জেনারেল এরশাদের শেষ দিনগুলোতে তার উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার এবং জনগণের বিপক্ষে না দাঁড়াতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য অনুঘটক হয়েছিল একযোগে সকল সংবাদপত্রে ধর্মঘট এবং বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি এরশাদের উপর অনাস্থা। এর আগের এক সপ্তাহ সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলেও এবং গুলির নির্দেশ থাকলেও সেনা সদস্যরা জরুরি অবস্থা এবং সান্ধ্যআইন অমান্যকারীদের দমনে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার এবং প্রেসিডেন্ট এরশাদকে তাদের বার্তা দিয়ে দেন।
সেসময়ের সেনা কর্মকর্তারা জানান, ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় জরুরি অবস্থা জারির আগেই ওইদিন সকালে পূর্বনির্ধারিত সৌদি আরব সফরের জন্য ঢাকা ছেড়েছিলেন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন খান। তার সঙ্গে ছিলেন ডিরেক্টর (মিলিটারি অপারেশন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। তারা আকাশপথেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এইচ এম এরশাদের নির্দেশে সেনা মোতায়েনের খবর পান।
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, পরদিন (২৮ নভেম্বর) সকাল ১০টার দিকে তাদের সঙ্গে সেনা সদরের যোগাযোগ হয়। টেলিফোনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন নূর উদ্দিন খান। সেনাপ্রধানের অনুপস্থিতিতে তখন সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম।

সৌদি আরবে সেনা প্রধানের পাঁচদিন থাকার কথা থাকলেও অবস্থা বিবেচনায় তিনদিন পরই তিনি দেশে ফিরে আসেন। তার অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনী রাস্তায় প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থানের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানিয়ে রেখেছিল। আর সেনাপ্রধান দেশে ফেরার পর প্রথমে পরোক্ষ এবং পরে প্রত্যক্ষভাবে এরশাদকে বার্তা দিয়ে দেওয়া হয় যে তার ক্ষমতার জন্য সেনাবাহিনী আর গুটি হবে না।
জেনারেল ইবরাহিম বলেন, সেনা সদস্যদের মধ্যে এই উপলব্ধি ছিল যে বাইরে সেনাশাসনের কথা বলা হলেও ওই শাসনের সঙ্গে আসলে সেনাবাহিনীর কোন সম্পর্ক ছিল না, তাই ব্যক্তির জন্য সেনাবাহিনী দায় নিতে রাজি ছিল না। সিনিয়র সেনা কর্মকর্তারা ১৫ দিন আগেই রাষ্ট্রপতি এরশাদকে আকারে-ইঙ্গিতে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
যখন প্রয়োজন হয়েছিল সেনাবাহিনী তখন সরাসরিও তা জানাতে দেরি করেনি। তার আগে অবশ্য মিলিটারি অপারেশন্সের পরিচালক হিসেবে জেনারেল ইবরাহিম আরো কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ এক ধরনের জনমত জরিপের মতো তথ্য সংগ্রহ করে সৈনিকদের মনোভাব বুঝে নেন। উচ্চ পর্যায় থেকে পরে তা এরশাদকে জানানোর সময় ৪ ডিসেম্বর সচিবালয়ে বেসামরিক প্রশাসনের ‘বিদ্রোহ’ এবং এরশাদের উপর তাদের অনাস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক সদর দপ্তর সচিবালয়ে সেদিন কী ঘটেছিল? এ বিষয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে জানিয়েছেন সেসময়কার তরুণ কর্মকর্তা এবং পরে সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া আবু আলম মো: শহীদ খান।
তিনি বলেন, সচিবালয়ে সেদিন স্লোগান উঠেছিল: জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো। এরশাদের চাকরি আমরা আর করব না। স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হোক। রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়।

তিনি বলেন: ৯০’র ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ের ভেতরে তরুণ বিসিএস কর্মকর্তারা মিছিল বের করে এসব স্লোগান দেন। মিছিল শুরু হয় তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের সহকারী একান্ত সচিবের কক্ষের সামনে থেকে। তখন কাজী জাফরের কক্ষে অস্ত্রধারী ক্যডাররা বসেছিল। অনেকের ধারণা তাদের মধ্যে মিলন হত্যাকারীদের কেউ কেউ ছিল।
‘মিছিল শুরুর সময় ১০/১২ জন কর্মকর্তা ছিলেন। প্রথম স্লোগান ধরেন ড. জাকিরুল ইসলাম,’ জানিয়ে আবু আলম মো: শহীদ খান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: কয়েকদিন ধরে কর্মকর্তারা স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনে তাদের ভূমিকা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে আসছিলেন। শত শত কর্মকর্তা পদত্যাগপত্রে সই করে রেখেছিলেন।
কর্মকর্তারা পদত্যাগপত্রে সই করে আবু আলম মো: শহিদ খান এবং রশিদুল হাই-এর কাছে জমা রাখেন।
আবু আলম জানান: স্লোগান শুনে বিভিন্ন কক্ষ থেকে কর্মকর্তারা বের হয়ে আসতে থাকেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০ তলা থেকে মিছিল যতোই নীচে নামতে থাকে ততোই বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা মিছিলে যোগ দিতে থাকেন। সচিবালয়ের অন্যান্য ভবন থেকেও কর্মকর্তারা নেমে আসেন।
বিসিএস কর্মকর্তাদের বিশাল সমাবেশ আর শোভাযাত্রা দেখে সচিবালয়ে এক ধরনের আতঙ্কও দেখা দেয়। মন্ত্রী এবং সচিবরা নিজ নিজ কক্ষ ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এদিনই বিভিন্ন ক্যাডারের কয়েকশ কর্মকর্তা এরশাদের উপর অনাস্থা জানিয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
কর্মকর্তাদের এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ফজলুল আহাদ, আবু আলম মো: শহিদ খান, র আ ম উবায়দুল মুকতাদীর চৌধুরী, রশিদুল হাই এবং ড. জাকিরুল ইসলাম।
এভাবে একদিকে রাজপথে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা, অন্যদিকে বেসামরিক প্রশাসনের গণঅনাস্থা এবং দেশজুড়ে মিছিল-শোভাযাত্রা ও কয়েক জায়গায় রক্তপাতের ঘটনায় রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর এরশাদের নিয়ন্ত্রণ ঢিলে হয়ে যাবার পরও এরশাদ কয়েক জায়গায় হেলিকপ্টারে-হেলিকপ্টারে ঘুরে আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে বিষোদগার করতে থাকেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাসও দেন। কেউই অবশ্য তার বক্তব্য বিশ্বাস করতেন না। ফলে কোন রাজনৈতিক দলই এরকম বক্তব্যে সামান্য আগ্রহ দেখায়নি।
এরশাদের পাশাপাশি মন্ত্রীরাও মূলতঃ রাষ্ট্রায়ত্ত্ব টেলিভিশনকে পুঁজি করে হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। তখনকার উপরাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বিটিভিতে উপস্থিত হয়ে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেন, এরশাদ পদত্যাগ করতে পারেন না। সেসময়ের উপপ্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগতো লিফলেট নয় যে জিরো পয়েন্টে উড়িয়ে দেবেন!
তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের শেষ চেষ্টা হিসেবে এরশাদ ৩ ডিসেম্বর ঘোষণা করেন যে তিনি নির্বাচনের কিছু সময় আগে পদত্যাগ করবেন। কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও রাজনৈতিক দলগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে।
সরকারের বক্তব্য বিটিভিতে প্রচার হলেও প্রতিক্রিয়ার খবর স্বভাবতঃই সেখানে পাওয়া যেতো না। সরকারের অবস্থান এবং রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া জানা যেতো বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকার খবরে। এর বাইরে আর কোথাও খবর পাওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ ২৭ নভেম্বের থেকেই দেশের সবগুলো পত্রিকা জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু করেছিল। এরশাদ সরকারের মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দৈনিক ইত্তেফাকও এ ধর্মঘটের বাইরে ছিল না, কারণ অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডেকেছিল অবিভক্ত সাংবাদিক সমাজ।
এ বিষয়ে কথা বলেন ওই সময়ের অবিভক্ত বিএফইউজে (বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস) সভাপতি রিয়াজউদ্দিন আহমেদ।

চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: ২৭ নভেম্বর, ১৯৯০ ডা. মিলন নিহত হওয়ার পর সকাল থেকেই শোনা যাচ্ছিল যে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হবে এবং কারফিউ দেওয়া হবে। আমি তখন বিএফইউজের সভাপতি ছিলাম। আমরা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিলাম যদি জরুরি অবস্থা জারি করা হয় তাহলে কাগজ বের করবো না।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, জরুরি অবস্থার মধ্যে কাগজ বের করা মানেই হলো সরকারের প্রিসেন্সরশিপ। প্রিসেন্সরশিপের মানে ছিলো, সরকারের একজন অফিসারকে দেখিয়ে কাগজ বের করতে হবে। সেজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে কাগজ বের করবো না, স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্তই কাগজ বের করবো না।
‘সাংবাদিক ইউনিয়নের সকল সদস্যকে জানিয়ে দিলাম যদি জরুরি অবস্থা জারি করা হয় তাহলে আমরা কোন কাজ করবো না। সন্ধ্যারাত ৭-৮টার দিকে জরুরি অবস্থা জারি হলো, আর আমরা সবাই কাজ বন্ধ করে দিলাম।’
সেদিন সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্ত এরশাদ পতনের বড় একটা কারণ ছিল বলে মনে করেন প্রবীণ সাংবাদিক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন: এরশাদের পতনের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল সাংবাদিক সমাজ। কারফিউ ছিল, ফলে রাস্তায় নামতে দেওয়া হতো না। কিন্তু প্রেসক্লাবই হলো আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে রাজনৈতিক নেতারা যেতেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা যেতেন, আর সাংবাদিকরাতো থাকতেনই।
এভাবে এক সপ্তাহ পত্রিকা বন্ধ থাকার পর ৫ ডিসেম্বর আবার দৈনিকগুলো প্রকাশিত হয়। সেদিন সব পত্রিকার ব্যানার হেডলাইন ছিল: এরশাদের বিদায়।
(১৯৯০ সালে ছাত্রগণঅভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদকে বিদায় করা রাজপথের আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছে পুরো বাংলাদেশ। যেভাবে এ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে এবং তার কিছু নেপথ্য ঘটনাও অনেকের জানা। তবে, সেনাবাহিনী সমর্থন প্রত্যাহার করায় যেভাবে জেনারেল এরশাদ পায়ের নীচে মাটি হারিয়ে ফেলেন সেই ঘটনা জানা নেই বেশিরভাগ মানুষের। ৯০ সালের উত্তাল সময়ে রাজপথের পাশাপাশি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে কী ঘটছিল সেই অজানা অধ্যায়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে ধারাবাহিক এ প্রতিবেদনে।)








