রাজধানীর সবচেয়ে দামি এলাকায় বিশাল চোখজুড়ানো বহুতল ভবন। সেই ফুটবল ভবনে পেশাদারী সাংগঠনিক কাঠামোয় বাফুফে’র প্রধান নির্বাহী, ফিফার প্রেসস্ক্রিপশন অনুযায়ী বেতনভোগী পেশাদার সাধারণ সম্পাদক। সিলেটে নিজস্ব ফুটবল একাডেমি। একাডেমি প্রতিষ্ঠায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আছে, আছে দেশের অর্থমন্ত্রীর অকৃপণ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি।
২০১২ সালে ফিফার সে সময়ের সভাপতি সেফ ব্ল্যাটার তিন লাখ মার্কিন ডলার দিয়ে গেছেন, আছে আরো দুই লাখ ডলারের আশ্বাস। তৃণমূলের প্রতিভাবান ফুটবলারের প্রতিভা বিকাশে আছে বিকেএসপি। জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দল পরিচর্যায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে নিত্যনতুন যোগ দিচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের হাই প্রোফাইল কোচ।
১৯৭৫ থেকে আজ পর্যন্ত জাতীয় দলের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩৮ জন কোচ, এরমধ্যে বিদেশী ১৮ জন। গত নয় বছরে ‘কাজী সালাউদ্দিন জমানায়’ ৮জন বিদেশী সহ ১৩ জন কোচ জাতীয় দলের কোচের ‘মিউজিক্যাল চেয়ারে’ বসেছেন। বাংলাদেশের ফুটবলে আছে তথাকথিত কট্টর পেশাদারী লিগ, যেখানে অংশ নেয় ঢাকার ১০টি সহ সারা দেশের ১২টি পেশাদার ফুটবল ক্লাব। এরমধ্যে ঢাকা আবাহনী, ঢাকা মোহামেডান, চট্টগ্রাম আবাহনী ও ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ক্লাবও আছে যারা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি’র অফিসে পেশাদারি সংগঠন হিসাবে নিবন্ধিত। পেশাদারী কাঠামোর সব শর্ত পূরণ করা আছে কাগজে-কলমে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন, প্রবাদ বাক্যের সেই কাজির গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’র মতো পরিস্থিতি।
একসময়ের বাঙ্গালির প্রাণের খেলা ফুটবল আজ নেহায়েত কঙ্কালে পরিণত তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মালদ্বীপ ও ভুটান। মালদ্বীপের কাছে পাঁচ গোলের হার কিংবা ভুটানের সঙ্গে গোলশূণ্য ড্র’য়ে স্পষ্ট হয়ে গেছে বাংলাদেশের ফুটবলের অর্ন্তজলি যাত্রা। ফিফা র্যাংকিং’র অংকের হিসাবেও পরিস্কার, বাংলার ফুটবলের একমাত্র গন্তব্য গভীর খাঁদ। ১৯৯৩ সালে ফিফা র্যংকিং’এ বাংলাদেশের স্থান ১১৫ নম্বরে, পরের বছর ১৩০। ২০১৬’তে সেই বাংলাদেশ ১৮৩ তে। সদস্য ২০৯ রাষ্ট্রকে নিয়ে ফিফা র্যাংকিং, আশংকা খুব শিগগিরই লাল-সবুজ তালিকা থেকে ছিঁটকে পড়বে। যদিও সাউথ ইষ্ট এশিয়ায় র্যংকিং’এ বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে কেবল ভারত (১৫২), মালদ্বীপ (১৭৪),আফগানিস্তান (১৭৫)। পিছিয়ে নেপাল (১৮৮),ভুটান (১৯২),শ্রীলংকা (১৯৩) ও পাকিস্তান (১৯৪)।
বাস্তবতা হচ্ছে, এই অঞ্চলে কোন দেশকে বলে কয়ে হারানোর দিন শেষ লাল-সবুজের। ফুটবল পাগল একটা জাতিকে কিভাবে ধীরে ধীরে ফুটবল বিমুখ জাতিতে পরিণত করা যায় তার জলজ্যান্ত উদাহরণ তৈরী করার একক কৃতিত্বের দাবীদার বাফুফে ও বাংলাদেশের ফুটবল সংগঠককূল। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে ফুটবলের উল্টোপথের যাত্রায় অবদান রেখেছেন। কারো আমলে ঘরোয়া ফুটবল দিয়েছে কুম্ভকর্নের লম্বা ঘুম। কেউবা আবার ইংরেজী বুলি কপচে, ঘাড় বেকিয়ে লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি আওড়ে পার করছেন আট-নয় বছর। যেমন চলছে ‘কাজী সালাউদ্দিন জমানায়’। তৃতীয় মেয়াদে বাফুফে বস’র দায়িত্ব পালন করা এই সাবেক তারকা সভাপতির দায়িত্ব নিয়েই অত্যাধুনিক ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ক্রীড়াবান্ধব সরকার তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সিলেট বিকেএসপি’র ভবন, স্থাপনাসহ সবকিছু বাফুফে’র হাতে তুলে দেয় ২০১২ সালে। সে বছর মে মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে সেসময়ের ফিফা সভাপতি সেফ ব্ল্যাটার একাডেমি’র জন্য পাঁচ লাখ ডলারের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতির তিন লাখ ডলার সেদিনই বাফুফে’র ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। বাফুফে’কে সেই তিনলাখ ডলার একাডেমি’র কোন খাতে খরচ হয়েছে জানতে চাওয়া হলে সদুত্তর পাওয়া যাবে না। ২০১৫’র আগস্টে সিলেটে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। বাফুফে ঘোষণা দেয় দলটিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়া হবে ফুটবল একাডেমিতে। এক বছর পেরিয়েছে, বাফুফে’র অবহেলা আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন শাওন, আতিক, নিপু, মিরাজ, রাকিনের মতো প্রতিভাবান কিশোররা।
ইদানীং সভাপতি তার প্রতিশ্রুতি থেকে এক’শ আশি ডিগ্রি ঘুরে বলছেন, আধুনিক পেশাদার ফুটবল কাঠামোয় খেলোয়াড় তুলে আনার দায়িত্ব ক্লাবের, ফেডারেশনের নয়। তার এই দাবি ইউরোপ, লাতিন আমেরিকার উন্নত পেশাদার ক্লাবগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এশিয়ার দূর্বল সাংগঠনিক কাঠামোর ফুটবল ক্লাব বা প্রশাসনের জন্য নয়। জাপান, কোরিয়া, ইরান, চীনের মতো এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর ফুটবল এসোসিয়েশনই তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান ফুটবলার তুলে এনে উন্নত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরের জন্য তারকা তৈরী করে।
বাংলাদেশের ক্লাবগুলোর অবস্থা তো আরো শোচনীয়। আর দেশের ক্লাবগুলোই যদি তৃণমূল থেকে তরুণ ফুটবলারদের তুলে আনার একক দায়িত্ব নেবে তাহলে বাফুফে’র প্রয়োজন কি ? কেনইবা ফুটবল একাডেমি’র কথা বলে সরকারের কাছ থেকে স্থাপনা আর ফিফার কাছ থেকে আর্থিক মঞ্জুুির নেয়া ! প্রতিবেশী নেপালের ফুটবল একাডেমি পরিচালনা করে অল-নেপাল ফুটবল এসোসিয়েশন। মাঝে শোনানো হলো সরকারের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি লিজে পাওয়া একাডেমি তুলে দেয়া হবে বেসরকারি সংস্থাকে। তারা বাফুফে’র সাথে ব্যবসায়িক অংশীদারীর ভিত্তিতে ফুটবলার তৈরী ও তা ক্লাবগুলোর কাছে বিক্রি করে মুনাফা করবে। সরকারকে না জানিয়ে প্রচলিত নিয়ম কানুন না মেনে সরকারি স্থাপনায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং লভ্যাংশ বাফুফে ব্যক্তিমালিকানার কোম্পানির সঙ্গে ভাগ করে নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশই আইনে অপরাধ।
এসব অবাস্তব কল্পনার সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবল নীতি নির্ধারকদের বসবাস ! তবে সময় এখোনো শেষ হয়নি। বাঙ্গালির প্রাণের খেলা ফুটবলকে আপন মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে বাফুফে কর্মকর্তারা ইউরোপের দুই উন্নত দেশ বেলজিয়ামের ‘ল্য ভিশন ডি ফরমেশন’ বা ‘বর্ন অফ গোল্ডেন জেনারেশন’ অথবা জার্মান ফুটবল এসোসিয়েশনের ‘ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’কে রোল মডেল হিসাবে নিতে পারে। ১৯৯০’র বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের কাছে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে হারের পর বেলজিয়ামের কোচিং স্টাফের একজন মাইকেল সাবলন তার দেশের ফুটবল এসোসিয়েশন’কে ১২ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা দেন যার মাধ্যমে ১ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার বেলজিয়াম তাদের ফুটবল স্টাইল পরিবর্তন করে আক্রমণাত্মক ফুটবল গ্রহণ করবে। ২০০০ সাল থেকে ব্রাসেলস, টুবিজ, আন্ডারলেখট’র মতো অঞ্চলে অনূর্ধ্ব-৭,৮,১২,১৫ বছরের কিশোর ফুটবলারদের প্রতিভা বিকাশের জন্য চালু হয় ‘পার্পল ট্যালেন্টস প্রোগ্রাম’।
ড্রিবলিং, হেডিং, শ্যুটিং,পাসিং নিয়ে প্রতিদিন এক ঘন্টা ও সপ্তাহে তিনদিনের শিডিউল অনুযায়ী অনুশীলন এবং তা তদারক করতো ফুটবল এসোসিয়েশনের দায়িত্ব প্রাপ্ত কোচ। এভাবেই বেলজিয়াম পেয়েছে ইডেন হ্যাজার্ড, লুকাকো, ফেলিনি ও ডিব্রুয়েনের মতো দুর্দান্ত ফুটবলার। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে জার্মান ফুটবল এসোসিয়েশন ও দুই স্তরের বুন্দেশলিগার ৩৬ ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদি ‘এক্সটেনডেট ট্যালেন্ট প্রমোশন প্রোগ্রাম’। সারাদেশ থেকে প্রতিভাবান ৬ লাখ কিশোর ফুটবলারকে জড়ো করা হয়েছিলো জার্মানির ৩৬৬ আঞ্চলিক ফুটবল কোচিং স্কুলে। জার্মান ফুটবল এসোসিয়েশনের ১৩০০ পেশাদার কোচ ট্যালেন্ট হান্টিং’র মাধ্যমে এই কিশোরদের মাঝ থেকে সেরাদের বেছে নেন।
এরপর ৫২টি ‘সেন্টার অফ এ্ক্সেলেন্সে’ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মাফিক অনুশীলন। পাশপাশি বুন্দেশলিগার ৩৬ দলকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তৃণমূল থেকে তুলে আনা তরুণদের নিয়ে দল গড়ে জাতীয় ভিত্তিক অনূর্ধ্ব-১৯ বুন্দেশলিগায় অংশগ্রহণে রাজি করানো হয়। ২০০৩ সালে শুরু করা এই প্রকল্প সাফল্যের মুখ দেখে ২০০৯ সালে জার্মানি’র অনূর্ধ্ব -২১ ইউরোপীয় নেশন্স চ্যাম্পিয়নশীপ জেতার মাধ্যমে। সেই দলের সদস্য মেসুট ওজিল, সামির খেদিরা, বোয়েটাং, মুলার’রাই পরবর্তীতে করেছেন বিশ্বজয়। ২০১৪’র আসরে জার্মানি বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিলের মাটিতে সেমিফাইনালে ব্রাজিল’কে ৭-১ এ হারিয়ে। অনূর্ধ্ব-১৯ বুন্দেশলিগায় দল গড়তে গড়িমসি করায় জার্মান ফুটবল এসোসিয়েশন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের মতো দলের পেশাদারি ক্লাব লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিলো। সেই ডর্টমুন্ডের ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম থেকে উঠে আসা ফুটবলার মারিও গোঁটশে’র গোলেই ২০১৪’র ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারায় জার্মানি।
বিশ্বকাপ জেতা স্কোয়াডের অন্যতম তারকা টনি ক্রুজ উঠে এসেছেন জার্মানির প্রত্যন্ত অঞ্চল মেকলেনবার্গ থেকে একই প্রোগ্রামের আওতায়। বাংলাদেশের ফুটবল নীতি নির্ধারকরা সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই ফুটবল বিপ্লবের খবর নিশ্চয়ই জানেন। জার্মানি ও বেলজিয়াম মডেল অনুসরণ করার জন্য সীমাহীন ব্যয়ের দোহাইও দেবেন। জার্মানি ও বেলজিয়ামের মতো অজস্র অর্থ ব্যয় সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। তবে ছোট পরিসরে শুরু করলে ক্রীড়াবান্ধব সরকার, ফুটবল পাগল জনগোষ্ঠী, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশীপ সর্বোপরি ফিফার ক্রমবর্ধমান অনুদানে পূরণ হতে পারে বাংলাদেশের স্বপ্ন । এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ উইমেন্স ফুটবলে অবিস্মরনীয় সাফল্য এনে দিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরা দেশবাসীকে করেছে গর্বিত। ব্যর্থতার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া বাফুফে কর্মকর্তারা এবারো প্রতিশ্রুতির ডালি নিয়ে হাজির ! স্বর্ণ কিশোরীদের প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা ও আবেগকে পুজি করে দেখানো হচ্ছে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন।
যে দুর্বল ও অকর্মা সাংগঠনিক কাঠামো বাংলাদেশের ছেলেদের ফুটবলকে রসতলে নিয়ে গেছে সেই একই কাঠামো মেয়েদের ফুটবলকে বিশ্বমানে পৌঁছে দেবে এমন কল্পনাবিলাসে গা ভাসিয়ে না দেয়াই ভালো। অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের সাফল্যে মূখ্য অবদান কলাসিন্দুর স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দলের সঙ্গে সর্বক্ষণ সম্পৃত্ত থাকা কয়েকজন নিবেদিনপ্রাণ কোচের। বরং এই সাফল্যের পর বাফুফে’র কাছে ফুটবলের উন্নতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রনয়ণের দাবি তোলা উচিত। ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে কর্মকর্তাদের অব্যাহতি দেয়ার সময় এসেছে। এই ব্যর্থ বাচাল কর্মকর্তারা বরাবর জাতীয় দলের ব্যর্থতায় কোচ-খেলোয়াড়দের দায়ী করে তাদের বিদায় করেছেন। এবার ব্যর্থতার দায় বাফুফে এবং কর্মকর্তাদের নেয়া সময়ের দাবি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







