বাবা খুব ভাল হয়েছে তুমি আমাদের মাঝে এখন নেই। এখনকার অবস্থা খুব ভাল না। আমাদের এও সমাজে এখন ব্যক্তিগত, পারিবারিক আর সামাজিক মূল্যবোধ বলে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। তাইতো সরকার তথা রাষ্ট্রের কাজে মূল্যবোধের আস্তর আছে কি না তা দেখতে এখন ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস লাগে। তোমার দেওয়া চোখে যা দেখতে শিখেছিলে তা থেকেই আমি এ কথা বলছি।
তুমি এখন না ফেরার দেশে, পরপারে। ওখানে বসেই তুমি ঠিক করে কান পেতে শুনলেও কষ্ট পাবে। কত হাজার ঘটনা এখানে প্রতিদিন ঘটে তার বিবরণ দিতে গেলে মহাকাব্য লিখলেও শেষ হবে না। তবুও কয়েকটা কথা বলি। প্রাইমারী স্কুলে নীতি কথা পড়ানো হয় না। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকগণেও এখন টিউশনি করেন। তুমি কষ্ট পেয়োনা যদি শোন শিক্ষকের বা পিতা মাতা ভাই বনের সহায়তায় প্রাইমারীতেই বাচ্চারা চিটিং বা নকল শেখে।
কলেজের অবস্থাও খুব খারাপ। কষ্ট পেয় না বাবা এই কথা শুনে। ব্রিটিশদের মত আমাদের দেশেও শিক্ষা এখন পণ্য। ইংলিশ মিডিয়াম/ ভার্সন স্কুল অনেক। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সাত্রীফিকেট বিক্রি হয় বলে অভিযোগ আছে গুরুতও, কখনবা প্রমাণিত। এক বা দুইটি ছাড়া কোন বিষয়েই পেশাগত নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া হয় না।
এখন মোবাইল ফোনের যুগ। এই ফোনের তার নেই কোন। তাই সবার হাতে হাতে এই ফোন। এই ফনে আছে ইন্টারনেট সুবিধা। ছোট্ট ছেলে মেয়ে বা স্ত্রীর সামনে বাড়িতে বসেই ফোনে মিথ্যা করে বলে যে সে বাইরে আছে। ছেলে মেয়েরা মুখটিপে হেসে বলে, ‘বাবা খুব স্মার্ট’। ঈদের সময় বা পূজা পার্বণে গৃহকর্তা যা খরচ করে তা হয়ত সারা বছরেও সে বেতন পায় না বা বৈধভাবে আয় করে না। ভাবটা আর আচরণটা এমন যে এটা এ যুগে এটা করতে হয়, না করলে টেকা যায় না।
পারিবারিক নৈতিকতাও প্রায় শেষ। ভাই ভাইকে ঠকিয়ে বা চিটিং করে অর্থ আয় করছে। একটা সত্যি গল্প বলি। পাশের গ্রামের ছলিম চাচার বড় ছেলে রহিম বিদেশে গিয়েছলেন তা ত তুমি জানই। আমেরিকা থেকে অনেক টাকা পাঠিয়ে কিছু জমি আর ফ্লাট কিনেছিলেন ঢাকায়। সেগুলো দেখাশুনা করার জন্য ছোট ভাই জামালকে জমির দলিলের কপি আর তাঁর পাসপোর্ট আর ন্যাশনাল আইডি’র (ভোটার আইডি, তমাদের সময় ছিল না) দিয়েছিলেন। গত মাসে শুনলাম জামাল ন্যাশনাল আইডি’র ছবি জাল করে রহিম সেজে কম দামে জমি ফ্লাট সব বিক্রি করে খেয়েছে।
বাবা জানো, এখন বড় বড় জ্ঞানী গুনীরা রাষ্ট্র আর সরকারের মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না, বা বুঝেও বিশেষ উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুসকে বিভ্রান্ত করেন। তোমাদের সময় তো প্রাইভেট ইউনিভারসিটি ছিলো না। সবাই সরকার নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে দেশের ধনী গরীব সবার ট্যাক্সের অনেক টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে সব ছাত্রের পিছনে।
মানে তারা রাষ্ট্র তথা দেশের আপামর জনগনের কাছে ঋণী। কিন্তু এখন অনেকের আচরণ এমন যে, তুমি দেখলে খুব কষ্ট পাবে। তাদের ভিতর কোন কৃতজ্ঞতা বোধ নেই, রাষ্ট্রের প্রতি বা রাষ্ট্রের মালিক জনগনের প্রতি তাঁদের কোনই কমিটমেন্ট নেই। শুনে হাসবে কি না জানি না, এখন সরকার আর সরকারী দলের মধ্যে কনি পার্থক্য দেখা মেলা ভার। সরকারী দলের নেতা মানেই সেও সরকারের অংশ।
সরকার আর সরকাড় দল আলাদা করা যায় না বলে সরকারকে মোকাবিলা করতে হয় বিরোধীদলকে। সরকার গঠণকারী দল সেখানে নিষ্প্রভ। আর বিরধী দল? তারা সরকার আর রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য বোঝে না। তারা সরকারের বিরোধীতা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের বিরোধীতা করে বসেন অহরহ।
শুনে তুমি খুব অবাক হবে বাবা। এখন বিভিন্ন ধরনের মিডিয়ার ছড়াছড়ি। তুমি ১৯৫৭ সালে ৬৫০টাকা দিয়ে যে রেডিও কিনেছিলে। তেমন রেডিও এখন সব খানেই পাওয়া যায়। টেলিভিশন স্টেশন এখন কত তাই বলা মুশকিল। আর টেলিভিশন সেট গ্রামের প্রায় সব ঘরে ঘরে। পত্রিকা আছে কয়েক ডজন। আর অনলাইন পত্রিকা হাজারে হাজার। দেশে কী হচ্ছে তা সবার আগে ফেসবুক আর অনলাইন পত্রিকায় পায়া যায়। তাই এটা খুব জনপ্রিয়।
সব চেয়ে জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক, ঘরে বসে এখন আর কেউ গল্প করে না। ফেসবুক চালায়। মজার ব্যাপার হলো নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষেরা নানাভাবে এটার অপব্যবহার করছে। মিথ্যা নিউজ, টেম্পারিং বা কাট-পেস্ট করা ছবি দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য যে যা পারে তাই ছাপিয়ে যাচ্ছে বা প্রচার করছে। ধরাও পড়ছে, কিন্তু লজ্জা নেই। সেই দুই কান কাটার গল্পের মতো তবুও বড় বড় বা জোর গলায় কথা বলেই চলেছে এসব অসৎ মানুষেরা।
আমাদের দেশের সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কিন্তু বাঙ্গালী মনে করলে তুমি কিন্তু খুব ভুল করবে বাবা। কিছু বাদে সবাই প্রায় অসততার প্রতিযোগীতায় নেমেছেন। সৎ কর্মচারী-কর্মকর্তাদের পাগল বলা হয়। তাদের পরিবারের দিন কাটে খুব অভাব অনটনে। এদের ভিতর যারা সরকারী দলের চামচা, তাঁর কিন্তু মহা ক্ষমতাশালী, কত ক্ষমতা তা অনুমান করতে পারবে না।
বাবা তুমি বলতে, ‘যারা বড় বড় অন্যায় করে টিকে থাকে সমাজে তাঁদের ক্ষমতাশালী বলে’। বাবা, বাংলাদেশে এখন ক্ষমতাশালীদের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অন্যায় না করা এখন অনেক অফিসে অন্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারী অফিসে গিয়ে যার চেহারা খুব মলিন, যিনি পোশাক আশাকে খুব দুর্বল বুঝে নেবে তিনি সৎ, দেশ প্রেমিক কর্মচারী-কর্মকর্তা।
ব্যাবসায়ী মানেই রাতারাতি কোটপতি হয়ার সুযোগ। পণ্যে ভেজাল দেওয়া খুব মামুলি কাজ এখন। অরা সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সাথে মাঝে মাঝে লুকোচুরী খেলে, সরকার আর জনতা খুশী হয়ে যায়। শিল্প বেশিরভাগ কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি নিয়ে ঘাপলা করে, যা পরে সিস্টেম লস হিসেবে যোগ হয়। সাধারণ মানুষ তার ঘানি টানে। ব্যাংকে বা ফোনের বুথে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বিল দিলেও বছরে ২/৩ বিল পরে ভূয়া হয়ে যায়। মেনে না নিলে তমার লাইন কাটা থাকবে অনেক দিন, সে আরেক লড়াই। সময় কথায় সেই লড়াইয়ে যাবার।
সাধারণ মানুষ এসব দেখে হতবাক। তারাও রাষ্ট্র আর সরকারের পার্থক্য বঝেন না। তারা নাগরিক দায়িত্ব পালন না করে রাষ্ট্র তথা সরকারের কাছে রাষ্ট্রের করণীয় নিয়ে প্রশ্ন তলে। নিরাপত্তার মত বিষয়েও মানুষ নিরব। ভাবে সরকারের পুলিশ আর সরকারের বিভিন্ন বাহিনী সব করবে। এটা তাদের নাগরিক অধিকার। নাগরিক অধিকার নিয়ে সচেতন এসব মানিসের তাঁদের মান দিয়েছেন, বুদ্ধিজীবী। তারা রেডিও, টেলিভিশনে টক শো করেন, পত্রিকায় বড় বড় আদরশের কলাম লেখেন, যদিও নিজের জীবনে তা পালন করেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অধ্যাপক আছেন যিনি তার পরিবারকে নিজের মতে আনতে পারেন না, সংসার ভেঙ্গে যায় বারে বারে আর তিনি সামাজিক ও পারিবারিক শান্তি নিয়ে জাতিকে শিক্ষা দিতে টক শো করেন টেলিভিশনে, কলাম লেখেন পত্রিকায়।
বাবা এবার তোমাকে কিছু ভাল খবর দিই। আমাদের দেশে এখন আর কেউ না খেয়ে মরে না। কম খায় এমন আছে অনেকে। অতি দারিদ্রের সংখ্যাও খুব কম, এখন। চিকিৎসা খুব ব্যায়বহুল হলেও সুবিধা পৌঁছে গেছে উপজেলা পর্যায়ে। রাষ্ট্র অনেক কিছুই এখন দেয়। গ্রামের গরীবদের ভাতা দেয়। তাঁদের ছেলে মেয়েরাও বা গরীব গর্ভবতী মায়েরা ভাতা পায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেক ভাল হয়েছে আগের তুলনায়, যদিও দেশের প্রায় ৩০ভাগ লোক এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তা থাকবে না।
দেশের প্রায় সব খাতের অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে, হচ্ছে আরো দ্রুত। দাতা দেশের মানুষেরা এখন বলছে আমরা নাকি মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছি। নৈতিক উন্নতি না হলেও আর্থিক উন্নতি হয়েছে, হচ্ছে অনেক দ্রুততার সাথে। আশে পাশের অনেক দেশ আমাদের ঈর্ষা করতে শুরু করেছে। আশা রাখি সে দিন হয়ত আর দূরে নয় যখন তোমার নাতি পুতিরা দেখবে যে বাংলা মানুষেরা অর্থনৈতিক ও নৈতিকতার বিচারে বিশ্ব সেরা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







