সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণা করছেন এমন বিশেষজ্ঞদের মতে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য প্রচলিতভাবে শুধু চালককে দোষারোপ করে লাভ নেই। বরং সড়ক-জনপথ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো এবং সড়ক নিরাপত্তায় সকলের সমন্বিত উদ্যোগ ও আন্তরিক চেষ্টাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তারা।
তাদের মতে ঈদ মৌসুমে অতিরিক্ত চাপ এবং যানজটে আটকে থাকার পর ফাঁকা রাস্তায় অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোতেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।
দেশের সংবাদগুলোর মধ্যে প্রতিদিন অন্তত একটি সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ থাকে। জীবন হারানো,পঙ্গুত্বের ভয় থাকলেও নানা প্রয়োজনে নরকের মতো এসব সড়কেই প্রতিদিন জীবন হাতে করে বের হয় অসংখ্য মানুষ।
আর দুই ঈদে মানুষের ঘরে ফেরার টান এবং ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদগুলোও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে গত বছর দেশে ৬ হাজার ৫’শ ৮১ টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৮ হাজার ৬’শ ৪২ জন। তাদের হিসাব অনুযায়ী এবছর শুধু ঈদুল ফিতরের সময় ঘটা দুর্ঘটনাতেই জীবন গেছে ১’শ ৮৬ জনের, আহতের সংখ্যা ৭’শ ৮৬ জন।
কেনো দেশের সড়ক-মহাসড়কে এতো দুর্ঘটনা?
চ্যানেল আই অনলাইনের এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট’র অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্স ইন্সটিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন,‘ দেশীয় বাস্তবতায় বাস, ট্রাক চালকদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত। আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বেশির ভাগ চালকের নেই বললেই চলে। ‘ওস্তাদের’ কাছ থেকে গাড়ি চালানো এসব চালকরা কোনোরকম গাড়ি চালাতে শিখেই পেয়ে যাচ্ছে ড্রাইভিং লাইসেন্স। বাস চালকরা যে এতো যাত্রীর জীবনের নিরাপত্তা নিচ্ছে এমন দায়িত্ববোধ নেই বেশির ভাগ চালকের।’
এই দায়িত্বজ্ঞানহীন চালকরাই বেপরোয়া হয়ে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন,‘ শুধু গাড়ি চালাতে পারাটাই বড় নয় একজন চালক যে যাত্রীদের দায়িত্ব নিচ্ছে, সেই দায়িত্ববোধটা থাকতে হবে। তা না হলে অতিরিক্ত গতিতে বেপরোয়া গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা কমবে না’।
ঈদ মৌসুমে সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে এআরআই-এর পরিচালক বলেন,‘ ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামলাতে নগরীর ফিটনেবিহীন বাসগুলোও মহাসড়কে নামে। ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় গাড়ি চালায় নব্য কিংবা শিক্ষানবীশ চালক। তাছাড়া ঈদের চাপে অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালাচ্ছে বেশিরভাগ চালক। এতে ক্লান্ত হচ্ছে তারা। আর ঈদের রাস্তায় দীর্ঘ জটের পর তাই ফাঁকা রাস্তা পেলেই সর্বোচ্চ গতি সীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। ফলে ঘটছে দুর্ঘটনা’।
শুধু চালক নয় রাজধানীসহ সড়ক-মহাসড়কে যাত্রী-পথচারীরাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ জানিয়ে তিনি আরও বলেন,‘ রাজধানীতে ফুটপাথগুলো দখলে থাকায় পথচারীরা হাঁটছে রাস্তা দিয়ে। জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভারব্রিজ এসবের ব্যবহার না করা এখন নাগরিক বদঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নাগরিকরা অভ্যস্ত হয়েগেছে বিপজ্জনক পারাপারে।’
পরিচালকের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বুয়েট-এর এআরআই’র অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম। তবে এই বিশেষজ্ঞের মতে গোটা সড়ক-জনপথ ব্যবস্থাকেই ঢেলে সাজাতে হবে।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন,‘ বাংলাদেশের সড়কে সবচেয়ে বেশি বাস দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর আছে ট্রাক এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। মহাসড়কে নিষিদ্ধ হলেও এখন সেখানে অটোরিকশা দুর্ঘটনার সংবাদও জানা যাচ্ছে। আসলে এসব দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকের ভুলকে দায়ী করা যাবে না। গাড়ি চালানো, গাড়ি ও চালকের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। যাত্রী ও পথচারীদেরও এক বাক্যে নির্দোষ বলা যাবে না। অন্তত রাজধানীর সড়কে দুর্ঘটনার জন্য চালক ও পথচারী উভয়ই সমভাবে দায়ী।’
এমন বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসতে সনাতনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন সময়ের দাবি বলে মনে করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন,‘ যথেষ্ট জ্ঞানের অভাব থেকে যাচ্ছে সড়ক পথে। গোটা সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ত্রুটি আছে। এজন্য পুরো ব্যবস্থায় কার্যকর, বাস্তবতা নির্ভর এবং আন্তরিক সমন্বয় জরুরি।’







