চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবাকে বড্ড বেশি মনে পড়েছে

রণেশ মৈত্র রণেশ মৈত্র
৩:২৪ অপরাহ্ণ ০৫, ফেব্রুয়ারি ২০২২
মতামত
A A
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

আমার বাবাকে আসলেই প্রতিদিনই একবার হলেও মনে পড়ে। তাকে হারিয়েছি আজ থেকে ৬৮ বছর আগে- ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৪। তাকে শেষ দেখা দেখতে পারিনি, শেষ বিদায় জানাতে পারিনি, এমনকি তার জীবনের শেষকটি দিন তার সান্নিধ্যে থাকতেও পারিনি। এ বেদনা আমাকে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে।

আমার বাবা প্রয়াত রমেশ চন্দ্র মৈত্র, যতটুকু শুনেছিলাম, জন্মেছিলেন ১৯০০ সালে। ১৯২০ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়াকালে আমার পিতামহ (ঠাকুরদা) মৃত্যুবরণ করেন। বাবা তখন সংসারের হাল ধরতে আমাদের পৈত্রিক গ্রাম পাবনা জেলার সাঁথিয়া থানার ভুলবাড়িয়া গ্রামে চলে আসতে বাধ্য হন।

গ্রামে এসে ভুলবাড়িয়া প্রাইমারী স্কুলে সহকারী শিক্ষকের পদে চাকরী গ্রহণ করেন। তখন ম্যাট্রিকুলেট হলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও হওয়া যেত। তবে অবশ্যই তাকে জিটি পাস হতে হতো। জিটি মানে গুরু ট্রেইনিং যাকে এখন পিটিআই পাশ বলা হয়। বাবা জিটি না পড়ায় আজীবন সহকারী শিক্ষক পদেই থেকে যান।

এই স্কুলটির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। ইংরেজ আমলের সমগ্র বঙ্গদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এটি। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২৭ খ্রীস্টাব্দে অর্থাৎ আজ থেকে ১৯৫ বছর আগে।

আর পাঁচ বছর পরে স্কুলটির দ্বিশতদ বার্ষিকী উদযাপিত হওয়ার কথা। তবে সরকারি স্কুল হওয়ায় সরকারি উদ্যোগ-আয়োজন পেলে স্থানীয় শিক্ষক, বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকেরা মিলে যথাযথভাবে তা পালন করা সম্ভব হবে। বেঁচে যদি থাকি তবে তো নিশ্চয়ই সে উদ্যোগের অত্যন্ত উৎসাহী একজন হিসেবে সাধ্যে যা কুলোয় তা করবো।

Reneta

স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত নায়েব আলী মন্ডল। স্কুলটিতে তখন এই দুজনই মাত্র শিক্ষক ছিলেন। আমিও ঐ স্কুল থেকেই প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করি। তখন প্রাথমিকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হতো। পঞ্চম শ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হতো।

তখন জনসংখ্যা ছিল অনেক কম। তদুপরি ঐ এলাকাটি প্রধানত: মুসলিম অধ্যুষিত। সে কালে মুসলিম সমাজ লেখাপড়ার দিকে মনোযোগী ছিল না- ফলে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ছিল বেশ কম। ছেলে-মেয়ে উভয়েই পড়তো তবে মেয়েদের মধ্যে মুসলিম পরিবারের মেয়ে দেখাই যেত না প্রায়- ছেলেদের অবশ্য বেশ উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল মুসলিম।

যতদূর মনে পড়ে বাবাই বেশী সংখ্যক ক্লাস নিতেন। তখন প্রাইমারি স্কুলগুলিতে কোন কেরানী বা পিওনের পদ ছিল না। লেখাপড়ার কাজগুলি শিক্ষকরাই করতেন-আর ঘর ঝাড়ু দেওয়া, প্রতি পিরিয়ডে এবং ক্লাস শেষে ছুটির ঘণ্টা বাজানোর দায়িত্ব পড়তো এক এক দিন এক এক ছাত্রের উপর।

কখনও কোন শিক্ষক ক্লাস ফাঁকি দিতে বা কোচিং এ ক্লাস করতে দেখিনি। ক্লাসের পড়াই ছিল প্রধান। আর এমন করে শিক্ষকরা পড়াতেন তা বার্ষিক পরীক্ষা পর্যন্ত  মনে রাখা বেশীর ভাগ ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষেই কঠিন হতো না।

বাবা পড়াতেন, কবিতা মুখস্থ করাতেন এবং সবচেয়ে নজর দিতেন বানান, উচ্চারণ এবং হাতের লেখার পদ্ধতি। হাতের লেখা ভাল করার জন্য “আদর্শ হস্তাক্ষর” “আদর্শ হস্তলিপি” জাতীয় বই নিজে থেকে কিনে দিতেন ছাত্র-ছাত্রীদেরকে যদি তাদের অবিভাবকেরা তা করতে সমর্থ না হতেন। আমি তো হাতের লেখার জন্য অনেকবার বাবার হাতে বেত্রাঘাত খেয়েছি।

ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা কিন্তু কম হওয়ার কথা ছিল না কারণ তখনকার সময়ে ভুলবাড়িয়া ছাড়া আর কোন প্রাইমারি স্কুল বা অন্য কোন বিদ্যালয় ছিল না। সামাজিক পশ্চাতপদতাই ছিল শিক্ষার্থী কম হওয়ার প্রথম বা প্রধান কারণ। আর ছিল দারিদ্র্য। গ্রামে তো ছিলেন ৯৮ ভাগই কৃষক। তারা তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকেও কৃষিকাজের অংশীদার করে ফেলতেন।

বাবা কলকাতা থেকে প্রকাশিত অর্ধ-সাপ্তাহিক আনন্দবাজার পত্রিকা আনাতেন ডাকযোগে। এর জন্যে বছর বছর বাৎসরিক টাকা নির্দিষ্ট পরিমাণে ডাকযোগে। এর জন্যে বছর বছর বাৎসরিক টাকা নির্দিষ্ট পরিমানে ডাকযোগে পাঠাতেন। আমাদের গ্রামে কোন ডাকঘর বা পোস্ট অফিস ছিল না।

ভুলবাড়িয়া ছিল আতাইকুলা পোস্ট অফিসের আওতাধীনে। ডাক পিওন ছিলেন অজিত কাকা। তিনি বাবাকে দাদা বলে ডাকতেন তাই। সেই অজিত কাকা সপ্তাহে তিনদিন আসতেন ভুলবাড়িয়া এবং পার্শবর্তী গ্রামগুলোতে চিঠি, পার্সেল ও মানি অর্ডারে আসা টাকা বিলি করতেন। শিক্ষিতের অর্ডারের কারণে চিঠিপত্রের বা অন্যান্য জিনিস কারও বেশী একটা আসতো না। যদি আসতো তবে অজিত কাকা বাবারগুলি বাবাকে দিয়ে অন্যান্যদেরগুলি ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কাছে রেখে যেতেন। তিনি সন্ধ্যায় বাজারের আসা লোকজনের মাধ্যমে তা প্রাপকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন।

অজিত কাকা শুকনাকালে সাইকেল যোগে আর বর্ষাকালে নৌকাযোগে ভুলবাড়িয়া যাতায়াত করতেন। ভুলবাড়িয়া আসতেন সপ্তাহে তিন দিন। সোম, বুধ ও শুক্রবারে। তখন শুক্রবারে ছুটি থাকতো না। প্রতি সপ্তাহে ঐ তিনদিন ভুলবাড়ীয়া এসে স্কুলে বাবার পাশে বসতেন। বসে গল্পসল্প ও চিঠিপত্র যা থাকে তা বাবাকে দিতেন। বাবার বিস্তর চিঠিপত্র আসতো কলকাতা-মেদিনীপুর, কুচবিহারের মাথাভাঙ্গা প্রভৃতি দূর দূর অঞ্চল থেকে আমাদের আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে।

বাবাও চিঠি লিখতেন খুব। খাম-পোষ্টকার্ড বেশ অনেকগুলি করে কিনে রাখতেন। চিঠিপত্র ছাড়াও প্রতি সপ্তাহে দুই দিন আসতো অর্ধ-সাপ্তাহিক আনন্দবাজার বাবা যার বার্ষিক গ্রাহক ছিলেন।

একদিন অজিত কাকা এসে পত্রিকার প্যাকেট বাবার হাতে দিতেই বাবা সেটা খুলে প্রথম পৃষ্ঠায় আটকলামব্যাপী বড় হরফেছাপা খবরটি দেখেই পত্রিকাটি হাতে নিয়ে প্রধান শিক্ষক নায়ের আলী মন্ডলের পাশে বসলেন।

তাকিয়ে দেখি, দুজনের চোখেই জল। উভয়ে দু’চার মিনিট কথা বলার পর প্রধান শিক্ষক বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন। তাই আজকের অবশিষ্ট সময় এবং আগামীকাল স্কুল বন্ধ থাকবে। পরশুদিন থেকে আবার নিয়মিত স্কুল চলবে। রবীন্দ্রনাথের নামতো তখনও শুনিনি বা তার লেখা কবিতাও পড়িনি। আমি তখন দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ১৯৪১ সাল। শ্রাবণ মাস।
প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমাদের সংক্ষিপ্ত ধারণা দিলেন।

তৃতীয় দিনে স্কুল খুললে আমরা ছাত্র ছাত্রীরা বললাম রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে এক শোক সভা এবং তার কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করেছি। সে কারণে প্রধান শিক্ষকের অনুমতি চাইতেই তিনি তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে টেবিল চেয়ার বেঞ্চ সাজিয়ে আলোচনা সভার ব্যবস্থা করা হলো। আলোচনা করলেন বাবা আর আমরা জনাকয়েক কয়েকটি কবিতা পাঠ করলাম। সেই যে রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় হলো সে পরিচয় দিন দিন নিবিড়ই হয়েছে। বড় হয়ে অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নানা মঞ্চে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেছি। তার “পৃথিবী” “ওরা কাজ করে” “আফ্রিকা” ছিল আমার অত্যন্ত প্রিয় কবিতা আর নজরুলের “বিদ্রোহী”।

রবীন্দ্র চর্চার জন্য ‘শিখা সংঘ’ নামে, পরবর্তীতে উদীচী, জাহেদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ এবং তার পরে “জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ” প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান পাবনাতে গড়ে তুলে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আলোচনা, তাঁর কবিতা আবৃত্তি ও রবীন্দ্র সঙ্গীতের অসংখ্য অনুষ্ঠান করেছি পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীতে এব অন্যান্য স্থানে।

এর পর আসে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ পঞ্চাশের মন্বন্তর বলে যা ইতিহাসে পরিচিত। তখনকার বাংলার মানুষের করুণ চেহারা আমি দেখেছি তাঁদের আর্তস্বরও শুনেছি। ঐ সময় প্রথম দফায় একদিন সন্ধ্যায় খেলার মাঠ থেকে ফিরে বাড়ীতে এসে দেখি, বাবা গালে হাত দিয়ে আমাদের শোবার ঘরের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আছেন। নির্বাক। ছুটে গেলাম রান্নাঘরে মায়ের কাছে। জিজ্ঞেস করলাম বাবা গালে হাত দিয়ে বসে আছেন কেন? মা বললেন, হঠাৎ চালের দাম বেড়ে ১০ টাকা মণ হওয়ায় কি করে পরিবারের সকলকে বাঁচাবেন সেই দুশ্চিন্তায় তিনি ঐভাবে বসে আছেন।

বস্তুত: বাবা তো ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, বেতন মাসে পাঁচ টাকা মাত্র। আর কোন বাড়তি উপার্জন নেই। তাই এমন উদ্বেগ। বাজারে অন্যান্য পণ্যেরও মূল্য বাড়ছে হু হু করে।

জামালপুরে মামার কোন খবর বেশ অনেকদিন পাওয়া যাচ্ছিল না। বাবা হঠাৎ বললেন, সবাই চলো, নীরোদদাকে দেখে আসি। নীরোদ মজুমদার আমার মামার নাম। যে কথা-সেই কাজ। গরুর গাড়ী, বাস, ট্রেন, স্টীমার আবার ট্রেনযোগে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে চলতে গিয়ে পৌঁছালাম ময়মনসিংহের জামালপুরে। দিন কয়েক ওখানে থাকার পর আবার ফিরে আসা। কেউ কিছু মুখে না বললেও, এই মন্বন্তরে মামার পরিবারও যে বিধ্বস্ত-তা বুঝে নিতেই কষ্ট অনুভব করলাম। ফেরত যাত্রা ভিন্নপথে।

গাইবান্ধার বোনারপাড়া জংসনে রেলযোগে এসে কয়েক ঘণ্টা ঐ জংশনের ওয়েটিং রুমে বসে থাকা। ঈশ্বরদীমুখী ট্রেনের অপেক্ষায়। তখন রাত ভোর হয় হয়। হঠাৎ ভোরে বাইরে তাকিয়ে দেখি প্লাটফর্মের এক কোনে মানুষের জটলা। ছুটে গেলাম সেখানে। অত:পর ঈশ্বরদীমুখী হয়ে শিয়ালদহ।

সেখান থেকে বজবজ হয়ে বিড়লাপুর। গঙ্গানদীর তীরে ছোট্ট একটা শহর। খুঁজে শশধর কাকার বাসা পাওয়া গেল। বাবাকে দেখেই শশধর কাকা বললেন, দাদা, বিড়লা জুট মিলসের অফিসে আপনার জন্য একটা ভালো চাকুরী জোগাড় করে নিয়োগপত্র পাঠিয়ে দিয়ে ছিলাম। কিন্তু সে পদ তো খালি নেই।যথাসময়ে না আসায় বা কোন খবর না পাওয়ায় সেখানে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবু এখানেই থাকেন, চেষ্টা করি, সম লাগলেও কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই। আমরা থেকে গেলাম।

শশধর কাকার বাড়ী আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামে।অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন বাবাকে। ১০/১৫ দিনের মধ্যেই তিনি বিড়লা জুট মিলসের দু’তিন জন বড় অফিসারের বাসায় গিয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের টিউটার হিসেবে বাবাকে ঠিক করে দিয়ে বললেন, দাদা দেশের যা অবস্থা তাতে ফিরে না গিয়ে আমার বাসায় ছেলে মেয়ে সহ থেকে টিউশনি করুন। আরও কি ব্যবস্থা করা যায় তা দেখছি। বাবা অনিচ্ছাসত্বেও রাজী হলেন।

কিছু দিনের মধ্যে শ্রমিক কলোনীতে বাবার নামে একটি ছোট্ট বাসা এবং রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করে দিলেন। আমরা সেখানে গিয়ে উঠলাম। আমাকে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেওয়া হলো বিড়লাপুর হাইস্কুলে। বিড়লা জুট মিলসের কারণে বিড়লাপুর একটি ছোট্ট দৃষ্টিনন্দন শহরে পরিণত হয়েছিল। রেশন কার্ডের বদৌলতে আমাদের খাদ্য সংকট মিটলো। বাসা পেয়ে বিনা ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থা হলো। বাবার টিউশনির আয়ে আমাদের ভালই চলছিল।

আমি বাসা থেকে পায়ে হেঁটে স্কুলে যাতায়াত শুরু করলাম। গঙ্গানদীর ধারে ইটের বাধানো মজবুত রাস্তা। মাইল খানেক দূরে ছিল স্কুলটি। যাতায়াতে রোজ চোখে পড়তো অসংখ্য লাশ রাস্তার দু’ধারে পড়ে আছে। সব অনাহারে মৃত্যু। তাদের দাহ বা সৎসারের কোন ব্যবস্থা দেখিনি। সম্ভবত: লাশগুলিকে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হতো-ভাসতে ভাসতে সেগুলি চলে যেতো বঙ্গোপসাগরের অথৈ জলে। মন্বন্তরের ভয়াবহ রূপটি তাই আমি অসহায়ভাবে দেখেছি মমত্ত্ববোধ জেগেছে-কিন্তু কিছুই করার শক্তি ছিল না।

হঠাৎ একটিদন ভুলবাড়িয়া স্কুল থেকে হেড মাষ্টার বাবাকে একটি চিঠি দিয়ে জানালেন, তার সবেতন ও বিনাবেতনে পাওনা সকল ছুটি শেষ। তাই চিঠি পাওয়ামাত্র এসে জয়েন না করলে চাকুরী রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে থানা শিক্ষক কমকর্তা তাকে জানিয়েছেন। আর কি? দে ছুট। এবার ফিরতি যাত্রা ভুলবাড়ীয়া গ্রামে। এসেই বাবা স্কুলের চাকুরীতে যোগ দিলেন। কষ্টের যাতনা বাবার পথ ছাড়লো না।

ইতোমধ্যে অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক কৃষক দরদী হিসেবে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়।পঞ্চাশের মন্বন্তরে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে যে কৃষকেরা পেটের দায়ে জলের দামে জমি বিক্রী করে দিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন, তাদের জমি উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ঋণ শালিশী বোর্ড নামক এক সংস্থা সরকারীভাবে গঠন করেন। বিধি অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নে বোর্ড গঠন হবে ইউনিয়ননের অধিবাসীদের মধ্য থেকে তাদের ভোটে।

দিব্যি মনে পড়ে, এই খবরে উল্লাসিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সমাজ দুর্নীতির আশঙ্কায় সৎ লোকদের চেয়ারম্যান মেম্বার হিসেবে নির্বাচন করতে আগ্রহী হন। আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন এলেন বাবার কাছে বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দাঁড়ানোর জন্য। বাবা অসম্মতি জানিয়ে বলেন, “আমি তো রাজনীতি করি না। অন্য কাউকে দাঁড় করাও আমি সমর্থন দেব। আমিও ঐ দুর্ভিক্ষের একজন ভূক্তভোগী। কৃষকেরা এতে রাজী না হয়ে বাবাকে দাঁড়াতে বাধ্য করলেন-জানতাম না সৎ মানুষ হিসেবে স্কুলের বাইরেও তার এত জনপ্রিয়তা।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত বাবা দাঁড়ালেন এটা দেখে প্রতি  ইচ্ছুক অন্য সবাই সরে দাঁড়ালেন। বাবা হলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। দরখাস্ত পেলেন তদন্তে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় তাদের সমস্ত জমি ফেরত পাবার ব্যবস্থা করেন। বাবার এই কৃষক-দরদী রূপটি এতদিন আমাদের অজানা ছিল-অজানা ছিল এলাকায় তাঁর আকশচুম্বি জনপ্রিয়তা কথাও।

এরপর এলো পাকিস্তানের জোয়ার নানাস্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়ংকর সব খবর। গ্রামে থাকা নিরাপদ মনে না করে অজানা উদ্দেশে সপরিবারে চলে এলেন পাবনা শহরে এক ভাড়া নেওয়া কাঁচা বাসায়। ইতোমধ্যে আমি ম্যাট্রিক পাশ করে এডওয়ার্ড কলেজে পড়াশুনা শুরু করেছি- ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করেছি পাবনায়।

এলো ১৯৫৪ এর নির্বাচন। মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে হক ভাসানী-সোহরাওয়ার্দি নেতৃত্বে গঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট।যুক্তফ্রন্ট গঠনের দাবী ছাত্র ইউনিয়নও উত্থাপন করেছিল। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের সপক্ষে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করার জন্য গঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

তালিকা ঘোষণার পর পরই প্রার্থীদের এলাকায় নির্বাচনী অভিযান পরিচলনায় ৮/১০ জন করে ছাত্র নিয়ে টিম। আমি গেলাম সুজানগর এলাকায়। সুজানগর থানা হেডকোয়ার্টারে ৪ ফেব্রুয়ারি জনসভা। আমি প্রধান বক্তা। মাগরিবের নামাযের পর আমি বলতে শুরু করি দুই প্রার্থীর পক্ষে। একজন যুক্তফ্রন্ট মনোনীত অপর জন সাধারণ (হিন্দু) আসন থেকে মনোনীত কমিউনিষ্ট পার্টির কৃষক নেতা কমরেড অমূল্য লাহিড়ী।

স্বভাবতই লম্বা হয়ে যায়, বক্তৃতা। ঘণ্টাখানেক ধরে বক্তৃতা করে যেই মঞ্চ থেকে নামছি- সভাপতি একটি স্লিপ হাতে ধরিয়ে দিলে তা খুলে দেখি, ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতা নূরুদ্দিন চিঠিটি পাওয়া মাত্র পাবনা ফিরে আসতে লিখেছে। শেষে বাসে পাবনা আসতে আসতে রাত প্রায় ১০টা বেজে গেল। দেখা হলো নূরুদ্দিন ভাই ও সাজাহান মাহমুদের সাথে। উভয় নির্বাক। কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার ডেকেছেন কেন? বেশ কিছুক্ষণ চুপ শেষে উভয়েই বললেন, বাবা নেই। আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন। জিজ্ঞেস করে জানলাম, বাবা সকালে মারা গেছেন- আমাকে খবর পাঠিয়ে সারাদিন অপেক্ষা করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শেষ দেখা হলো না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Channel-i-Tv-Live-Motiom

ট্যাগ: রণেশ মৈত্র
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

বিশ্বজুড়ে মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ

জুলাই ২১, ২০২৬

দিল্লিতে চলছে ককরোচ পার্টির বিক্ষোভ, ওয়াংচুকের অনশন অব্যাহত

জুলাই ২১, ২০২৬

২০২৭ সালের মধ্যে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি

জুলাই ২১, ২০২৬

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দমকা হাওয়ার সতর্কতা

জুলাই ২১, ২০২৬

ঘরের টিশার্টগুলোতে ছেলের শরীরের ঘ্রাণ খোঁজেন জয়ের মা

জুলাই ২১, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2026 Bkash Stickey June 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT