‘যমজ সহোদর র্যাবো আর রেজা
র্যাবো বিশ অক্টোবর বাইশ নভেম্বর রেজা
আঠার’শো আর উনিশ’শো মাত্র এক মাস
এক বছর কিংবা এক শতাব্দী ব্যবধান
মা ভিতালি রেবেকা ঈশ্বর তাড়িত
অনুশাসনে অন্ধ আর ভীত ।‘
যমজ সহোদর / রেজাউদ্দিনস্টালিন
রেজাউদিন স্টালিন। ১৯৮৬ সালে ‘ গ্রন্থালয় ‘ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘ ফিরিনি অবাধ্য আমি ‘ কবিতার বই । রেজাউদ্দিন স্টালিন সেই যে ঘোষণা দিয়ে , ফলাও করে জানিয়ে দিলেন ফিরিনি অবাধ্য আমি-তারপর থেকে আর ফিরে যান নি কোথাও ।কবিতায় সমর্পিত করেছেন নিজেকে পুরো মাত্রায় । শতভাগ ।
তাঁকে আশির দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি বলে জ্ঞান করা হয় । তিনি তার কবিতায় বাংলা কবিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বলে সাহিত্য বোদ্বারা মনে করেন । শুধু তা-ই নয় স্টালিনকে তার ঘোর সমালোচকরাও ঐ দশকের অন্যতম সুপুরুষ , সুদর্শন কবি হিসেবে তকমা দিতে কার্পণ্য তো করেনই নি , তারা বলছেন স্টালিন দুই বাংলার সবচেয়ে সুদর্শন এবং মেধাবী কবি ।
অবশ্য দুর্জনেরা তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত করে বলার সুযোগ নিয়ে একটা কথা বলার চেষ্টা করেন প্রায়শই এইভাবে , রেজাউদ্দিন স্টালিন নারী হৃদয় জয় ( জয় না বলে কেউ কেউ হরণ বলতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ) করতে গ্র্যান্ডমাষ্টার । এপর্যন্ত কতো নারীর হৃদয় জয় বা হরণ করেছেন জানতে চাইলে রেজাউদ্দিন স্টালিন তার বিখ্যাত গোঁফের আড়ালে হাসি লুকিয়ে রেখে কিংবা ধরে রেখে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে যশোরের আঞ্চলিক ভাষার মিশেলে যা বলেন তার সারমর্ম দাঁড়ায় , শোন , আমার সম্পর্কে এসব যারা বলে বেড়ায়, বুঝতে হবে তাদের উদ্দেশ্য মহৎ নয় মোটেও । তবে একথার পরও রেজাউদ্দিন স্টালিন হাসির পরতে পরতে এক ধরনের অলিখিত রহস্যের মায়াজাল ঝুলে থাকে । কবিরা বোধহয় এরকম মায়াজাল তৈরি করে একটা ঘোর-লাগানো পরিবেশ তৈরি করতে পছন্দ করেন । এখন কবি হিসেবে রেজাউদ্দিনস্টালিন যদি সেই রকম একটা পরিবেশ তাকে ঘিরে বানিয়ে রাখতে পারেন তাতে ক্ষতি কি ?
সদাহাস্যময় এই কবি মানুষ হিসেবেও বিচিত্র ধরনের । তার সঙ্গে দীর্ঘ তিরিশ বছরের সম্পর্কের হিসেব এবং তার সঙ্গে চলাফেরা করে তাঁকে যতটা জেনেছি বা বুঝেছি তার অনুবাদ করলে দাঁড়ায় এরকম , রেজাউদ্দিন স্টালিন খুব সাদামাটা জীবন যাপনে সদা অভ্যস্ত ।তিনি কোন ধরনের লুকোছাপা পছন্দ করেন না । কারো প্রতি মেজাজ খিঁচরে গেলে তার সামনেই তাকে মনের খায়েশ মিটিয়ে ‘ ব্যান্ডবক্স ‘ ধোলাই দেবেন ।কিন্তু কি সাংঘাতিক ! কিছুক্ষণ / কিছুদিন পরই দেখা যায় সদ্য ব্যান্ডবক্স খাওয়া মানুষটির সঙ্গে রেজাউদ্দিন স্টালিনের সখ্যতা সবাইকে বিস্মিত করে । এও এক অদ্ভুত হিসেব না মেলানো কবির চেহারা ।
রেজাউদ্দিন স্টালিন এরকমই । প্রেমে, বিদ্রোহে , অনুতাপে ,উপেক্ষায়ও তাঁকে দেখেছি তিনি স্বতঃস্ফূর্ত ।কোন কিছুই যেন স্তালিনকে ছুঁতে পারে না । হাঁসের যেমন শরীর ভেঁজে না তেমনি রেজাউদ্দিন স্টালিনকেও দেখেছি তার দুঃসময়ে ,কষ্টের দিনে ,উপেক্ষার সময়েও তিনি হাসিখুশি থেকেছেন । পারিবারিক অনেক কঠিন গোপন তথ্যকেও অবলীলায় এডিট না করে বলার দুঃসাহস রাখেন । তখন তিনি আর কবি থাকেন না , হয়ে ওঠেন একজন আটপৌরে মানুষ । কবিরা তো স্বভাবে ,দোষে ,গুণে আটপৌরে মানুষ ।
দুই ।।
আনুগত্য শিখে নিলে –
শেয়াল ও সিংহের মধ্যে বিভেদ থাকে না ।
তাস খেলা / রেজাউদ্দিন স্টালিন
রেজাউদ্দিনস্টালিন কেনো তার কবিতা দিয়ে সব সময় আলোচনায় থাকেন । তার কবিতা দেশে ,বিদেশে যে পরিমাণ ছাপা হয়েছে তা সত্যি অভাবনীয় ।এসব নিয়েও গত দুই আড়াই দশক ধরে নিরন্তর জ্বলতে থাকাদের নানা ধরনের এলোমেলো কথাবার্তা উচ্চারিত হতে শোনা যায় । অবশ্য যারা এসব কথাবার্তা স্টালিন সম্পর্কে বলে বেড়ান তিনি তাদের ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখেন ব্যাপারটা অনেকটা ‘ সাধারন ক্ষমা ‘ করে দেয়ার মত ।
সমালোচকরা তার কবিতা নিয়ে বলতে গিয়ে বলছেন , রেজাউদ্দিন স্টালিনের বিচিত্র ভাবনার কবিতায় বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস , ঐতিহ্য , সংস্কৃতি,নিয়তিবাদ গ্রীক মিথ ও পুরানের সংমিশ্রন , পরিপুষ্ট আন্তর্জাতিকতাবাদ , রাজনীতি , সমকালীন প্রসঙ্গ , লোকজ ও নাগরিক জীবনের বিবিধ অনুষঙ্গের বহু বিচিত্র ব্যবহার তথা বাঙালী জাতীয়তা বোধ সর্বোপরি বাঙালীর পরিক্রমণের ধারাবাহিক ইতিহাসকে হাতের রেখার মত মেলে ধরেছেন । কবিতার চেয়েও কখনো কখনো তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি ।কবিতা ,উপন্যাস ,ভ্রমন-গদ্যে এই কবি নিজেকে মেলে ধরেছেন পাঠকের সামনে পলে পলে । নিজস্ব স্বত্বায় তিনি তার সমকালীন কবিদের চেয়ে অগ্রবর্তীত ,প্রাগ্রসর ,ত্রিকালদর্শী ভবিষ্যতদ্রষ্টা এবং একই সঙ্গে অতীতমন্থক ।
রেজাউদ্দিন স্টালিনের মাথায় একবার এক অদ্ভুত ভূত চাপল । বছর ৪/৫ আগের কথা । আমাকে বললেন , এবার থেকে তোমরা নতুন এক রেজাউদ্দিন স্টালিনকে দেখতে পাবা ।
আমি বললাম , সেটা কি রকম ? কবিতা তো অনেক হল । তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ,এখন থেকে নিয়মিত গল্প উপন্যাস লিখবো ।
তার কথা শুনে আমি বেশ উৎফুল্ল হয়ে বললাম , কবিতায় কি তাহলে এই জীবনের না বলা ঘটনাগুলো আর খুলে বলা যাচ্ছে না ? এখন গল্প উপন্যাস লিখে দায়দেনা শোধ করবেন এই তো !
শব্দ করে হাসলেন তিনি ।
আমি বললাম ,যাক , এতদিনে লাইনে আসলেন ?
মানে কি ! আমি কি এতদিন বে-লাইনে ছিলাম? আমার কথায় স্তালিন ভাই একই সঙ্গে বিব্রত এবং একই সঙ্গে লজ্জাও পেলেন বুঝি !
আমি স্টালিন ভাইকে বললাম , আপনার জীবনের যেসব ইন্টারেস্টিং ঘটনার কথা আমাকে বলেছেন সেগুলোর মধ্যেই তো আছে কতো মাল মশলা , লেখার উপাদান । বিষয়ের জন্য , উপাদানের জন্য , চরিত্রের জন্য সর্বোপরি নায়িকার জন্য স্টালিন ভাই আপনাকে কারো গল্প শুনতে হবে না ,ধার করতে হবে না । এর তার কাছে ধর্না দিতে হবে না । আমি জানি আপনি অদ্ভুত , অভিজ্ঞতাময় জীবন অতিক্রম করে এসেছেন । আপনি গল্প -উপন্যাস লিখতে চাইলে এমনিতেই সব এসে আপনার কাছে ধরা দেবে । আপনে শুধু এখন থেকে গল্প উপন্যাস লিখবো এরকম ঘোষণার মধ্যেই নিজেকে সিমাবদ্ব রাইখেন না । এরপর কবিদের যেরকম ভুলোমন থাকে তারও আছে ষোলআনা । রেজাউদ্দিন স্টালিনের বেলায়ও ঘটলো তাই । একটি প্রতিশ্রুতির অকাল মৃত্যু ।ইন্না লিল্লাহে……
প্রিয় কবি ,তারুণ্যের কবি , প্রেমের কবি ,দ্রোহের কবি এমনকি আপনার ভক্তরা কেউ কেউ ভালবেসে আপনাকে জাতিস্মরের কবি বলেও সম্বোধন করেন ,সেটা অতি ভালোবাসা থেকে করতেই পারেন ।সঙ্গতকারনে আমি সেসবের মধ্যে যাবো না । যাইও না কখনো খুব সচেতনভাবে ।
রেজাউদ্দিন স্টালিন, আজ আপনার ৫৫ তম জন্মদিন । আপনার জন্মদিনে একজন সামা্ন্য কথাকার হিসেবে আমি বিশ্বাস করতে চাই আপনি ৪/৫ বছর আগে আমাকে দেয়া আপনার প্রতিশ্রুতিটি রক্ষা করবেন ( করলে ভালো আর না করলেও যে খুব ক্ষতি হবে আপনার ,আমি তাও বিশ্বাস করি না ) এবং ফুল টাইম দিয়ে ফিরে আসবেন গদ্যে । যদিও আপনি ভেবে চিন্তে ১৯৮৬ সালে ঘোষণা দিয়েই কবিতার বইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘ ফিরিনি অবাধ্য আমি ‘ । তো , সেই অবাধ্যকে মানে আপনাকে আপনার জায়গা থেকে ফিরিয়ে আনাটা দুরূহ কাজ ।
তবে আমি মনে করি, একজন কবি যখন ভালোবেসে গদ্য রচনা করেন তখন তা হয়ে ওঠে সুন্দরেরও সুন্দর ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







