১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ, চিকিৎসক সমাজের আকাঙ্ক্ষা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতায় ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে যাত্রা শুরু করে। এবছর মেডিকেলটি পালন করছে ২১তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। ২০ বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসা সেবার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে আসছে। মাঝখানে কিছু সময় শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়কে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ৭টি অনুষদের আওতায় ৫০টি বিভাগ ১৬০০ রাত্রিযাপন বেড ও ২০০ ডে কেয়ার বেডে রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৬০০০ হাজার মানুষ বহিঃবিভাগে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে। মানুষের আস্থার কেন্দ্রস্থল বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে সর্বাধুনিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা। বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত দিবস পালনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে বিনামূল্যে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষায় প্রতি বছর ৯২টি বিষয়ে বিশ্বমানের স্নাতকোত্তর সনদ প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের বহু চিকিৎসক স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের জন্য বাংলাদেশে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত আয়োজন করে চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিভিন্ন সভা, সেমিনার। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একনেক সভায় ১৩৬৬.৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০০ বেডের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে যার নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নাধীন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ৩০ হাজার বই সমৃদ্ধ দেশের সর্ববৃহৎ মেডিক্যাল লাইব্রেরি যা ডিজিটাল লাইব্রেরি নামে পরিচিত। তরুণ চিকিৎসকদের কাছে এই লাইব্রেরি খুবই প্রিয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের উৎসাহ ও সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়েছে ‘ইনস্টিটিউট অব প্যাডিয়াট্রিক নিউরো-ডিসঅর্ডার এন্ড অটিজম ইন বিএসএমএমইউ’ যার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে অটিজম শিশুদের প্রাথমিক অধিকার। অনিরাময়যোগ্য মৃত্যু পথযাত্রী রোগীদের যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য রয়েছে প্যালিয়াটিভ কেয়ারের মতো মানবিক বিভাগ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় অধ্যাপকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে রয়েছে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট প্রোগ্রাম, সার্ভিক্যাল ব্রেস্ট ক্যান্সার স্কেনিং এন্ড ট্রেনিং ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকল্প। ক্ষীণ স্বরে উচ্চারিত ‘প্রাতিষ্ঠানিক প্রাকটিস’ বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসন স্মরণীয় হয়ে থাকবে পাশাপাশি রোগীদের জন্য খুলবে চিকিৎসা সেবার অপার সম্ভবনার দ্বার। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক, মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে মনোরম ছাত্র-শিক্ষক মিলানায়তন। কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাংস্কৃতিক, মানসিক বিকাশ ও
খেলাধুলার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলানায়তন প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালকে সেন্টার অব এক্সিলেন্স এ পরিণতকরণ ফেইজ-২ প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে চলন্ত সিঁড়ি সুবিধাসহ বহিঃবিভাগ-১ ও বহিঃবিভাগ-২ নামে দুটি ৫ তলা আধুনিক ভবন। এ বছরই সমাপ্ত হবে ৫ তলা অনকোলজি ভবন, ডরমেটরি ভবন ও কনভেনশন সেন্টার ভবন। প্রকল্পের আওতায় ৫০ জন শিক্ষক গবেষণাখাতে আর্থিক সহায়তা ও ১৫ জন শিক্ষক বিদেশে আধুনিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঔষধ প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে হার্টের রিং ক্রয় করলে রোগীরা অধিক উপকৃত হবে। প্রশাসন গবেষণা ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং রিসার্চ এডমিনিস্ট্রেশন এবং প্রমোশন সেল গঠন করেছে এই সেলকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি করে চিকিসৎকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে স্বাক্ষরিত এমওইউতে চিকিৎসক প্রশিক্ষণের বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। বৈকালিক বিশেষজ্ঞ সেবা মানুষ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে, পাশাপাশি রোগীদের অভিযোগ রয়েছে নির্ধারিত বিশেষজ্ঞ অনেক সময় পাওয়া যায়না। এ অভিযোগ দূরীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। চিকিৎসক, কর্মচারীর প্রাপ্য চিকিৎসা সুবিধা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে হেলথ কার্ড বা আইডি নম্বর প্রদানের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম ভিসি সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক এম এ কাদরী ১৯৯৯ সালে প্রধান ফটক উদ্বোধন করেন। ২০০৫ সালে ভিসি অধ্যাপক এম এ হাদী বঙ্গবন্ধু নাম বাদ দিয়ে বিএসএমএমইউ নামে কেবিন ব্লকের পাশে ‘প্রধান গেট’ নামে আরেকটি গেট উদ্বোধন করে বঙ্গবন্ধুর নাম মোছার অপচেষ্টা করেন। রোগীতো দূরের কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল চিকিৎসক, কর্মকর্তারা ও প্রধান ফটক আর প্রধান গেটের পার্থক্য বুঝতে অসমর্থ। শাহবাগ পূবালী ব্যাংকের পাশে একটি আধুনিক প্রবেশদ্বার নির্মাণসহ অন্যান্য সকল প্রবেশদ্বারের নামকরণ করলে রোগীদের সঠিক গন্তব্যস্থল পেতে সুধিবা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি তথ্য ও অভ্যর্থনা কেন্দ্র রয়েছে। একটি বাদে অবশিষ্ট ৪টি তথ্য অভ্যর্থনা কেন্দ্র রোগীদের জন্য সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তর করে প্রতিটি কেন্দ্রে একজন নারী ও একজন পুরুষ দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিলে রোগীরা উপকৃত হবে। রোগী ও আগত স্বজনদের অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারী তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন। এই দুর্ব্যবহার বন্ধ করার ক্ষেত্রে কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সহনশীলতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। এই সহনশীলতা কার্যক্রমের আওতায় পরবর্তীকালে সকলকে নিয়ে আসার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ বি সি ব্লকের নামে পরিচিত ভবনগুলোকে নামকরণের প্রস্তাব প্রশাসন বিবেচনা করতে পারে। বহিঃবিভাগ-১ ও বহিঃবিভাগ-২ এর উপর নিজস্ব আর্কিটেকের মাধ্যমে নকশা করে নামফলক এমনভাবে লাগানো প্রয়োজন, যাতে করে সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ রোডে যাতায়াতকারী সকল মানুষ বাহির থেকে দেখতে পারে।
অন্যান্য হাসপাতালের মতো রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। সার্জারী ও শিশু হেমাটোলজির মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিভাগগুলোতে মডেল প্রজেক্ট হিসাবে দর্শনার্থী প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে একটি সময় নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটালাইজেশন করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
বেসিক সায়েন্স অনুষদের একমুখী সেবায় রোগীরা ব্যাপক উপকৃত হচ্ছে। রেডিওলজি বিভাগের এক্সরে পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদান ১২টার পরির্বতে ১১টায় শুরু করতে পারলে রোগীদের একদিন বেঁচে যাবে, যা রোগীদের জন্য বিশাল উপকার হবে। বিশ্ববিদ্যালয় অভ্যন্তরীণ পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা পরিবেশ খুবই ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিবেশ অধিক নিশ্চিতকল্পে প্রক্টরিয়াল বডির কার্যক্রম বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর প্রাপ্ত খ্যাতিমান অধ্যাপকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও এমিরেটাস অধ্যাপক এর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপক উন্নয়ন চলমান। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ পরিচালনায় ‘ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল’ স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে বিভিন্ন সুপারিশ সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলকে প্রদান করে। ২১ বছরে পদার্পণ করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ও নন-মেডিক্যাল কর্মকর্তাদের আবাসন ব্যবস্থা নেই। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও সেবিকাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতির জনকের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে বিশেষ মমতা। প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বহু জায়গার ব্যবস্থা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে অতি সম্প্রতি শাহবাগের বাংলাদেশ বেতার ভবনের জায়গা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভূক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে উচ্চ পর্যায়ে নিয়োজিত প্রতিটি ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর স্নেহধন্য। নিজেদের ভিতর অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব কমিয়ে এই স্নেহ ও মমতা কাজে লাগিয়ে ক্রমবর্ধমান রোগীর কথা বিবেচনা করে দ্রুত বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্স পরিণতকরণ প্রকল্প-৩ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সহকর্মীদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি ও আগত রোগীদের সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক এই কামনা করছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








