একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কতটা মূল্য দেয়, তার সবচেয়ে নির্ভুল প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় বাজেটে। আর সেই বাজেটের মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বলে দেয়—রাষ্ট্র অসুস্থতার চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, নাকি সুস্থ সমাজ গঠনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর স্বাস্থ্য বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়। বরাদ্দ বাড়ে, সংখ্যাও বড় হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই বৃদ্ধি কি মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করছে? হাসপাতালে রোগীর চাপ কি কমছে? মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় কি হ্রাস পাচ্ছে? সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের বিস্তার কি নিয়ন্ত্রণে আসছে? বাস্তবতা বলছে, এসব প্রশ্নের অধিকাংশের উত্তর নেতিবাচক।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকে আমরা প্রায়ই মোট টাকার অঙ্ক দিয়ে বিচার করি। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) -এর কত অংশ স্বাস্থ্যে ব্যয় হচ্ছে এবং সেই ব্যয়ের কতটা জনস্বাস্থ্যভিত্তিক প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির তুলনায় খুবই কম। একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য বরাদ্দও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় সীমিত। ফলে জনগণের চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনও ব্যক্তিগত পকেট থেকেই বহন করতে হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ মোট বাজেটের প্রায় ৫.৩ শতাংশ থেকে ৫.৬ শতাংশ। জিডিপির তুলনায় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় অত্যন্ত নগণ্য এবং তা ১ শতাংশের নিচে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে কোনো দেশের জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ ব্যয় করা উচিত। বাংলাদেশের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের নিচে।
এখানেই সবচেয়ে বড় সংকট। একটি পরিবার যখন চিকিৎসার জন্য সঞ্চয় ভেঙে ফেলে, ঋণ নেয়, জমি বিক্রি করে বা সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমিয়ে দেয়, তখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা শুধু হাসপাতালের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও আঘাত হানে।
এছাড়া সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় অপ্রতুল হওয়ায়, বাংলাদেশের রোগীদের মোট চিকিৎসা খরচের প্রায় ৭৯ শতাংশই নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু এবং আনুপাতিক ব্যয় বিবেচনায় বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের হার মোটামুটি নিম্নরূপ। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় মালদ্বীপের স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির প্রায় ৯.১ শতাংশ, ভুটানে জিডিপির ৩.৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় জিডিপির ১.৯ শতাংশ, নেপালে জিডিপির ১.৬ শতাংশ, আফগানিস্তানে জিডিপির ১.২ শতাংশ, ভারতে জিডিপির ১.১ শতাংশ, পাকিস্তানে জিডিপির ১.০ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে জিডিপির ০১ শতাংশের কম। স্বাস্থ্য খাতের এই ঘাটতি উত্তরণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করেছে এবং সরকারি পর্যায়ে নীতিগতভাবে বাজেটে এর অনুপাত বাড়ানোর বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেটের আরেকটি বড় বৈপরীত্য হলো—বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যায় চিকিৎসাকেন্দ্রিক অবকাঠামো, ভবন নির্মাণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ে; অথচ জনস্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যশিক্ষা, পুষ্টি, পরিবেশগত স্বাস্থ্য, তামাক নিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্বাস্থ্য, বায়ুদূষণ মোকাবিলা কিংবা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মতো ক্ষেত্রগুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। ফলে অসুস্থতার উৎস রয়ে যায় অক্ষত, আর হাসপাতালগুলো ক্রমেই আরও বেশি রোগীতে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমরা প্রতি বর্ষায় ডেঙ্গুর বিস্তার দেখি, মাঝেমধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব, নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যু, আবার একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়তে দেখি। এসব সমস্যার বড় অংশই কেবল হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। নিরাপদ পানি, কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যকর নগর পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য, শক্তিশালী টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা—এসবই জনস্বাস্থ্যের মূল স্তম্ভ।
এ কারণেই উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশগুলো চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধে জোর দেয়। কারণ প্রতিরোধে বিনিয়োগ শুধু জীবন রক্ষা করে না; এটি রাষ্ট্রের অর্থও সাশ্রয় করে। একজন মানুষ অসুস্থ না হলে হাসপাতালের শয্যা, ওষুধ, ব্যয়বহুল পরীক্ষা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনও কমে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যয় করার সক্ষমতা। বরাদ্দ থাকলেই হবে না, সেই অর্থ সময়মতো, দক্ষতার সঙ্গে এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে ব্যয় করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা, জনবল সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এবং পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা স্বাস্থ্য বাজেটের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে কাগজে বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল নাগরিকের কাছে পৌঁছায় না।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় এসেছে। আমরা কি আরও হাসপাতাল, আরও শয্যা এবং আরও চিকিৎসা যন্ত্রপাতির মধ্যেই স্বাস্থ্যনীতিকে সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি এমন একটি জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলব যেখানে মানুষ কম অসুস্থ হবে?
স্বাস্থ্য খাতের বাজেটকে তাই কেবল ব্যয়ের খাতা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিনিয়োগ। একজন সুস্থ নাগরিকই একটি সুস্থ অর্থনীতির ভিত্তি। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা থাকবে, কিন্তু হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমবে। কারণ হাসপাতাল রোগ সারায়; জনস্বাস্থ্য রোগ কমায়। আর সেই জনস্বাস্থ্য গড়ে ওঠে দূরদর্শী বাজেট, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






