সমাজের একটি উচ্চবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের শুরু। স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে চারজনের সংসার। আর আছে কয়েকজন গৃহকর্মী। চারজনের পরিবারকে সুখী পরিবার বলা হলেও আসলে এই পরিবারটি ছিল চরম মাত্রায় অসুখী। স্ত্রী রোমেনা তার স্বামী মহিদুলকে নির্লজ্জ, ছোটলোক, ক্ষ্যাত ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না।
মহিদুল জামান নিজের যোগ্যতায় সফল এবং সমাজের উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত হলেও অসুখী দাম্পত্য জীবন বয়ে নিয়ে চলেছেন। তাদের ছেলে রেহান এক সময় ভালো ছাত্র ছিল, বাবার মতো সেও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার প্রত্যয় নিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সে বদলে গেল। নিজের জীবন নিয়ে খেলতে শুরু করলো রেহান। জামান দম্পতির একটি কন্যা আছে, রায়না। রোমেনা চায় মেয়েকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে। কিন্তু সে বাবার আদর্শ বুকে ধারণ করে সবসময়। ভাই বোনের সুন্দর সম্পর্ক এখানে ফিকে হয়ে আসে। অঢেল টাকা পয়সা, সমাজে প্রতিষ্ঠা থাকার পরও এই পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য অসুখী। কেন? এর পেছনে আছে একেকটা গল্প। আছে মনের কথা প্রকাশ করতে না পারার কষ্ট। তাদের কি কখনো সুখের দেখা মেলে? জানতে হলে বইটি অবশ্যই পড়তে হবে।
বইটির যে বিষয়টা বেশি ভালো লেগেছে তা হলো পাঠককে আকর্ষণ করার ক্ষমতা। লেখিকা কৌশলে প্রত্যেকটা ঘটনার সাথেই একটা ‘কিন্তু’ রেখেছেন। পাঠক নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করবে, ‘কিন্তু এমন কেন হলো?’ সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাকে পাতা উল্টে যেতে হবে। শেষে খুব হঠাৎ করেই একটা টুইস্ট আসে, যেটা পাঠককে নড়ে চড়ে বসতে বাধ্য করবে। যারা রহস্য পছন্দ করেন তাদের জন্য এ অংশ আশীর্বাদ স্বরূপ মনে হবে। কাহিনী, ঘটনার এগিয়ে যাওয়া সব বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। প্রত্যেকটা চরিত্রই এখানে এতটা বাস্তব যে, মনে হয়েছে এদের সাথে আমার দেখা হয়েছিল কখনো, আমি এদের চিনি। ভাই বোনের সুন্দর সম্পর্ক এবং তার গভীরতাও লেখক সুন্দরভাবে ফুটিয়েছেন। পুরো উপন্যাসটি সম্পর্কে এক বাক্যে বলতে হলে এটাই বলব, ‘এ সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত পারিবারিক উপন্যাস ‘নির্লজ্জ’ পাঠকের মনে জায়গা করে নেয়ার মতো।’
বইটির প্রচ্ছদ, প্রিন্টিং, পেইজ সব আমার খুব ভালো লেগেছে। উপন্যাসের বেশকিছু কথা জীবন সংশ্লিষ্ট। এটাও ভালো লাগার অন্যতম কারণ।
যার লজ্জা নেই তাকেই আমরা নির্লজ্জ বলি। দামী পোশাক পড়লে শরীরের নগ্নতা ঢাকা পড়ে। কিন্তু এতে কী মনের নগ্নতা আড়াল করা যায়? সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়ে আচার ব্যবহারে। পাঠক বইটি পড়ে সত্যিকার অর্থে নির্লজ্জতার সংজ্ঞা জানতে পারবেন। আধুনিকতার নামে নিজের খামখেয়ালিপনায় মেতে একটা মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, আবার নিজের স্বকীয়তা, আদর্শ আর শালীনতা বজায় রেখেও মানুষ কতোটা উঁচুতে উঠতে পারে, সম্মান পায় সেটা পাঠক ভালোভাবেই এই উপন্যাসের কল্যাণে বুঝতে পারবেন। এবং নির্লজ্জতার চরম মাত্রা দেখে পাঠকই হয়তো আপন মনে বলে উঠবেন, ‘ছিঃ! কী নির্লজ্জ!’ সেক্ষেত্রে বলতে হয় বইটির নামকরণ যথার্থ হয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, এ ধরণের বাস্তবভিত্তিক উপন্যাসে ছোট ছোট, সাধারণ, সহজবোধ্য শব্দের প্রয়োগ বেশি ভালো লাগে। আর ঐতিহাসিক ঘটনার প্লটে লেখা উপন্যাসে গুরুগম্ভীর কঠিন শব্দগুলো মানায়। এই বইটিতে কিছু কিছু জায়গায়, বিশেষ করে অতীত ঘটনার রোমন্থনে কিছু কঠিন শব্দের প্রয়োগ আছে। বেশ কিছু শব্দের টাইপিং মিস্টেক আছে। গভীর মনোযোগ বারবার ক্ষুণ্ণ হয় এই বানান ভুলগুলোর কারণে।
লেখিকা ফাহমিদা বারীর জন্ম ২৩ শে নভেম্বর। পিতার কর্মের সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তার শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে। শিক্ষাজীবনের বড় একটা সময় অতিবাহিত হয়েছে রাজশাহীতে। এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড থেকে সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান লাভ করেছেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পুরকৌশল বিভাগে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছেন। কর্মরত পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে। বর্তমানে ডেপুটেশন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিডসে এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
গল্প কবিতা ডট কম, সামহোয়্যার ইন ব্লগ, পেন্সিল, ওমেন চ্যাপ্টারসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে লেখালেখিতে নিযুক্ত আছেন। ২০১৫ সাল থেকে নিয়মিতভাবে একুশের বইমেলায় বিভিন্ন গল্প সংকলনে তার লেখা গল্প প্রকাশিত হয়ে আসছে।
এক নজরে ‘নির্লজ্জ’-
লেখিকা: ফাহমিদা বারী
প্রকাশক: দেশজ
প্রচ্ছদ: সাইফ খান
পৃষ্ঠা: ১৯২
মলাট মূল্য: ৩০০ টাকা মাত্র
রিভিউ: সালসাবিলা নকি







