মোনায়েম খান (অন্যতম প্রধান স্বাধীনতাবিরোধী) তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন। সম্প্রতি যার উত্তরাধিকারদের বেদখলকৃত জায়গা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। সেই মোনায়েম খান ফজিলাতুন নেছার ছেলেমেয়েদের বিশেষ করে শেখ হাসিনা ও শেখ কামাল যেন কলেজে ভর্তি না হতে পারে তার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সেই সময়ে ফজিলাতুন নেছা মুজিব শেখ কামালকে ভর্তির জন্য ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপালকে ফোন করে অনুরোধ করেন। প্রতি উত্তরে প্রিন্সিপাল বলেন, মা আমার চাকরি গেলে যাবে, তারপরও তোমার ছেলেকে ভর্তি করানো হবে।
ফজিলাতুন নেছা মুজিব তার পরিবারের প্রত্যেকটি বিষয় আগ্রহ ও গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করতেন। পরিবারের যেকোন দায়িত্বশীল কাজে নিজে সরাসরি অংশগ্রহণ করে কাজটি সমাধান করতেন কোন ধরণের চাপ অনুভব ছাড়াই। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত অসীম ধৈর্য, দায়িত্ববোধের অপরিসীম ক্ষমতাই ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে মমতাময়ী ও মহীয়সীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। কী যে নিদারুণ কষ্ট আর বাধাকে মোকাবেলা করে তিনি টিকে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তা অনুমান করার জন্য তৎকালীন সময়ের ভয়ানক পরিস্থিতিকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। বাধা, বিপত্তি, ভয়ের কোন তোয়াক্কা না করেই বিবেকের তাড়নায় মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বর্তমানে দেশে বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে আলোচনা হয়। প্রকৃত অর্থে নারী মুক্তি, নারী শিক্ষা ব্যতীত সমাজ তথা দেশের উন্নয়ন কোনক্রমেই সম্ভবপর নয়। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বেকার সময়ে ফজিলাতুন নেছা মুজিব এ প্রকৃত সত্যটি নিজের মধ্যে লালন করেছিলেন। ঐ সময়ের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদের বিশ্লেষণে নারী মুক্তি ও নারীদের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির তাড়নায় কোন ধরণের প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। তবে, নারীদের ক্ষমতায়নে ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সুদৃষ্টি শুরু থেকেই ছিল এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাহত মেয়েদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নে (বিভিন্ন সেক্টরে চাকরির সুপারিশ) জোরালো ভূমিকা নিয়েছিলেন।
ফজিলাতুন নেছা নারীর ক্ষমতায়নের শুরুটা করেছিলেন নিজের ঘর থেকেই। এ প্রসঙ্গে শেখ রেহানার উদ্ধৃতি ‘আপা যখন ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভিপি পদে নির্বাচন করবেন স্থির করেন, তখন প্রথমটায় খানিক আপত্তি ছিল মায়ের। বাবা তখন জেলে। মা’র ভয় ছিল হয়তো নিরপেক্ষ হবে না নির্বাচন। দাদা তখন মা’কে বলেছিলেন, ‘বৌমা, বাচ্চাদের ইচ্ছায় বাধা দিও না। খোকাকে আমি কোন কাজে বাধা দিই না দেখো না?’ মা আর আপত্তি করেননি। তবে আপাকে নিয়ে চিন্তারও শেষ ছিল না তার। তিনি ছাত্রলীগের ছেলেদের ডেকে বললেন, ‘হাসুকে জেতাতে হলে তো কাজ করতে হবে।’ তখন কামাল ভাই, মণি ভাইরা ছোট, তবু তারাও নির্বাচনের সময় খুব খাটেন। আর রাতে যখন খবর আসে যে তার হাসু জিতে গেছেন তখন মায়ের আর আনন্দ ধরে না।
পরদিন ফুলের মালা গলায় কাগজে ছবি ছাপা হয় আপার। হেডিং, ‘ভিপি পদে মুজিব তনয়া।’ বাড়িতে আমাদের তখন খুশিতে নাচানাচি।’ ছেলেমেয়েদের সাফল্যে আনন্দের আতিশয্যে উৎফুল্লতা প্রকাশ করতেন বাচ্চাদের মত এবং উৎসাহ প্রদান করতেন সকলকে। ফজিলাতুন নেছার অপার গুণের মধ্যে এ গুণটিও সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিল।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময়ে বিহারের লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে তৎকালীন সময়ে বাংলায় এনে পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শেখ মুজিব তখন তরুণ ছাত্রনেতা ছিলেন, বিহারে শেখ মুজিবকে পাঠাতে চেয়েও রেণুর অসুস্থতার বিষয়টি অবগত হয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ মুজিবকে নিজে না গিয়ে অন্যকে টিমের সাথে পাঠানোর পরামর্শ ছিল সোহরাওয়ার্দীর। রেণুর সাথে সময় কাটানোর জন্য কঠোর নির্দেশনা ছিল নেতাদের। কিন্তু বিহারে যাওয়ার উদ্দেশে নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই তিনি টিমের সাথে হাজির হয়েছিলেন। শেখ মুজিবকে দেখে শহীদ সোহরাওয়ার্দী অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি এ ব্যাপারে রেণুর সাথে পরামর্শ করেছো?’ প্রতিউত্তরে শেখ মুজিব বললেন,‘আমি তার চিঠি পেয়েছি লিডার। সে লিখেছে, তুমি নিশ্চিন্ত মনে বিহারে যাও, আমার জন্য ভেবো না।’
প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী আবেগ মিশ্রিত কথাবার্তা খুবই কম বলতেন, একটু কড়া স্বভাবের ছিলেন। কিন্তু সেদিন শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘মুজিব সে তোমার জন্য খোদার দেওয়া অমূল্য দান। তাকে অবহেলা করো না।’ সোহরাওয়ার্দী সেদিন ঠিক কথাটিই বলেছিলেন, ফজিলাতুন নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর নিকট সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আশীর্বাদ হিসেবেই এসেছিলেন। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে তিনি স্বামীর সঙ্গে ছায়ার মত লেগে থেকে আজীবন সহায়তা করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অনুপ্রেরণায় শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন বাংলার জনগণ, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মূল শক্তি এসেছিল মূলত পরিবার থেকে। ফজিলাতুন নেছা সার্বক্ষণিক উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে স্বামীকে সঙ্গ দিয়ে গেছেন। ফজিলাতুন নেছা সম্বন্ধে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাঙালির রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার স্ত্রীর মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। আমাকে যখন পিন্ডির ফৌজ বা পুলিশ এসে জেলে নিয়ে যায়, আমার উপর নানা অত্যাচার করে, আমি কবে ছাড়া পাব বা কবে ফিরে আসবো ঠিক থাকে না তখন কিন্তু সে কখনো ভেঙ্গে পড়েনি। আমার জীবনে দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটা হলো আত্মবিশ্বাস, দ্বিতীয়টা হলো আমার স্ত্রী আকৈশর গৃহিণী।’ সুতরাং বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত উক্তির মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায়, ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর জীবনে ফজিলাতুন নেছা বিশাল প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফজিলাতুন নেছা তার বহুমুখী প্রতিভার গুণে স্বামীর প্রতি রাজনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি অন্যান্য সকল দায়-দায়িত্ব নিষ্ঠার সহিত পালন করেছিলেন।
পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের পাশপাশি প্রতিবেশিদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব। আশেপাশের সব বাড়ির লোকজনের সঙ্গে নিজে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতেন, সকলের বিপদ আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। প্রতিবেশিরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আসলে কখনো আপ্যায়িত হন নাই এমন কোনোদিন হয়নি। তিনি সকলের জন্য নিজ মমতায় ও আবেগে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে সুখে দুখে আন্তঃযোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন।
ফজিলাতুন নেছার নিকটতম প্রতিবেশি বেগম সুফিয়া কামাল ব্যক্তি ফজিলাতুন নেছা মুজিব সম্বন্ধে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে-‘মুজিবের কথা বলতে গেলে মুজিবের স্ত্রীর কথা বলতে হয়। এতো ধৈর্য্যশীল, এতো শান্ত, এতো নিষ্ঠাবান মহিলা খুবই কম দেখা যায়। বছরের বারো মাসের বেশির ভাগ সময় কেটেছে জেলখানায়। যখনই শুনেছি মুজিবকে ধরে নিয়ে গিয়েছে, ছুটে গিয়েছি দেখেছি মুজিবের স্ত্রী অবিচল মুখে কাপড়, বিছানা বালিশ গুছিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। বলেছে, আপনার ভাই তো জেলে গেছে। বেচারী খুব ধৈর্য্যরে সাথে টেনেছে। বাপকে জেলে নিয়ে নিয়েছে বলে হাসিনাকে ভর্তি করবে না এমনো দিন গেছে। নারী শিক্ষা মন্দিরে আমরা তাকে ভর্তি করে নিলাম। তখন নারী শিক্ষা মন্দিরের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলাম আমি।’
একজন মহিলা কতটা সাবলীলভাবে পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ফজিলাতুন নেছা। অবশ্য বারংবার এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়ে নিজেকে আরো পরিণত ও উপযোগী করে গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
পর্দার আড়ালে থেকে রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন ফজিলাতুন নেছা, তাই রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে তিনি অনন্য মর্যাদা ধারণ করেছিলেন।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরিফের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জানা যায় ‘বেগম মুজিব মাতৃতূল্য নারী, সংগ্রামের, ধৈর্য্যরে, মমতার এবং দেশপ্রেমিকের এক মহান প্রতীক। আমাদের মুক্তি সংগ্রামে যে সমস্ত মহিয়সী নারীর অসামান্য অবদান আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে, গতিশীল করেছে, মহিমান্বিত করেছে তাদের মধ্যে বেগম মুজিব অন্যতম। সমস্ত বাঙালি জাতির জীবনে গ্রহণযোগ্য, সহনীয়, সমস্ত কষ্ট ও ত্যাগকে অর্থবহ করেছে, যাদের ত্যাগ সকলকেই মাহিমান্বিত করেছে তাদের মধ্যে বেগম মুজিব প্রথম কাতারের মানুষ। দেশ ছাড়ার পূর্বে যুদ্ধের আগে কয়েকবার দেখার সুযোগ হয়েছে ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সাথে ছাত্র রাজনীতির কারণে। বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো, বঙ্গবন্ধু খুব স্নেহ করতেন আমাকে। আমার সাথে ওনার যোগাযোগ ছিল প্রথম থেকেই। ওনাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার।’
প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর সাথে একনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল ফজিলাতুন নেছা মুজিবের, যার ফলে বঙ্গবন্ধু রাজনীতির মাঠটাকে মসৃণ পেয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা একে অন্যের পরিপূরক ছিলেন। একজনকে ছাড়া অন্যজনের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। তাইতো শেষ সময়েও একই দিনে দুইজন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান ঘাতকের নিষ্ঠুর গোলার আঘাতে। একে অন্যের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল এবং সহনশীল ছিলেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকাবস্থায় বঙ্গমাতাকে লিখিত চিঠির ভাষার প্রতিটি পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে ভাবাবেগ, অনুরোধ এবং পরামর্শের ডালি। একবারের চিঠির বিবরণ ছিল এমন:-
‘রেণু,
আমার ভালবাসা নিও। ঈদের পরে আমার সাথে দেখা করতে এসেছ। ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসো নাই। তুমি ঈদ করো নাই। ছেলেমেয়েরা ঈদ করে নাই। খুব অন্যায় করেছ। ছেলেমেয়েরা ঈদে একটু আনন্দ চায়। কারণ, তা সকলে করে। তুমি বুঝতে পারো, ওরা কত দুঃখ পেয়েছে। আব্বা ও মা শুনলে খুবই রাগ করবেন। আগামীতে দেখা করার সময় ওদের সকলকেই সঙ্গে করে নিয়ে এসো কারাগারে। কেন যে চিন্তা করো বুঝি না। আমার কবে মুুক্তি হবে তার কোনো ঠিক নাই। তোমাদের একমাত্র কাজ হবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো। টাকার দরকার হলে আব্বাকে লিখো। কিছু কিছু মাঝে মাঝে দিতে পারবেন। হাসিনাকে মন দিয়ে পড়তে বলো। জামাল যেন মন দিয়ে ছবি আঁকে। এবার একটি ছবি এঁকে যেন নিয়ে আসে। আমি দেখব। রেহানা খুব দুষ্টু। ওকে কিছুদিন পরে স্কুলে দিও জামালের সাথে। যদি সময় পাও নিজেও একটু লেখাপড়া করিও। একাকী থাকতে একটু কষ্ট প্রথমে প্রথমে হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। কোনো চিন্তা নাই। বসে বসে বই পড়ি। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিও।
ইতি,
তোমার মুজিব’।
বিশিষ্ট সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা এবিএম মূসা একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে বঙ্গমাতার উজ্জ্বলতাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নজরুলের কবিতাংশটুকু দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তঃপার্লামেন্টারি বৈঠকে উদ্ধৃত করেছেন। বিশ্বের মহান সৃষ্টিতে যেসব নারীর নাম উল্লিখিত হয়, তারা নিজ গুণে আপন মাহাত্ম্যে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। শেখ হাসিনা তাদের কথাও বলেছেন, যেমন প্রীতিলতা, বেগম রোকেয়া প্রমুখ। এর বাইরে তিনি একটাই নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের কথা নজরুল বলেছেন, ‘জগতের যত বড় জয়, বড় অভিযান, মাতা-ভগ্নি ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।’ সেই বধূদের একজন হচ্ছেন মুজিবপত্নী ফজিলাতুন নেছা।’
শেখ রেহানা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থাকে তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘আর আমার মা! তার কথা ভাবি। কত অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে এতগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে তাকে জীবন সংগ্রামে নেমে পড়তে হয়েছিল। আব্বা আগের দিন মন্ত্রী, পরের দিন জেলখানায়, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সরকারি বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে, কিন্তু কেউ মাকে বাসা ভাড়া দিচ্ছে না। আমার তখনো জন্ম হয়নি, কিন্তু এসব ঘটনা তো শুনেছি, পড়েছি, পরে নিজের চোখে দেখেছি। গ্রামে জন্ম হওয়া একজন সাধারণ নারী আমার মা, ক্লাশ ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন মিশনারি স্কুলে। কিন্তু কি যে প্রজ্ঞা, কী যে তার ধৈর্য। আমার মায়ের কাছ থেকে আমাদের যে জিনিসটা সবার আগে শেখা উচিত, তা হলো ধৈর্য আর সাহস। সবাইকে এক করে রাখা। এতগুলো লোক বাড়িতে খাচ্ছে-দাচ্ছে, আমাদের গ্রামে কোনো মেয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছে, তাকে এনে ঢাকায় কলেজে ভর্তি করে দাও, কাকে বিয়ে দিতে হবে! সব সামলাচ্ছেন। এরমধ্যে আমাদের সকালে কোরআন শরিফ পড়া শেখাতে মৌলভি সাহেব আসছেন, তারপর নাচ শিখছি, সেতার শিখছি, বেহালা শিখছি, সব কিন্তু মায়ের সিদ্ধান্ত। কিন্তু তার নিজের বয়স কত! আমার তো মনে হয়, আমার মা কি কোনো দিন তার শৈশবে কিংবা কৈশোরে একটা ফিতা বা রঙিন চুড়ি চেয়েছেন কারও কাছে! মা-ই তো সব থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অথচ তিনি হাসিমুখে সব সামলাচ্ছেন।’
ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জীবনটাকে বহুমুখী ধারায় ব্যাখ্য করার প্রয়োজন বিশদভাবে। কেননা, প্রত্যেকটা সেক্টরে তিনি একজন আটপৈৗরে বাঙালি রমণী হয়ে যে মনোমাহিন্যতার ছাপ রেখেছেন বিশেষ করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বাঙালি রাজনীতির সংগ্রামের ইতিহাস, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সিদ্ধহস্ততা, আন্দোলন-সংগ্রামে উৎসাহ প্রদান, মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, নিজের ছেলেদের যুদ্ধে পাঠানো, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে সমাজ বিনির্মাণে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন এই মহিয়সী নারী।
বাঙালি জাতি, বাঙালির ইতিহাস, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে তিনি যে অগ্রণী সেনানায়কের ভূমিকা পালন করেছেন তার অবদান কোন বিশেষণেই বিশেষায়িত করে গুরুত্বকে সম্পূর্ণরূপে তুলে আনা যাবে না। তিনি তার কর্মের মাধ্যমেই অমরত্ব লাভ করেছেন, বেঁচে থাকবেন আজীবন বাঙালি জাতির মানসপটে পরম শ্রদ্ধায়।
চলবে…







