তেত্রিশ বছরের ক্যারিয়ারে বিভিন্ন মেয়াদে জাতীয় দলের সহকারী ও হেড কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিসিবি ও ক্লাবগুলোর ডাকে সানন্দেই সাড়া দিয়েছেন সবসময়। কিন্তু এবার বিরল একটি অভিজ্ঞতাও হল সারোয়ার ইমরানের। কোচিং ক্যারিয়ার শুরুর পর প্রথমবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে কোন ক্লাবের দায়িত্ব পাননি দেশের ক্রিকেটের সফল এই কোচ। তার অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করেছে বারোটি ক্লাবই। কথা বলে জানা গেল, দল পরিচালনায় ক্লাবগুলো অযাচিত হস্তক্ষেপ করে, সেটি তার দায়িত্বকালে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না বলেই তাকে ডাকার সাহস করেনি কেউ।
আপদকালীন সময়ে বারবার ইমরানের মত অভিজ্ঞ কোচের শরণাপন্ন হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বয়সভিত্তিক দল, হাই-পারফরম্যান্স ইউনিট, বিসিবি একাডেমি, পেসার হান্ট কর্মসূচিতে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ক্যারিয়ার এত সমৃদ্ধ হলেও প্রিমিয়ার লিগে তার দল না পাওয়া ক্রীড়াঙ্গনকে বিস্মিতই করেছে।
সিটি ক্লাব মাঠে দাঁড়িয়ে রোববার চ্যানেল আই অনলাইনকে বললেন, ‘প্রিমিয়ার লিগ ব্যাপারটা! এখন যেভাবে লিগ হয়, আগের মতো হয় না তো। এখন ফরমায়েশ আসে উপর থেকে। যারা টাকা দেয় তাদের কথামতোই সব হয়। যারা টিম করে, তাদের কথা মত চলতে হয়। বেশিরভাগ টিমেই চাপ থাকে। গত বছর ব্রাদার্সে ছিলাম। আমার সাথেও হয়েছে, কিন্তু আমি শুনিনি। তাই হয়ত যে টিমে ছিলাম ওই টিম আমাকে রাখেনি। অন্য ক্লাবগুলো হয়ত জানে আমার নৈতিকতা, ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে। এজন্য আমি হয়ত এবার লিগে টিম পাইনি।’
সারোয়ার ইমরান বর্তমানে দ্বিতীয় বিভাগ লিগে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কোচের দায়িত্বে আছেন। ঢাকা লিগ নিয়ে বলতে গিয়ে কয়েকবার আবেগি হয়ে উঠলেন। তার কথার সত্যতা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবারই কমবেশি জানা।
ক্লাব ক্রিকেটে কোচদের ওপর কর্মকর্তাদের কতটা চাপ থাকে সেটির নজির মিলেছে চলতি মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগের প্রথম দিনের ম্যাচেও। গত ১২ এপ্রিল বিকেএসপির তিন নম্বর মাঠে লড়ছিল প্রাইম দোলেম্বর স্পোর্টিং ক্লাব ও পারটেক্স স্পোর্টিং ক্লাব। বোলিংয়ে তখন পারটেক্স। গ্যালারিতে বসা ক্লাব কর্মকর্তার কাছে এসে ধরণা দিলেন পারটেক্স কোচ। কখন কে বোলিং করবেন তার নির্দেশনা দিলেন ওই কর্মকর্তাই। এমনটা অহরহ হচ্ছে। ছোট ক্লাবগুলোর এই চর্চা বড় ক্লাবগুলোতেও সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়েছে।
কোচ সারোয়ার ইমরান মনে করেন এই চর্চা না পাল্টালে যারা নৈতিকতা মেনে কোচিং করাতে চান তারা টিম পাবেন না, ‘আস্তে আস্তে অনেকেই টিম পাবে না। যারা কর্মকর্তাদের কথা শুনবে তাদের অগ্রাধিকারে রাখা হবে। তারা টাকা দেয়, যেভাবে বলবে সেভাবেই করতে হবে। এটি মানা না মানার ব্যাপারটি আসলে সেইসব কোচের ওপর নির্ভর করবে। যারা ওইভাবে কোচিং করিয়ে যেতে চায় তারা করবে, তারা থাকবে।’
সারোয়ার ইমরান মনে করেন কোচের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা না থাকলে সেটি খেলোয়াড়দের জন্যও বড় ক্ষতি, ‘ক্রিকেটের জন্য তো অবশ্যই ক্ষতিকর। কোচের যদি স্বাধীনতা না থাকে, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা না থাকে; টিমটা খারাপ করলে জবাবদিহিতা কে করবে? কোচের কাছ থেকে নির্দেশনা এলে প্লেয়াররা জানবে কোনটা ভুল, আর কোনটা কি হচ্ছে না হচ্ছে। কোচ যখন সিদ্ধান্ত নেয় প্লেয়ারদের সঙ্গে আলাপ করেই নেয়। কিন্তু বাইরে থেকে নির্দেশনা এলে সেটা তো আর আলাপ করে হয় না।’
কাজ না থাকায় বিসিবি একাডেমির কোচ হিসেবে থাকা চাকরিটাও ছেড়েছেন সারোয়ার ইমরান। বসে বসে বেতন নেওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে টিম না পাওয়াতেও আক্ষেপ নেই তার। ক্লাবগুলোর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে না বলে আছে স্বস্তিও,, ‘একাডেমির কোচিং আমি উপভোগ করছি। একটু বিশ্রাম পেয়েছি। কারণ আমি সারা বছরই কোচিং করাই। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবে যাই। চাপহীন আছি এখন। প্রিমিয়ার লিগ মানেই তো চাপ। যতটুক না ভেতর থেকে, তারচেয়ে বেশি বাইরে থেকে।’










