১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করা হয়। ভয়াবহ সেই দিনটির কথা উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে। জবানবন্দি থেকে পাওয়া যায় সেদিনের ভয়াবহতার চিত্র। জানা যায় ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ৩২ নম্বরের বাড়িটির ভেতরে-বাইরে। সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে চ্যানেল আই অনলাইনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের চতুর্থ পর্ব।
প্রসিকিউশনের ৫০নং সাক্ষী নূরুল ইসলাম খান আদালতকে জানান, বর্তমানে তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ডিএসবি’র প্রটেকশন ফোর্স হিসেবে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডির বাসভবনে হাউস গার্ডের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া কুমিল্লা থেকে আগত ২০/২৫ জন আর্মি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সবসময় হাউস গার্ডের ডিউটি পালন করতো। এসবি’র একজন ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমানও বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন।
সেদিন দিবাগত রাত প্রায় ১টার দিকে তিনি এবং একজন পুলিশ সার্জেন্ট বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের নিচের তলায় বৈঠকখানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পিএ কাম রিসেপশনিস্ট মুহিতুল ইসলামও সেখানে ছিলেন। ভোর পৌণে ৫টার দিকে দোতলা থেকে বঙ্গবন্ধুর গলার আওয়াজ শোনেন তিনি এবং পুলিশ সার্জেন্ট। তাড়াতাড়ি বৈঠকখানার দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ান। বঙ্গবন্ধু দোতলা থেকে নিচে নেমে রিসেপশনিস্টের রুমে গিয়ে টেলিফোনে আলাপ করার চেষ্টা করেন। এমন সময় হঠাৎ পূর্বদিক থেকে এক ঝাক গুলি রিসেপশনিস্টের রুমে এসে জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলে। তিনি সেন্ট্রিকে বলেন ‘এত গুলি কিসের?’ সেন্ট্রি বলে, বাইরে থেকে হামলা করেছে। তিনি বলেন ‘তোমরা ফায়ারিং চালাও’। তখনও বাইরে থেকে খুব বেশি ফায়ারিং হচ্ছিলো।
একই সঙ্গে ৪/৫টা কামানের গোলার আওয়াজও শোনেন বলে জানান নূরুল ইসলাম খান। প্রায় ৫ মিনিট পর গুলি বন্ধ হয়। তখন বঙ্গবন্ধু রিসেপশনিস্টের রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এত ফায়ারিং কিসের? তিনি বললেন, বাইরে থেকে হামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও জিজ্ঞাসা করলেন- আর্মি সেন্ট্রি পুলিশ সেন্ট্রি এত ফায়ারিং কিসের? তখন গেটের বাইরে থাকা একজন আর্মি সিপাহী জবাব দিল: বাইরে থেকে হামলা হয়েছে। এরপর কালো এবং খাকী পোশাকধারী কিছু আর্মি পূর্ব-দক্ষিণ এবং পশ্চিম-দক্ষিণ দিক থেকে ক্রলিং করে বাড়ির দিকে আসছে দেখে বঙ্গবন্ধু দোতলায় চলে যান। এর পরপরই বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল নিচ তলার বারান্দায় এসে তাকে বলেন- আর্মি এসেছে কি? তিনি বলেন, মনে হয় এসেছে। তখন শেখ কামাল উৎফুল্ল হয়ে বলেন, আর্মি ভাইয়েরা কারা এসেছেন, ভিতরে আসেন। দ্বিতীয় বারও একই কথা বলেন তিনি। কিছুক্ষণ কোন সাড়া শব্দ নাই। পরে হঠাৎ ৫/৬ জন কালো ও খাকী পোশাকধারী আর্মি গেট ধাক্কা দিয়ে বাড়ির দিকে এগোতে থাকে।
আরো কিছুদূর এগিয়ে তাদের লক্ষ্য করে বলেন, হ্যান্ডস-আপ। তখন তিনি এবং পুলিশ সার্জেন্ট ‘হ্যান্ডস-আপ’ করেন। দরজার কাছে পিএ মুহিতুল ইসলাম দাঁড়ানো ছিল। শেখ কামাল কিছুটা আশ্চর্য হয়ে হাত উঠিয়ে বলে ‘আমি শেখের ছেলে কামাল’। তারা দ্বিতীয় বার ‘হ্যান্ডস আপ’ বললে হ্যান্ডস-আপ করার সাথে সাথে শেখ কামালকে গুলি করে হত্যা করে। তাকে ২টি গুলি করে। একটি গুলি তার ডান পায়ের হাঁটু বিদ্ধ করে। অপর গুলিটি তার ডান পায়ের জুতাকে ভেদ করে। পরে গুলি করতে করতে তারা দোতলায় যায়।
নূরুল ইসলাম খান আদালতকে আরো জানান, এদিকে আরো ২০/২৫ জন বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেন্ট্রি বক্সের রাইফেল গুলি নিয়ে সেন্ট্রিদেরকে বাসার ভিতরে লাইনে দাঁড় করায়। তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে রিসেপশনের পাশে তার রুমে যান। তার রুমে এসবি’র এসআই সিদ্দিকুর রহমান এবং আর্মড পুলিশ সাব ইন্সপেক্টরকে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান। মুহিতুল ইসলামকে তার রুমে এনে বসান। এই সময় দোতলায় বহু গুলির শব্দ ও নারীদের আর্ত-চিৎকার শুনতে পান।
নূরুল ইসলাম খান বলেন, বাইরে থেকে একজন আর্মি বলল ‘রুমে যারা আছ সব বাইরে এসো, নাহলে ব্রাশ ফায়ার করে সব মেরে ফেলবো।’ তখন আমরা সবাই রুম থেকে বের হলে একজন আর্মি মুহিতুল ইসলাম এবং সিদ্দিকুর রহমানের চুল ধরে বাইরে লাইনে দাঁড় করায়। পরে একজন আর্মি তাকেও অস্ত্রের মুখে নিয়ে মুহিতুল ইসলামের পাশে লাইনে দাঁড় করায়। মুহিতুল ইসলামের জামায় রক্তের দাগ দেখেন তিনি। জানতে পারেন তার গায়ে গুলি লেগেছে।
এরপর একজন আর্মি তাকে লক্ষ্য করে বলে ‘তুমি গুলি করার হুকুম দিয়েছো, চল তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলি’। এই বলে তাকে গেটের বাইরে নিয়ে একটি আর্মড গাড়িতে বসা একজন অফিসারকে বলল, স্যার এই লোকটি গুলি করার জন্য বলেছে ‘হুকুম দেন তাকে গুলি করি’। অফিসারটি তার নাম পরিচয় জেনে তাকে চলে যেতে বলে। তিনি চলে যেতে থাকলে ওই অস্ত্রধারী আর্মিটি তাকে আবার বাড়ির ভিতরে নিয়ে লাইনে দাঁড় করায়।
তখনও বাড়ির দোতলা থেকে থেমে থেমে গুলির আওয়াজ ও আর্ত-চিৎকার শোনা যাচ্ছিলো। এমন সময় হঠাৎ আর্মির একজন লোক বলল ‘লাইনে থাকা সব লোককে গুলি করে মেরে ফেল’। ঠিক তখনই একটি গুলি এসবি’র সিদ্দিকুর রহমানের বুক বিদ্ধ করলে তিনি পড়ে যান এবং শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। এরপর রান্না ঘর থেকে কাজের বুড়ি এবং রাখাল ছেলেকে এনে লাইনে দাঁড় করায়। লাইনে দাঁড়ানো শেখ নাসেরকে একজন অস্ত্রধারী কিছু জিজ্ঞাসা করেই রিসেপশনের বাথরুমে রুমে নিয়ে গুলি করে। শেখ নাসের পানি পানি বলে চিৎকার দিতে থাকলে একজন আর্মি আরেক আর্মিকে বলল- পানি দিয়ে আয়। তখন দ্বিতীয় জন গিয়ে শেখ নাসেরকে আবার গুলি করে।
তারপর ৪/৫জন আর্মি এবং একজন নায়েক সেন্ট্রিকে বাসার উপরের দিকে উঠতে দেখেন। একজন অস্ত্রধারী আর্মি বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ রাসেলকে উপর থেকে নিচে নিয়ে আসে। শেখ রাসেল দৌড়ে মুহিতুল ইসলাম ও রমার কাছে গিয়ে হাত ধরে বলে ‘আমাকে মারবে?’ মুহিতুল ইসলাম বলে না মারবে না। তখন অস্ত্রধারী আর্মি শেখ রাসেলের হাত ধরে টেনে দোতলায় নিয়ে যায়। এবং একটু পরে দোতলায় গুলির শব্দ শোনেন।
এরপর নূরুল ইসলাম খান আদালতকে জানান, সকাল ৬টার দিকে ৫/৬ জন আর্মি উপর থেকে নেমে বাড়ির দক্ষিণ দিকের গেটে গিয়ে ২/৩ জন বাইরে থাকা আর্মির সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে বলল ‘all are finished’। তারপর তারা সব পুলিশকে ওই বাড়ি থেকে সরিয়ে নিয়ে লেকের পার্শ্বে কর্ডন করে রাখে। তাদেরকে নেওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে এবং কিছু আগে ট্যাংক দেখেন। সকাল প্রায় ৯টার দিকে তিনি অনুমতি নিয়ে একজন পুলিশসহ লালবাগ থানায় যান। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার পা প্লাস্টার করে দেয়া হয়। তিনি প্রাণভয়ে হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাসায় চলে যান। প্রায় তিন মাস পর সুস্থ হয়ে কাজে যোগদান করেন।
মেজর জেনারেল আবদুর রব
প্রসিকিউশনের ১০ নং সাক্ষী মেজর জেনারেল আবদুর রব বলেন, ঘটনার সময় তিনি লে. কর্নেল হিসাবে সাপ্লাই এন্ড ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন। ১৫ আগস্ট ভোর প্রায় ৬টার দিকে তার পাশের বাসার মেজর আবু বকর চিৎকার দিয়ে বলছিল বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের লোকজনকে হত্যা করা হয়েছে। একথা শোনার পর সাথে সাথে ইউনিফর্ম পরে অফিসে যান তিনি। বেলা ১২টার দিকে তার ব্যাটালিয়ানে এ্যাডজুটেন্ট অথবা মেজরকে নিয়ে ধানমন্ডি ৩২নং রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যান। ৩২নং রাস্তার মুখে কিছু সংখ্যক আর্মি তাকে বাধা দেয়। পরিচয় দেওয়ার পর যেতে দেয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভিতরে গিয়ে রিসেপশনে একটি লাশ দেখে তিনি নিশ্চিত হন- এটা গুজব নয়। এখানে মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে।
তারপর অফিসে চলে আসেন। ১৬ আগস্ট রাত ৩.৩০টার দিকে তৎকালীন স্টেশন কমান্ডার লে. কর্নেল হামিদ তাকে টেলিফোনে আদেশ দেন ‘তোমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির লাশ, সেরানিয়াবাতের বাড়ির লাশ এবং শেখ মনির বাড়ির লাশ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব dispose of করতে হবে’। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কোথায় কিভাবে dispose of করতে হবে। উত্তরে বললেন, এটা বঙ্গভবনের নির্দেশ ‘সবগুলো লাশ বনানী কবরস্থানে দাফন করতে হবে।’
এই নির্দেশের পর লাশগুলি দাফনের জন্য তার ব্যাটালিয়নের ২০/২৫ জন সৈনিককে রেডি থাকতে নির্দেশ দেন। তারপর লাশগুলি আনার জন্য ২টা ট্রাকসহ কিছু সৈন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পাঠান। ২টা ট্রাক সেরনিয়াবাত ও শেখ মনির বাড়ি থেকে লাশ আনার জন্য পাঠান। মোট ১৮টি লাশ যেভাবে আসে সেভাবেই দাফন করা হয়। তখন সেখানে কোন লোক না থাকায় যতদূর পেরেছেন দোয়া-দরূদ পড়ে লাশগুলি দাফন করেন। লাশগুলিতে ময়না তদন্তের চিহ্ন দেখেন নাই। সেখানে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেন নাই বা সেখানে তার লাশও দাফন করেন নাই। শুনেছেন বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়া নিয়া দাফন করা হয়েছে।








