একবার মালয়েশিয়া প্রবাসী এক শ্রমিককে তার মালিক বেতন না দিয়ে পাসপোর্ট আটকিয়ে রাখলো। ওই শ্রমিক সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস চেনেন না কিংবা চিনলেও কেউ তাকে সাহায্য করবে না ভেবে ফেসবুকে প্রবাসীদের জন্য খোলা একটা পেজে নিজের কষ্টের কথা লিখে তিনি জানিয়েছিলেন, আমি দেশে ফেরত যেতে চাই। আমাকে সাহায্য করুন। দেখা গেলো তার ওই পোষ্ট স্বয়ং মন্ত্রীই দেখেছিলেন এবং আশ্বাস দিয়েছিলেন ব্যবস্থা নেয়ার। এটি হয়তো কোনোদিনই ওই শ্রমিকের পক্ষে সম্ভব হতো না যদি না ফেসবুক থাকতো।
তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ফেসবুকে ঢোকার গেটওয়ে খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ফেসবুকে ঢোকার গেটওয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো মূলতঃ দুই যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর হওয়াকে কেন্দ্র করে। রায় কার্যকর হয়ে যাওয়ার পরও যখন ফেসবুক খুলে দেয়া হচ্ছিলো না, তখন অনেকের মাঝেই প্রশ্ন জেগেছিলো, -তাহলে কি সরকার ফেসবুক খুলে দিতে চাইছে না?
যদিও সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক কর্মকর্তাই বার বার বলে এসেছেন ফেসবুক সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। সাময়িক বলতে তারা কি বুঝাতে চেয়েছেন সেই সংজ্ঞা অবশ্য তারা দিতে পারেননি। এই সময় নানান গণমাধ্যমে ফেসবুকের ভালো-খারাপ দিক নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। একটা বিষয় কিন্তু পরিস্কার। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে, যেখানে এখনো অক্ষর জ্ঞান না জানা মানুষ রয়েছে; তেমনি রয়েছে খুব অল্প শিক্ষিত মানুষ; এই মানুষগুলোও কিন্তু ফেসবুক ব্যাবহার করে এবং নানান সময় নানা উপায়ে তারা ফেসবুকের মাধ্যমে উপকৃত হয়।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি ভয়-বিভ্রান্তিও ছড়ানো হয়। এটি কিন্তু ফেসবুক বন্ধ থাকলেও সম্ভব। এই যেমন তিন সপ্তাহ ফেসবুক বন্ধ থাকার সময় অনেকেই বিকল্প উপায়ে বিভিন্ন প্রক্সি সার্ভারের মাধ্যমে ফেসবুক চালাচ্ছিলেন। তখন বিভ্রান্তি ছড়ানো হলো, পুলিশ নাকি সবার মোবাইল চেক করছে, কারা প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করছেন পুলিশ তা পরীক্ষা করছে। প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করা যাবে না, কোথাও এরকম বলা না হলেও বিভ্রান্তি কিন্তু ছড়ানো হচ্ছিলো।
এখন ই-কমার্সের যুগ। যেহেতু বাংলাদেশে ফেসবুক জনপ্রিয়, তাই দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থাগুলো আলাদা ওয়েবসাইটের বদলে নিজেদের ফেসবুক পেজ এবং গ্রুপেই এই কাজগুলো করে থাকে। যেহেতু ফেসবুকের মাধ্যমে খুব সহজেই সবকিছু পাওয়া যায়, তাই ফেসবুক বন্ধ থাকার এই সময় অনেকের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো।
শুধু অর্থনৈতিক দিকই নয়; বাংলাদেশের প্রায় সকল পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর নিজস্ব ফেসবুক পেজ রয়েছে। তাদের হয়তো নিজস্ব ওয়েবসাইটও রয়েছে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখবেন দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া কেউ ওই ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে আসে না যে সেখানে কি খবর নতুন করে এসেছে। গণমাধ্যমগুলো যখন তাদের সর্বশেষ কিংবা ব্রেকিং নিউজগুলো নিজেদের ফেসবুক পেজে আপলোড করে থাকে, দেখা যায় লাখ লাখ মানুষ সেই নিউজগুলো ফেসবুকে দেখে এবং পড়ে।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মাত্র কয়েক বছর আগেও মানুষজন ইন্টারনেট কি, ফেসবুক কি বুঝতো না; একটা প্রজন্মই বড় হয়ে যাচ্ছিলো “আই হেইট পলিটিক্স” নামক একটি চিন্তাধারা মাথায় নিয়ে, তারা কিন্তু এই ফেসবুকের মাধ্যমে নানান সময়ে যেমন অন্তত দেশের খবরাখবরগুলো রাখছিলো, নিজেদের মতামতও তুলে ধরছিলো এবং সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে সচেতন হচ্ছিলো।
ফেসবুক খুলে যাওয়ায় এই তরুণ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা স্বস্তি পাচ্ছে হয়তো, কিন্তু তাদের মাঝে কিন্তু একটা সংশয় ঠিকই ঢুকে গেছে যে সরকার যে কোনো মুহূর্তে চাইলেই আবার বন্ধ করে দিতে পারে। তাই সরকারের উচিত হবে এই বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেয়া যে কেনো কি কারণে বন্ধ করা হয়েছিলো কিংবা ভবিষ্যতে বন্ধ হবে কিনা বা হলেও কোন কারণে হতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






