মঙ্গলবার দুপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মুহম্মদ খসরু। সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বুধবার সকাল সোয়া ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে রাখা হয় তাঁর মরদেহ। যেখানে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হন চলচ্চিত্রের গুণী নির্মাতা, চলচ্চিত্র সংগঠক সহ সর্বস্তরের মানুষ।
শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রায় শেষ পর্যায়। একটু পরেই তাকে নেয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে। সেখানে তার নামাজে জানাজা। ঠিক তার একটু আগে ফুলের তোড়া হাতে খসরুর মরদেহের দিকে ছুটে আসেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তার চোখে মুখে আপনজন হারানোর দুঃখ, বেদনা!
ফুলের তোড়া খসরুর মরদেহের বেদিতে রাখলেন আসাদুজ্জামান নূর। এরপর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত। এদিকে খসরুকে নিয়ে মাইকে স্মৃতিচারণ করে যাচ্ছেন প্রবীন নির্মাতা ও মুহম্মদ খসরুর বন্ধু ও স্বজনরা। তার সৃষ্টি ও যাপন নিয়ে কথা বলছেন চলিচ্চত্র কর্মীরা।
তখনো বন্ধুর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নূর। তাকে ডাকা হলো খসরুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে।
মুহম্মদ খসরু ও আসাদুজ্জামান নূর ছিলেন সমবয়সী। একই বছরে (১৯৪৬ সাল) তাঁদের জন্ম। সেই সুবাধে তাদের মধ্যে ছিলো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
বন্ধু খসরুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে এসে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, বিশ্ব চলচ্চিত্র সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি খসরুর কাছ থেকে। তার মাধ্যমেই আমার মতো অনেকের বিশ্ব চলচ্চিত্রের সাথে খুব ভালো করে প্রথম পরিচয় ঘটে। চলচ্চিত্রের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের হাতে ধরে চিনিয়েছেন খসরু। সেই ১৯৭১-৭২ সালের দিকের কথা। সেই সময় থেকে খসরুর সাথে আমার সম্পর্ক। সে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোতে ঘুরে ঘুরে অসাধারণ সব দেশের সিনেমা সংগ্রহ করতো। যেগুলো পরবর্তীতে আমরা দেখতাম। দেখে আলোচনা করতাম।
সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের যে লড়াই সংগ্রাম, সেটা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করে গেছেন বন্ধু খসরু। এমনটা জানিয়ে নূর বলেন, সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের যে ভাবনা, যে আন্দোলন বাংলা চলচ্চিত্রে নিরন্তর, তার অগ্রপথিক মুহম্মদ খসরু। আজকে কিংবা ভবিষ্যতে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে যদি আমরা আলোচনা করতে বসি, তাহলে তাকে বাদ দিয়ে সেই আলোচনা সম্ভব না।
ব্যক্তিগত জীবনে আমরা ঘনিষ্ঠ ছিলাম। অনেক আনন্দময় জীবন কাটিয়েছি। আমাদের সেই আনন্দের সময়ের বন্ধুদের সংখ্যা একে একে কমে যাচ্ছে। আজকে খসরু চলে গেল, কিন্তু সে আমাদের মধ্যে থাকবে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে, আমাদের চলচ্চিত্রের জগতে, আমাদের সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র অঙ্গণে অনির্বাণ দ্বীপশিখার মতো জ্বলবে। -বলছিলেন আসাদুজ্জামান নূর।
দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস, অ্যাজমার সমস্যায় ভুগছিলেন খসরু। গেল মাসে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরের বাড়ি থেকে ঢাকায় আনা হয়। ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। মাঝখানে তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও শেষ রক্ষা হয়নি তার।
সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া ছাড়াও বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’ ও ‘চলচ্চিত্র’ এর সম্পাদক মুহম্মদ খসরু। এছাড়া বেশ কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতাও তিনি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা রাজেন তরফদারের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘পালঙ্ক’-এ সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ঋত্বিক ঘটকের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন ৭০-এর দশকে। যা ধ্রুপদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরে এই সাক্ষাৎকারটি উপমহাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় পুনর্মুদ্রণ হয়েছে।








