কার্ডিফে আগেরদিন বাংলাদেশকে পাওয়া ভূতটাই যেন ওভালে উড়ে এসে ভর করল অস্ট্রেলিয়ার কাঁধে! ওভার প্রতি যেখানে রান দরকার ছিল ৮ কিংবা ৯, সেখানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শনিবার বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বেশিরভাগ সময়ই তুললেন ৫’র একটু বেশি করে। পরে রান জমতে জমতে হয়ে উঠল পাহাড়। শেষে ধসে পড়ে গুঁড়িয়ে দিল ইনিংসটাকেও!
রোববার একই নাটকের যেন পুনরাবৃত্তি ঘটল ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচেও। বিরাট কোহলিদের দেয়া ৩৫৩ রানের বিপরীতে ঠিক যেভাবে তেড়েফুঁড়ে খেলার দরকার ছিল, অজিরা অনুসরণ করল তার উল্টোটা, বলা যায় বাংলাদেশকেই। শেষদিকে আক্রমণের কথা ভেবে আস্তে চলতে গিয়ে বাড়িয়ে তুলল প্রয়োজনীয় রানরেট। একটা সময় চাপে পড়ে উইকেট হারিয়ে শেষ বলে ৩১৬ রানে অলআউট হয়ে ভারতকে উপহার দিয়েছে ৩৬ রানের জয়!
৩৫৩ রানের বিশাল লক্ষ্যে যেভাবে ছোটা দরকার, অ্যারন ফিঞ্চ ও ডেভিড ওয়ার্নার হাঁটলেন ঠিক তার উল্টোভাবে। ১১ ওভারে স্কোরবোর্ডে ৫২ রান দেখে মনে হচ্ছিল যেন ৩৫৩ নয়, ১৫৩ রানের লক্ষ্যে ছুটছে অস্ট্রেলিয়া!
স্টাইল বিবেচনায় ওয়ার্নার-ফিঞ্চ দুজনেই আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান। কিন্তু ভারতের বৈচিত্র্যময় বোলিং লাইনআপকে সমীহ করে উইকেট রেখে খেলতে গিয়েই নিজেদের আক্রমণকে বোতলবন্দী করে রাখলেন দুজনে।
এই কৌশল কাজে দিল না শেষপর্যন্ত। টুকে টুকে ১৩ ওভারে ৬১ রান তোলার পর ওয়ার্নার-ফিঞ্চ জুটি ভাঙে দুজনের ভুল বোঝাবুঝিতে। ১৪তম ওভারের প্রথম বলে দুই রান নিতে একটু দ্বিধায় পড়েছিলেন ফিঞ্চ, তাতেই শেষ। উইকেটের অন্যপ্রান্তে কেদার যাদবের থ্রোতে বল পেয়ে অজি অধিনায়কের স্টাম্প ভেঙে দেন হার্দিক পান্ডিয়া। ফেরার আগে ৩৫ বলে ৩৬ করেন ফিঞ্চ।
অধিনায়ক ফেরার পর সাবেক অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথকে নিয়ে নতুন লড়াই শুরু করেন ওয়ার্নার। বল টেম্পারিংয়ের দায়ে এক বছর নিষেধাজ্ঞা কাটানো দুই ব্যাটসম্যান তৃতীয় উইকেট জুটিতে তুললেন ৭২ রান। তাতেও হিসেব মিলছিল না, কারণ নিজের ১৯তম ফিফটি তুলতে গিয়ে ওয়ার্নার বল খরচ করে ফেলেছেন ৭৭টি!
বল অপচয় করার ভারেই কিনা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলেন ওয়ার্নার। আক্রমণটা করতে চাইলেন যুজবেন্দ্র চাহালকে। সর্বনাশ ডেকে আনল সেটা। ২৫তম ওভারে মিডউইকেট দিয়ে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ভুবনেশ্বর কুমারের হাতে ধরা পড়ে থামে বাঁহাতি ওপেনারের ৮৪ বলে ৫৬ রানের প্রস্তরযুগীয় ব্যাটিং!
ওয়ার্নারের বল খরচটা শেষপর্যন্ত ভুগিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। কারণ ততক্ষণে জেতার জন্য দরকারি রানরেট ছাড়িয়ে গেছে ১০’র বেশি। উইকেটে এসে তাই রান বাড়ানোতে মনোযোগ দেন স্পিনে অজিদের সেরা ব্যাটসম্যান উসমান খাজা। স্মিথকে নিয়ে চলছিলেন ভালোই।
সেই সুখও টেকেনি বেশিক্ষণ। স্পিনে ভালো খেললেও গতির কাছে হার মানেন খাজা। ৩৯ বলে ৪২ রানের সম্ভাবনাময় ইনিংস খেলার পর জাসপ্রিত বুমরাহকে সরে খেলতে গিয়ে বিলিয়ে দেন উইকেট। ৩৬.২ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ তখন ২০২!
তারপরও ভারতের দুশ্চিন্তা কাটছিল না। কারণ উইকেটে তখনো আছেন স্মিথ ও গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। স্মিথ এরইমাঝে তুলে ফেলেছেন ফিফটি। ৬৯ করে অপেক্ষায় আরও জ্বলে ওঠার।
সেখান থেকে ৪০তম ওভারের পরপর দুই ছোবলে স্মিথ ও মার্কাস স্টয়নিসকে ফিরিয়ে অজিদের মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেন ভুবনেশ্বর কুমার। স্মিথকে এলবিডব্লিউ ও শূন্য রানে স্টয়নিস ফিরিয়েছেন বোল্ড করে।
প্রসিদ্ধ সব ব্যাটসম্যান ফিরে যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ লড়াই চালান উইকেটরক্ষক অ্যালেক্স ক্যারি। ২৫ বলে তুলে নিয়েছেন বিশ্বকাপে অজিদের দ্রুততম ফিফটিও। শেষঅবধি তার ৩৫ বলে ৫০ রানের ইনিংসটি হারের চেহারা যা একটু ভদ্রস্থ করেছে অজিদের।
৫০ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ভারতের সেরা বোলার ভুবনেশ্বর কুমার। ৬১ রানে ৩ উইকেট পেয়েছেন বুমরাহও। ৬২ রান খরচায় যুজবেন্দ্র চাহালের উইকেট শিকার ২টি।
এর আগে এক শতক, দুই ফিফটিতে ভর করে ৫ উইকেটে সাড়ে তিনশ পেরোনো সংগ্রহ দাঁড় করায় ভারত। সর্বোচ্চ ১১৭ করেছেন ওপেনার ধাওয়ান। ৮২ এসেছে অধিনায়ক কোহলির ব্যাট থেকে।
ভারতের যে-ই ব্যাটিংয়ে এসেছেন, সঙ্গে নিয়ে ফিরেছেন কম-বেশি রান। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের নাচিয়ে ভারতের প্রথম তিন ব্যাটসম্যানই পান ফিফটি। আর ধাওয়ান পৌঁছান সেঞ্চুরি পর্যন্ত। রোহিত ৫৭ ও হার্দিক করেছেন ৪৮ রান।
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং লাইনআপের সবাই কম-বেশি ধোলাই খেয়েছেন। সফল স্টয়নিস, ৭ ওভার ৬২ রান খরচ করেছেন যদিও, ২ উইকেট পেতে। মিচেল স্টার্ক ধাওয়ানের উইকেট নিয়ে রান বিলিয়েছেন ৭৪!








