ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে খাদ্য সরবরাহ ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। কয়েক দিন ধরে খাবার না পেয়ে অনাহারে কাটানো চার ইউক্রেনীয় সেনার ছবি ও আর্তনাদ গত এপ্রিলের শেষ দিকে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়, সামনের সারিতে অবস্থানরত ওই সেনারা টানা ১৭ দিন পর্যন্ত কোনো খাদ্য সরবরাহ পাননি। কয়েক মাস ধরে তাদের বদলিও হয়নি।
ইউক্রেনের ১৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডে কর্মরত এক সেনার স্ত্রী আনাস্তাসিয়া সিলচুক ২২ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ক্ষুধায় যোদ্ধারা অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। তারা বৃষ্টির পানি পান করছে।
তিনি জানান, রাশিয়ার বোমা হামলায় ওস্কিল নদীর ওপরের সেতুগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দোনেৎস্ক অঞ্চলের পূর্ব তীরে আটকা পড়ে যান সেনারা। ফলে তাদের কাছে খাদ্য ও পানি পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সিলচুক লেখেন, রেডিওতে তাদের কথা কেউ শোনেনি, কিংবা শুনতে চায়নি। আমার স্বামী চিৎকার করে বলছিল, খাবার ও পানি নেই।
এদিকে সম্প্রতি ফ্রন্টলাইনে দায়িত্ব পালন করা ইউক্রেনীয় সেনা ওলেক্সান্দর আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি চরম ক্ষুধার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
রাশিয়ার ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে একটি গোপন বাঙ্কারে অবস্থানের সময় সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির অভাব অনুভব করেছেন, তা হলো “আসল খাবার”।
কিয়েভে চিকিৎসাধীন ৩১ বছর বয়সী এই সেনা বলেন, আপনি শুধু গরম খাবারের স্বপ্ন দেখবেন। কারণ সপ্তাহের পর সপ্তাহ যা পাওয়া যায়, তা হলো চকোলেট বার, ওটমিল আর দিনে এক বোতল পানি।
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন সামনের সারির উভয় পাশে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকা সার্বক্ষণিক ড্রোন নজরদারির মধ্যে থাকায় ট্রেঞ্চ সংযোগ বা সরবরাহ যানবাহন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
ফলে ইউক্রেনীয় অবস্থানগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেছে। খাবার, গোলাবারুদ, ওষুধ এমনকি বিদ্যুৎ জেনারেটর সরবরাহও জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
পূর্ব ইউক্রেনে একটি ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার ইহর বলেন, এখন আর বাঙ্কার থেকে বের হয়ে সিগারেট খাওয়ার দিন নেই।
রাশিয়ার পক্ষেও পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। সেনাদের ছোট ছোট দলে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা প্রায়ই ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে।
ছোট আকারের বিস্ফোরকবোঝাই আত্মঘাতী ড্রোন এখন ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। দ্রুতগতির চার চাকার গাড়িই কেবল কিছুটা রক্ষা পেতে পারে, কিন্তু বিস্ফোরণের গর্ত ও মাইনভর্তি দুর্গম এলাকায় চালাতে সাহস পান না অনেকেই।
ওলেক্সান্দর বলেন, একদিনেই আমরা চারটি পিকআপ হারিয়েছিলাম।
ভিডিও ক্যামেরাযুক্ত রোবোটিক কার্ট এখন সামনের সারিতে খাবার ও গোলাবারুদ পৌঁছে দেয়। এগুলো আহত সেনাদের ফিরিয়েও আনতে পারে।
তবে এসব পরিচালনায় হালকা নজরদারি ড্রোন প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভারী ড্রোনই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে, যেগুলো কয়েক কেজি মালামাল বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে আসতে পারে।
ইউক্রেনের ড্রোন যুদ্ধ কৌশলের পথিকৃৎ আন্দ্রি প্রোনিন বলেন, অন্তত এক বছর ধরে ফ্রন্টলাইনের অধিকাংশ সরবরাহ ড্রোন বা রোবোটিক কার্টের মাধ্যমে করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, আমার পরিচিত সবাই সময়মতো সরবরাহ পাচ্ছে প্রতিদিন বা একদিন পরপর।
তবে জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন মনে করেন, ড্রোনের মাধ্যমে সরবরাহের পরিধি এখনও সীমিত।
তিনি বলেন, পুরো ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ১০ শতাংশেরও কম সদস্য ড্রোনে খাবার পাচ্ছে।
অনাহারে কাতর সেনাদের ছবি ভাইরাল হওয়ার কয়েক দিন পর ১৪তম ব্রিগেড এক বিবৃতিতে জানায়, এক টুকরো রুটি থেকে শুরু করে খোলা জেনারেটর পর্যন্ত সবকিছু আকাশপথে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে রুশ বাহিনী যত বেশি সম্ভব ড্রোন ভূপাতিত করার চেষ্টা করছে বলেও জানানো হয়।
পরবর্তীতে ওই ব্রিগেডের কমান্ডিং অফিসারকে বরখাস্ত করা হয়। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্তের নির্দেশ দিয়ে জানায়, খাদ্য সংকট “কোনোভাবেই নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
ওলেক্সান্দর স্মরণ করেন, একসময় রুশ সেনাদের কাছে ড্রোন ছিল নতুন বিষয়।
তিনি বলেন, আমরা যখন ভারী ভ্যাম্পায়ার ড্রোন উড়াতাম, তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত যতক্ষণ না ড্রোনটি বোমা ফেলত। এরপর কেউ পড়ে যেত, কেউ পালাত, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে সরে যেত।
২০২৫ সালের মার্চে ড্রোনে পাঠানো খাবার এক রুশ সেনার আত্মসমর্পণের পথও তৈরি করে দেয়। ইউক্রেনের থার্ড স্টর্মট্রুপার ব্রিগেড খারকিভ অঞ্চলের তুষারাবৃত বনে লুকিয়ে থাকা এক অনাহারী রুশ সেনাকে শনাক্ত করে। সহযোদ্ধাদের মৃত্যু দেখার পর তিনি একটি ইউক্রেনীয় নজরদারি ড্রোনকে আত্মসমর্পণের সংকেত দেন। পরে চকোলেট বারের সঙ্গে ইউক্রেনীয় অবস্থানে যাওয়ার নির্দেশনা পাঠানো হলে তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
রুশ বাহিনীর অনেক সেনাকেও উচ্চঝুঁকির অভিযানে প্রায় খাবার ছাড়াই পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতারণার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিলেন তাজিক শ্রমিক মোহাম্মদ বলেন, তারা আমাকে ছোট একটি পানির বোতল আর দুই-তিনটি ছোট চকোলেট বার দিয়েছিল।
তিনি জানান, লুহানস্ক অঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত গ্রামে প্রায় এক মাস অবস্থানকালে তাকে কাঁচা ম্যাকারনি ও খাবারের উচ্ছিষ্ট খুঁজে খেতে হয়েছে।
মোহাম্মদের দাবি, যুদ্ধের আগে তার ওজন ছিল ৭৬ কেজি। কিন্তু ইউক্রেনীয় বন্দিশিবিরে কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত খাবার খাওয়ার পরও তার ওজন ৬০ কেজিতেই ছিল।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা দাবি করে, দক্ষিণ খেরসন অঞ্চলের দনিপ্রো নদীর দ্বীপগুলোতে শত শত, এমনকি হাজার হাজার রুশ সেনা আটকা পড়েছে। তারা গুরুতর খাদ্য ও গোলাবারুদের সংকটে ভুগছে।
এ ছাড়া অনাহারে থাকা রুশ সেনাদের মধ্যে নরখাদকের ঘটনাও ঘটেছে বলে অপ্রমাণিত খবর পাওয়া গেছে।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে ব্রিটিশ দৈনিক দ্যা টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, আড়িপাতা এক কথোপকথনে দুই রুশ কর্মকর্তা এমন এক সেনার কথা বলছিলেন, যিনি এক সহযোদ্ধাকে হত্যা করে তার পা কেটে খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরে আরেক সেনা তাকে গুলি করে হত্যা করে।








