ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় নানা ফুলে ভরে উঠেছে শহীদ মিনারের বেদী। সেই ফুল দিয়ে স্বেচ্ছাসেবীরা পুরো বেদিকে সাজিয়েছেন শৈল্পিকভাবে। চার বছরের শিশু মানহা, ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন সেই শিল্পকর্ম। তার ওপর বুলিয়ে দিচ্ছিল ভালোবাসা মাখানো হাতের আলতো পরশ। ঠিক কোলের শিশুকে যেমন আদর করে মা।
এইদিনে কী হয়েছিল তা ঠিক মাথায় আনতে না পারলেও তা যে বিশেষ কিছু, সেটা তার অভিব্যক্তিতেই ফুটে উঠেছে। বোঝা যাচ্ছে, এই ছোট্ট শিশুটিকেও শিহরিত করেছে একুশ।
মানহার মত এরকম শত শত শিশুকে দেখা গেল শহীদ মিনার চত্ত্বরে। কেউ এসেছেন বাবার সঙ্গে, কারও সঙ্গে এসেছেন মা-বাবা দুজনই। কেউ কেউ এসেছেন চাচা-চাচি বা বড় ভাই-বোনের হাত ধরে।
শুধু কি ছোট্ট শিশু? বরাবরের মত নানা বয়স ও শ্রেণিপেশার সব ধরনের মানুষের এক অভূতপূর্ব ঢল নেমেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়। প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা জানানোর পর থেকে স্মৃতির মিনারে জনতার যে ঢল নেমেছে একুশের মধ্য দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলেও সে ঢল কমেনি। শেষ বেলা পর্যন্ত শহীদ বেদীতে ফুল দেওয়ার লাইনে হাজার হাজার মানুষ। তাদের কেউ এসেছেন কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের পক্ষ থেকে। কেউ বা এসেছেন ব্যক্তিগতভাবে। ফাগুনের আগুন ঝড়া রোদে দাঁড়িয়েও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন শহীদের চরণে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।
লাখো জনতার এই বিশাল ঢল শুধু রাজধানীতে থাকা মানুষেরাই নয় দেশের দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই এসেছেন শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। আর একজন মানুষও যেন শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন সে জন্য ঘোষণা মাইক থেকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে ‘আপনারা সুশৃঙ্খলভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করুন। একজন মানুষ বাকী থাকলেও আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব চলবে।’
কুমিল্লা থেকে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে এসেছেন শফিকুল ও মরিয়ম দম্পতি। চ্যানেল আই অনলাইনকে জানালেন, কেবল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দেবেন বলেই দুই মেয়েকে নিয়ে ছুটে এসেছেন। ঢাকায় তাদের অন্য কোন কাজ নেই।
‘‘প্রতিবছর টিভিতে দেখি, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের সব ধরনের মানুষ এখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। তা দেখে আমাদেরও খুব ইচ্ছা ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শ্রদ্ধা জানানোর। তাই এবার আগেই পরিকল্পনা করেছি যে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে এবার ঢাকায় আসবো’’ বলেন মরিয়ম আক্তার।
আর একুশের চেতনার সঙ্গে যেন ছোট বেলা থেকেই পরিচিত হয়ে উঠতে পারে এবং দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পায় সে জন্যই দুই শিশুকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে আসা বলে জানান শফিকুল ইসলাম।
কয়েকজন তরুণ-তরুণীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আমাদের কাছে ভাষা প্রেম মানে ভাষাটাকে ভালোভাবে জানা শেখা ও বলা। তার মানে এই নয় যে, আমরা অন্য ভাষা শিখবো না বলবো বা। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন মাতৃভাষাটাকে ভালো করে জানা এবং এই ভাষার সমৃদ্ধিতে নিরলস কাজ করে যাওয়া।
আদালত থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে বাংলা প্রবর্তনের দাবিও তোলেন নতুন প্রজন্মের এই প্রতিনিধিরা।
তারা মনে করেন, সবক্ষেত্রে বাংলার প্রচলন না হলে একুশের মূল চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভন নয়।






