অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান, বয়স ৭৮ বছর। নানারকম শারীরিক সমস্যার সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। সেদিন হঠাৎ একটু বেশি রকমের অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার পরিবারের লোকেরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ভর্তি হতে বলার পরপরই উনি প্রথমেই ওনার মেয়েকে বললেন, আমার ডিপার্টমেন্টে একটা ফোন করে জানিয়ে দে আমি অসুস্থ। আমি ২-৩ দিন যেতে পারব না। কালকে আমার ক্লাস আছে। ওরা যেন আজই নোটিশ দেয় যে আমি কালকের ক্লাসটা নিতে পারবো না। তা না হলে ছেলেমেয়েগুলো শুধু শুধু কালকে এসে ফিরে যাবে, যা উচিৎ হবে না।
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী আমাদেরও শিক্ষক ছিলেন আজ থেকে ৩৪ বছর আগে। এরও অনেক আগে থেকেই ওনার শিক্ষক জীবনের শুরু। আজ পর্যন্ত কোন ইতিহাস নেই যে উনি কোন ক্লাশ অপ্রয়োজনীয় কোন কারণে বা শখের বসে বাদ দিয়েছেন। এই বয়সে এসেও এখানে-ওখানে পড়াচ্ছেন শুধু জীবিকার প্রয়োজনে নয়, ছাত্র-ছাত্রীদের আরও বেশি কিছু দেয়ার জন্য, যা ওনার কাছে আছে।
আমাদের পিতৃস্থানীয় শিক্ষক অধ্যাপক ক আ ই ম নূরদ্দীন স্যার ছিলেন বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র শিক্ষক। বিভাগের সব টিচারই তার ছাত্র-ছাত্রী ছিল। সেই স্যারকেও দেখেছি প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ডিপার্টমেন্টেই থাকতেন, সব ব্যাচের ক্লাস নিতেন। আহাদ স্যার, আরেফিন স্যার, সালাম স্যার, তৌহিদ স্যার, গোলাম রহমান স্যার, মান্নান স্যার, সিতারা ম্যাডাম, রিয়াজ স্যার, আনিস স্যার, সুব্রত স্যার, সেলিম স্যার, মিশুক স্যার, গীতি ম্যাডাম, মিতি আপা, দিলা ম্যাডামসহ ডিপার্টমেন্টের সব শিক্ষক-শিক্ষিকাকে দেখেছি যার যা কাজই থাকুক না কেন, ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস ছিলেন। এমনকি বিভাগের পার্টটাইম শিক্ষকরাও, যারা সেসময়ের নামকরা সাংবাদিক ছিলেন, তারাও ক্লাস বাদ দিতেন না। ওনারা সবাই যে একরকম ক্লাস নিতেন, তা নয়; বিভিন্নজনের ক্লাশ নেয়ার পদ্ধতি ও মান ছিল বিভিন্নরকম।
ছাত্র-ছাত্রীদের সময় না দিয়ে বা কম দিয়ে অন্যদিকে সময় দেয়ার মত কোন সুযোগও তাদের তেমন ছিল না। সবাইকেই প্রতিদিন অন্তত ৪/৫ টি ক্লাস নিতেই হতো। কারণ তখন ছিল শিক্ষকের অভাব। শুনেছি এখন নাকি ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। শিক্ষক আছেন কিন্তু তাদের নেয়ার মত ক্লাসের অভাব আছে। একজন শিক্ষকের জন্য সপ্তাহান্তে ১ টি বা ২টি ক্লাস বরাদ্দ থাকে। ব্যাপারটা বেশ অস্বাভাবিক। তাহলে এত শিক্ষক নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কী ছিল? শিক্ষকের মূল কাজ পড়ানো ও গবেষণা করা। কারণ তাদের কাজ প্রতিনিয়ত জ্ঞান অর্জন ও তা বিতরণ করা। তাই একজন শিক্ষক প্রতিনিয়ত নিজেকে তৈরি করেন। কিন্তু ক্লাসের সংখ্যা এত কম থাকলে তারা কার কাছে, কিইবা বিতরণ করবেন?
অবশ্য আজকাল আমরা দেখছি শিক্ষকরা ক্লাশ ছাড়াও আরও অনেককিছুর সাথেই জড়িত, যা কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের কাজের থেকে অনেকটাই আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুনেছি এমনও শিক্ষক আছেন, যিনি নিজেও পড়াশোনাটা ঠিকমত করেন না এবং ছাত্র-ছাত্রীদের করান না। কেউ কেউ নাকি মাসের পর মাস ক্লাসও নেন না। তাহলে সেই শিক্ষক করেনটা কী?
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শুধু ফার্স্ট ক্লাস দেখে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন আনা দরকার। রেজাল্ট ভালো করলেই যে কেউ ভালো শিক্ষক হবে, এর কোন মানে নেই। নিয়ম হওয়া উচিৎ, শিক্ষক হওয়ার পর সেই শিক্ষককেই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি এ পদে থাকার যোগ্য। ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে চায়, তার পড়ানো সাবজেক্টটা চায়। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থার এরকম দুর্বলতার কারণেই আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায় না।
সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটা সামনে এসেছে, তা হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কি একসাথে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে ফুলটাইম চাকরি করতে পারেন? আমার জানামতে, আমরা যারা চাকরি করি, তারা কেউই এটা করতে পারি না। অফিস জানলে চাকরি থাকার কথা নয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিটা থেকেই যায়। বুঝলাম না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন জেগে ঘুমাচ্ছে? কেন বছরের পর বছর ধরে এই অনিয়ম চলছে?
বহুদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থার আকাল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে, চায়ের কাপে ঝড় উঠছে। কিন্তু খুব সম্প্রতি প্রকাশিত একটি খবর আমাকে দারুণভাবে মর্মাহত করেছে। খবরটির সত্য-মিথ্যা আলোচনায় না গিয়েও বলতে পারি, শুধু অভিযোগটি নিয়েই চারিদিকে কানপাতা যাচ্ছে না। ‘তারকা-শিক্ষক’ জড়িত বলে, গণমাধ্যমের সাথে জড়িত বিভাগ বলে, আর অভিযোগটাও বেশ বাজে টাইপের বলে এই আলোচনা তুঙ্গে ।
এই ‘চৌর্যবৃত্তির ঘটনা’ নিয়ে ফেসবুকে যার যা খুশি বলে যাচ্ছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, এর শিক্ষক, শিক্ষা পদ্ধতি, পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীদের মান নিয়ে কথা বলছেন অনেকেই। কিছুদিন আগেও ৫৭ ধারা নামের একটি বিতর্কিত ধারায় এই বিভাগেরই একজন শিক্ষক আরেকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিলেন। অথচ এই বিভাগের শিক্ষক-ছাত্ররা এই ঘটনার দু’য়েক দিন আগেও ৫৭ ধারার বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল। এরও আগে ঢাকার বাইরে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়ে বেশকিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিবারই সামাজিক মাধ্যমসহ গণমাধ্যমে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে ব্যাপকভাবে মুখরোচক আলোচনাও হয়েছিল।
সম্প্রতি গবেষণাপত্রে বিদেশি লেখা কপি-পেস্ট করার যে অভিযোগটি উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে, এরমধ্যে দু’জনই সাংবাদিকতা বিভাগের সাথে সম্পর্কিত। এরপর অনেকেই সাংবাদিকতা বিভাগ, এর শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা ও কাজের কোয়ালিটি নিয়ে কথা বলছে। একজন সাংবাদিক যিনি অন্য একটি বিভাগ থেকে পাশ করে ভাল সাংবাদিক হয়েছেন, তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘আজ বুঝলাম কেন সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পাশ করার পরও ছেলেমেয়েরা ভালো ইন্ট্রো লেখা শেখে না।’
কিন্তু আমি বলতে চাই এই সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পাশ করে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী দেশে-বিদেশে খুব ভালভাবে বিভিন্ন পেশায় কাজ করে যাচ্ছে। এই বিভাগ থেকে পাশ করে অনেক নামকরা সাংবাদিকও হয়েছেন। সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পাশ করলেই যে কেউ ভালো ইন্ট্রো লিখতে পারবে বা ভাল সাংবাদিক হবে তা যেমন জোর দিয়ে বলা যাবে না, ঠিক তেমনি সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেনি বলেই বা যে কেউ ভাল সাংবাদিক হতে পারবে না, তাও কিন্তু ঠিক নয়। ডাক্তারি পাশ তো অনেকেই করে কিন্তু ভাল ডাক্তার ক’জন হয়?
তাই সবার কাছে বিনীত অনুরোধ, যাকে নিয়ে অভিযোগ, যা নিয়ে অভিযোগ তা নিয়ে যথাযথভাবে কথা বলুন। আমরা যারা ওই বিভাগের প্রাক্তন বা বর্তমান ছাত্র-ছাত্রী তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না। দু’য়েকজনের দোষ বা ব্যর্থতা বা দুর্বলতা এই বিভাগের সব শিক্ষকের উপর চাপিয়ে দেবেন না।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগটি আমাদের খুব প্রিয়। এর ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে আমরা গর্বিত। আমরা যারা ৩৫-৪০ বা তারও বেশি সময় আগে এই বিভাগ থেকে পাশ করে বের হয়েছি, তারা এখনও এই বিভাগের সাথে একাত্ম। বিভিন্ন ব্যাচের মধ্যে যে সখ্য রয়েছে, তা আর কোন বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আছে কি না আমি জানি না। পেশাগতভাবে অনেকেই কাছাকাছি অবস্থানে বলেই হয়তো এমনটা হয়েছে ।
শিক্ষকদের সাথেও আমাদের বন্ধনটা সেই আগের মতই আছে। স্যাররা আজও আমাদের খুব ভালবাসেন। তাই আমরা আশা করবো এই বিভাগের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীরা এমন কিছু করবেন না, যেন মানুষ যা নয় তাই বলার সুযোগ পায়। আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছি যে বিভাগের বারান্দায়, করিডোরে, ক্লাসরুম ও সেমিনার রুমে, সেই বিভাগ আমাদের কাছে এখনও ভালবাসার। তাই বিভাগকে ঘিরে নেতিবাচক কোনকিছু এখনও মেনে নিতে পারি না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









