‘বঙ্গবন্ধুকে গণভবনে উঠতে বলা হলে তিনি বলতেন, “গণভবন আমার কাছে কারাগারের মতো মনে হয়। তোরা কেন আমাকে সেখানে উঠতে বলিস?”
বুধবার বাংলা একাডেমি আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এভাবেই জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেন ড. ফরাসউদ্দিন। যিনি ওই সময় বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে দুই বছর কাজ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু রচিত কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দুই বছর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের মতোই আমি সেখানে ছিলাম। তাকে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের বাসা ছেড়ে গণভবনে উঠতে বললে তিনি বলেন, “৩২ নম্বরের এই বাসাটার দরজা সবসময় খোলা থাকে। সাধারণ মানুষ আমার আছে অনায়াসে আসতে পারে। রমা বাজার করে আনে। আমি রমাকে জিগাই কোনটা কত দাম নিলো। এতে করে বাজার পরিস্থিতিও আমার জানা হয়ে যায়। এই বাড়িতে থাকলে আমি কৃষকদের সঙ্গে মিশতে পারি। তারাইতো আমার প্রকৃত বন্ধু। গণভবন আমার কাছে কারাগারের মতো মনে হয়। ওখানে জণসাধারণ যেতে পারে না।”
কারাগারের রোজনামচা বইয়ে বঙ্গবন্ধুর সরলতা ধরা পড়ে। সাধারণ মানুষের প্রতি দরদ ধরা পড়ে। জেলখানার কয়েদিরা পর্যন্ত তাকে নেতা মেনেছেন বলে জানান ড. ফরাসউদ্দিন।
মিথ্যা সব অভিযোগে বঙ্গবন্ধুর জীবনের দীর্ঘ ১২ বছর থাকতে হয় কারাগারে। কারাগারের এই সময়টাতে তিনি বই পড়েন, বাগান পরিচর্যা আর লেখালেখি করে কাটান। কারাগারে অবস্থানকালে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত লেখা ডায়েরি থেকে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে ‘কারাগারের রোজনামচা’। বঙ্গবন্ধুর ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ বছরের মার্চে বইটি প্রকাশিত হয়।
বাংলা একাডেমির শহীদ মুনির চৌধুরী সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। দেশের স্বনামধন্য শিক্ষক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ নানা পেশার বিশিষ্টজন আলোচনায় অংশ নেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক হারুন অর রশিদ বইটাকে একটি যুগান্তকারী বই বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি বঙ্গবন্ধু সম্মোহনী নেতা ছিলেন। কিন্তু কারাগারের রোজনামচা পড়লে বোঝা যায় তিনি সম্মোহনী লেখকও ছিলেন। তার লেখা কেমন যেন টানে। পড়া শুরু করলে ওঠা যায় না।’
অধ্যাপক সাদেকা আলম বলেন, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলাদেশ স্টাডিজ কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করে পড়ানো উচিৎ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে দীর্ঘমেয়াদে বারবার কারাভোগ করতে হয়েছে। তবুও তিনি তার বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। মোহহীন ছিলেন বলেই তার জীবনটা স্বাধীন ছিল। তিনিও একটা জাতিকে স্বাধীনতা উপহার দিতে পেরেছিলেন।’
শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘কারাগারে বসে অনেকেই আত্মজীবনী লিখেছেন। সেই বিচারে অন্যান্য আত্মজীবনী থেকে কারাগারের রোজনামচা বেশিই অন্তরঙ্গ ভাষ্য বলে মনে হয়েছে।’
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘ডায়েরি থেকে মানুষ ও ব্যক্তিত্বকে চেনা যায়। বঙ্গবন্ধু কতটা বিশ্বাস করতেন দেশের মানুষকে সেটাই পাওয়া যায় এই বইয়ে। বঙ্গবন্ধুর যে শক্র ছিল এটা তিনি মানতেন না। যারা সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস লিখছেন তাদের জন্য সহায়ক হবে এই বই। কারাগারের রোজনামচা বাঙালির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।’







