দেখে হায়েনার হাসি আর ফেউদের উল্লাসও তীব্র হচ্ছে। গোলাম আযমরা দৌড়ঝাপ করছে লোভাতুর জিহবা ঝুলছে। মুক্তি পাগল বাঙালির রক্তমাংস কতটুকু ছিবড়ে ভক্ষণ করা যায়। রাতের অন্ধকারে আততায়ীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভয় দেখাচ্ছে মানুষকে। মুজিব ইন্ডিয়ান এজেন্ট। কিসের বাঙালি নেতা। সে মুসলমান কিনা সন্দেহ। পিন্ডিতে বসে মুজিবের জন্ম-কাহিনী ফাঁদছে মাতালমদ্যপ বেহুশ লাল্লুপাঞ্জুরা। ছাত্রসঙ্ঘ-নিজামী-গোলাম বশংবদরা তা ছড়াতে ব্যস্ত দেশ জুড়ে। কিন্তু কি ই বা তাদের সাধ্য। বাংলা জুড়ে স্ফুলিঙ্গ। মানুষ মুক্তি চায়।সরকারি অফিস আদালত ,ব্যবসা বানিজ্য গ্রামশহরবন্দর সর্বত্র নতুন দিনের আবাহন। বিচারপতিরা বেঁকে বসলেন। বিবেক তাদের তাগিদ দিচ্ছে। পাশবিক পশ্চিমের আদেশ মানবেন না তারা। ইয়াহিয়া খানশাহী টিক্কা খানকে পাঠাল ঢাকায়। কসাই টিক্কা খান। ফৌজী-অন্দরে তার সুনাম সুবিদিত। কট্টর বাঙালি বিদ্বেষী। হিংস্র, কুচুঁটে।মানুষকে কাবাব-টিক্কা বানাতে তার আনন্দ-উল্লাস। টিক্কা এসেছে নয়া গভর্ণর হয়ে। ইয়াহিয়ার কাছে কবুল করে এসেছে বাঙালির রক্ত-জান-মাল বিনাশ করে সে কব্জা করবে বাংলাকে। কড়কে দেবে মুজিবকে। আদমী নেহি মিট্টি চাহিয়ে। জিন্দা কিংবা মুর্দা মুজিব ও বাংলাকে জবরদখল করবেই। মানুষ তার কাছে ধর্তব্য নয় তার চাই বাংলার জমিনদারি। কিন্তু বাংলা সম্পর্কে সম্যক ধারনাই ছিল না এই দুর্বৃত্তের। টিক্কা এসেই ঢাকা হাইকোর্ট থেকে সপাটে থাপ্পড় খেল। জানিয়ে দেয়া হল অবৈধ টিক্কাকে শপথ করাবেন না প্রধান বিচারপতি। আততায়ী শ্বাপদকুল তবু হতোদ্যম নয়। বাংলার মাটিতে একটি হারাম পাকিস্তান কায়েম করতে আদাজল খেয়ে ওরা ষড়যন্ত্রে মশগুল। ছাত্রসংঘ নেতাকর্মীরা জাল বিছিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের প্রধান কাজ গুজব রটনা। বাঙালির স্বাধীকার চেতনাকে হিন্দুস্থানি চক্রান্ত বলে ব্যাপক প্রচার প্রপাগান্ডা চালাল। কোন সাড়া মিলল না তাতে। (চলবে)

Channel-i-Tv-Live-Motiom

শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সে তীব্র তাপপ্রবাহ: পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু

জুন ২৩, ২০২৬

ইনফান্তিনো ‘বিশ্বকাপ বিক্রি করে দিয়েছেন’

জুন ২৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

দলীয় প্রতীক হারানোর শঙ্কায় মমতার তৃণমূল

জুন ২৩, ২০২৬

পাকা আমে জমলো তারকা আড্ডা!

জুন ২৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপনে বাংলাদেশজুড়ে নানা আয়োজনের ঘোষণা

জুন ২৩, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT