চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাড়ির চাকা তখন হোটেলের দিকে ছুটছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া কাশেমের শতায়ু মায়ের অসহায় আর্তনাদের ভাষা তখনও বুঝতে চেষ্টা করছি। আবার ৫০ বছরের কাশেমের মায়ের প্রতি ভালবাসা দেখেও মুগ্ধ হচ্ছি। রাখাইন থেকে বাংলাদেশের পালিয়ে আসছে এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি রোহিঙ্গা পরিবারগুলো যে যার মত পালিয়ে আসছে। অনেক রোহিঙ্গা পরিবারেই রয়েছে আশি উর্ধ্ব বয়সের পিতা-মাতা। হাটা চলা করতে না পারায় দীর্ঘ এ পথ পাড়ি দিতে পারবে না, এ কারণে বয়স্ক পিতা-মাতাকে মৃত্যুকূপে ফেলেই চলে এসেছেন এমন সন্তানের অভাব ছিলো না বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সে ঢলে।
নিজে বাচঁলে বাপের নাম হয়ত অনেকেই সেভাবে ভেবেছেন। তবে কাশেম তাদের মত নয়। বৃদ্ধ মাকে কাঁধে করে নিয়ে এসেছেন মাইলের পর মাইল। সারাজীবন মায়ের স্নেহমাখা আদরের প্রতিদান হয়ত কোন সন্তান দিতে পারে না। তবে কাশেমের মত সন্তানরাই হয়ত মা আর সন্তানের সম্পর্ককে নিয়ে যায় সব কিছুর উর্ধ্বে। এসব ভাবতে ভাবতেই ফিরে এলাম হোটেলে।
ছবি
৫ সেপ্টেম্বর, সকাল ৮টা। টেকনাফ শহরের অলিগলিতে তখন কেবলই রোহিঙ্গা। এদের অধিকাংশই গতরাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। উচু নিচু বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন একটানা হেটে এসেছে তারা। হোটেল বা মার্কেটের নিচে যে যেখানে আশ্রয় পেয়েছে, সে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সূর্যের প্রখর রোদও যেন ঘুম ভাঙ্গাতে পারছে না। রোহিঙ্গাদের অনেকেই তখনও আশ্রয় খুঁজে ফিরছেন। চটের কয়েকটি বস্তা আর ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো ঘুরছে টেকনাফ শহরের অলিগলিতে। কক্সবাজারের স্থানীয়রাই এগিয়ে এসেছে। তবে শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের জন্য তাবলিগ জামায়াতের মুসল্লিগণকে দিনরাত কাজ করতে দেখেছি। পানি থেকে শুরু করে শুকনা খাবার নিয়ে মাইলের পর মাইল হেটে সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছিলো তারা। একদিন শাহপরীর দ্বীপে এক মেম্বারকে গণধোলাইও দেয় তাবলিগ জামায়াত। পরে জানতে পারি ওই মেম্বার তার ২-৩ জন সহযোগী নিয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে থাকা অর্থ-সম্পদ লুট করছিলো।
তখনও সরকারিভাবে কোন ধরণের ত্রাণ সহায়তা বা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়ের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে রোহিঙ্গাদের জন্য সর্বোচ্চ মানবিক অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করে বিজিবি-কোস্টগার্ড। উখিয়ার বিভিন্ন টিলায় গাছের ছায়ায় অথবা খোলা আকাশের নিচেই আশ্রয় তখন রোহিঙ্গাদের। আবার কেউ বা আশ্রয় নিয়েছেন আগে থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা পুরনো রোহিঙ্গাদের সাথে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে।
কয়েকটি পরিবার টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে। তবে কারও সর্বনাশের দিনে কারো যে পৌষমাস তারও বাস্তব একটা চিত্র চোখে পড়লো। কক্সবাজারের কিছু সুবিধাবাদী লোক বাসা ভাড়া দিতে শুরু করে সব হারিয়ে নিস্ব হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে। ১০ হাত বাই ৭ হাত আয়তনের একেকটি টিনের চাল ও চাটাইয়ের বেড়ার ঘর থেকে ২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে। টাকা না থাকায় অনেকের আশ্রয় তাই রাস্তায়। বৃষ্টি হলেই কষ্টের যেন আর শেষ নেই তাদের। রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নৌকা মালিকদের মত কিছু জমির মালিকও মেতে ওঠে নিজেদের ভাগ্য গড়ার খেলায়। মানবিকতা সেখানে শুধুই ডিকশনারির একটি শব্দ, যার কোন প্রযোগ সেখানে নেই। আবার কিছু বাঙ্গালি রোহিঙ্গা তরুণীদের বিয়ে করতে লাইন ধরেছে তখন। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বিয়ে করা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। তাই যেসব বাঙ্গালি গোপনে রোহিঙ্গাদের বিয়ে করছেন তার কোন প্রমাণ বা রেজিস্ট্রেশন নেই। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ে হওয়ায় অনেক বাঙ্গালি সে সুযোগ নিয়েছেন। আশ্রয় আর খাবারের জন্য অনেক রোহিঙ্গা পরিবারও মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বাঙ্গালির সাথে। আর পাচারকারীদের একটি চক্র তখন বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরো টেকনাফ এবং উখিয়ায়।
ছবি
প্রথম দিন শাহপরীর দ্বীপে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গেলেও দ্বিতীয় দিন আমরা যাই টেকনাফ এবং উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্তে। টেকনাফের লেদা, জাদীমুরা, উখিয়ার ঘুমধুমসহ আরো কিছু পয়েন্ট দিয়ে তখন রোহিঙ্গারা ঢুকছে। তবে টেকনাফের প্রধান সড়ক থেকে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো বেশ দূরে। বিকেল ৩টার দিকেই হাটা শুরু করি জাদীমুরা সীমান্তে যেতে। সীমান্ত যে এতটা দূরে তা ভাবনার বাইরে ছিলো। সীমান্তে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা। তবে সীমান্তে গিয়ে চোখে পড়লো এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। রোহিঙ্গা ভর্তি প্রায় ২শ নৌকা বাংলাদেশের অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে নাফ নদীর মিয়ানমার অংশে। আর এ পাড়ে বাংলাদেশ অংশে পাহারায় দাঁড়িয়ে বিজিবি সদস্যরা।
দিনের বেলা তখন কোন রোহিঙ্গাকেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তাই নৌকাগুলোর অপেক্ষা অন্ধকারের জন্য। রাত হলেই তারা ঢুকে পড়বে বাংলাদেশে। দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা না থাকায় ক্যামেরার সঙ্গে অতিরিক্ত লাইট না নেওয়ায় আলোর স্বল্পতার কারণে সেদিন মিয়ানমার অংশে দাড়িয়ে থাকা নৌকার চিত্র দূর থেকে আমরা ধারণ করতে পারিনি। মোবাইলের আলোই ছিলো একমাত্র ভরসা। মোবাইলের আলো দিয়ে স্বল্প দূরত্বের চিত্র ধারণ করা সম্ভব। অপেক্ষায় থাকি রাতের। গণমাধ্যমের উপস্থিতির কারণে নৌকাগুলোকে ঢুকতে দিচ্ছে না বিজিবি। তাই সীমান্ত থেকে অনেকটা দূরে চলে আসি। এর কিছুক্ষণ পর রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকাগুলো ভিড়তে শুরু করলো বাংলাদেশে। মাইলের পর মাইল হেটে বাংলাদেশের মাটিতে পা দিয়েই যেন জীবন ফিরে পেল রোহিঙ্গারা। শ্যাওলার মত ভাসতে থাকা রোহিঙ্গারা যেন কিনারা খুঁজে পেল।
রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের প্রায় একই ধরণের ঘটনায় জানলাম। ধর্ষণ, হত্যা আর লুন্ঠনের শিকার হওয়ার একেকটি গল্প যেন একেকটি পরিবার। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে একা বেঁচে আছেন এমন পরিবার যেমন রয়েছে তেমনি বেশি রয়েছে স্বামী বা পুরুষ সদস্য হারিয়েছে এমন পরিবার। নারীদের অনেককে ছেড়ে দিলেও পুরুষ সদস্যদের নির্বিচারে গুলি করেছে সেনাবাহিনী। কথা হলো ৬ বছরের শিশু রহিমের সঙ্গে। সে জানালো তার বাবা এবং মাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার আগে তার মাকে তার চোখের সামনেই ধর্ষণ করে সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গাদের একটি দলের সঙ্গে সে পালিয়ে এসেছে। আরেকজন রোহিঙ্গার নাম সুলতানা। সে ৫ সন্তান নিয়ে একদিন আগে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তবে নাফ নদীর পাড়ে দাড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলো স্বামীর।
নৌকা ভাড়া না থাকায় স্ত্রী আর সন্তানদের পাঠিয়ে নিজে মিয়ানমারে থেকে গেছেন তার স্বামী রহিমউদ্দিন। আর ওই দিনই রাতেই সুলতানার গ্রামে আগুন দিয়েছে সেনাবাহিনী। ১০ থেকে ১২ জন পুরুষকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে ওই গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। নাফের পাড়ে দাঁড়িয়ে স্বামীর জন্য সুলতানার এ অপেক্ষা কখনও শেষ হবে কিনা তাও জানা ছিলো না।
ছবি
সীমান্ত চৌকিতে জঙ্গিদের হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২৫ আগস্ট রাত থেকে রাখাইনের বাচিদং, বুচিদং ও মংডুতে সেনাদের অত্যাচার বেড়েই চলেছে বলে জানালো রোহিঙ্গারা। এসব ঘটনার বাইরেও ছিলো ভিন্ন ঘটনা। কথা হলো আছিয়া নামের এক রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে। মংডুতে তার বাড়ি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার থেকে স্বামী-সন্তানসহ বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিলেন তিনি। তবে সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাচঁলেও ভাগ্য সহায় ছিলো না আছিয়ার। মিয়ানমারের গভীর জঙ্গলে বন্য হাতির আক্রমণে স্বামী এবং সন্তান দুজনেই নিহত হয়েছে। পরিবারের দুই পুরুষ সদস্যকেই হারিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আছিয়া।
ছবি
রোহিঙ্গাদের এ ঢলে পুরুষদের সংখ্যা ছিলো একেবারেই কম। আর যে পুরুষরা ছিলো তাও বয়সে বৃদ্ধ। পানি সাঁতার কাটতে যেন সমস্যা না হয় সেজন্য নারীরা পুরুষের লুঙ্গির মত কিছু একটা শরীরে পেঁচিয়ে রেখেছে। এদের সঙ্গে আহতরাও আসছিলো। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এসেছে এমন অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন আমার চোখে পড়ে। পরিবারের বৃদ্ধ সদস্যদের মত আহতদের একই কায়দায় কাঁধে করে নিয়ে হাটছেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। নিজ দেশ, নিজ ভিটা সবকিছুই এখন পর। আবার কি ফিরতে পারবে কিনা তাও অজানা।
সীমান্ত থেকে ফেরার সময় যে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা হলো তারা জানালো, শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেছে, ছাড়তে চায়নি তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করা রাখাইন রাজ্য। তবে সেনাবাহিনী থাকতে দেয়নি তাদের। যুবতী মেয়েদের বেশিরভাগই ধর্ষণের শিকার। খবর সংগ্রহ করে ফিরে আসছিলাম শহরের দিকে। গণমাধ্যমের গাড়ি দেখে এক স্থানীয় জানালো পাশের একটি বাড়িতে প্রায় ১শ রোহিঙ্গাকে আটক করে রেখেছে স্থানীয় একটি দালাল চক্র।
দালালরা জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা না পেলে কাউকে ছাড়ছে না। বিজিবির সহায়তায় ওই রোহিঙ্গাদের আমরা উদ্ধার করি। তবে তখন বিজিবি যাদেরকে আটক করছিলো তাদের আবার মিয়ানমারেই পুশব্যাক করা হচ্ছিল। ওই ১শ রোহিঙ্গার ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তা আর জানা যায়নি। ফিরছিলাম হোটেলে। বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গাদের খবর জানা গেলেও রাখাইনের তাদের সঙ্গে কি হচ্ছে তা কেবল বর্ণনাতেই জানা যাচ্ছে তখন। হঠাৎ করে মাথায় নতুন ভাবনা। যেতে হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ভেতরে।
(চলবে)







