৮ মে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৫তম জন্মদিন, একই দিন আবার মা দিবস। বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিকতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালজয়ী ভূমিকায় আছেন মানব মনের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে অক্ষরে প্রকাশের মাধ্যমে। অথচ যে মাতৃস্নেহ ও মায়ায় শিশু মনে প্রেমের শতরঞ্জি বোনা হয়, শিশুকালে সেই মাতৃস্নেহ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত ছিলেন মা সারদা দেবীর পনেরোতম সন্তান রবীন্দ্রনাথ। কবির জয়ন্তী ও মা দিবসে এমনটিই মনে করছেন রবীন্দ্র গবেষক-বিশ্লেষকগণ।
রবি ঠাকুরের অজস্র লেখায় ‘মা’ শব্দের গভীর আর্তি থাকলেও তাঁর নিজের মায়ের সঙ্গে দূরত্বটা যে প্রকট ছিলো তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেটা রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের রচনায়, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে মায়ের উপস্থিতি অবিশ্বাস্য রকম কম! মা সারদা দেবী আর শিশু রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলো প্রথার দেয়াল।
রবি ঠাকুরের জন্মদিন ও মা দিবস, এই দুই উপলক্ষকে এক সূতোয় গেঁথে রবীন্দ্রনাথের মা আর রবিঠাকুরের মাতৃভাবনা নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিক।
বরেণ্য এই রবীন্দ্র গবেষক জানান,‘তৎকালীন অভিজাত সমাজের মতো ঠাকুর বাড়িতে শিশু সন্তানদের মায়ের কাছে নয় বরং ঝি-চাকরের কাছেই মানুষ হতে হতো। মাত্র ৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ মাকে হারান! তাইতো মায়ের মরণ তাকে সেভাবে নাড়া দেয়নি, নিজের মা হারানোর বেদনা তাকে স্পর্শ করলে তিনি কিছু না কিছু অবশ্যই লিখতেন।
সেই শিশু বয়সে না হলেও বালক রবি লিখতে পারতেন মাকে নিয়ে। আসলে মায়ের আঁচলের বাইরে বড় হওয়া শিশু রবি মা হারানোর শোকই বুঝে ওঠেননি।
তাইতো দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ৯ বছরের কাদম্বরী দেবীকে বউ করে ঘরে আনলেন তখন নতুন বউ ঠানের আঁচলের পরশেই মাতৃস্নেহের পুলক জাগে রবির মনে।মাত্র দুই বছরের বড় কাদম্বরী দেবী হয়ে গেলেন রবির চঞ্চলতা-স্বপ্নীল চিন্তার নিত্য সঙ্গী।
এই আদরটুকুই এতোদিন অধরা ছিলো শিশু রবির কাছে। অন্যদিকে ঠাকুর পরিবারে রবি ঠাকুরকেই আগলে একাকিত্ব ভুলতে চেয়েছিলেন কাদম্বরী দেবী। তাই ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক পরম নির্ভরতার নিবিড় বন্ধনে পরিণত হয়েছিলো।
আহমদ রফিকের মতে, মা কী সেটা তেমনভাবে বুঝতে না পারলেও মাতৃসঙ্গের অভাব রবীন্দ্রনাথকে সারাজীবন একধরণের শূন্যতায় ভুগিয়েছে। সাহিত্য কর্মের নানা চরিত্রেও খুব সূক্ষ্মভাবে এই শূন্যতার ছবি এঁকে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর লেখায় নিজের মায়ের কথা সেভাবে না আসলেও উপন্যাস,নাটকের বিভিন্ন চরিত্র,প্রেক্ষাপটে মা-জননী এবং সন্তানের অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। যেমন ‘ডাকঘর’ নাটকের ‘অমল’ চরিত্রটি। যে চরিত্রটির মাধ্যমে মাতৃহীন রবি মানসের নিঃসঙ্গতা এবং শূন্যতারই একরকম বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়’।
আহমদ রফিক বলেন, ‘রবি ঠাকুর যখন লেখালেখি শুরু করলেন তখন তাঁর লেখায় নিজের মাকে সেভাবে আমরা প্রতিষ্ঠিত হতে দেখিনা। তবে শিশু, শিশু ভোলানাথ এসব কবিতায় তিনি মাকে নিয়ে লিখেছেন’।
রবীন্দ্রনাথের রচনায় নারীকে প্রধানত দুই রূপে দেখার প্রবণতা চিহ্নিত করেছেন গবেষক আহমেদ রফিক। একটি নারী’র মাতৃরূপ অন্যটি প্রেয়সী-প্রেমিকার ভূমিকায় নারী।
তিনি জানান, মাতৃস্নেহহীন শিশু রবি’র মনের ভাবনা কেউ বুঝতে চায়নি। বলতে চাওয়ার এই আক্ষেপ তাঁর আজীবন থেকে গেছে। রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের লেখাগুলোতে নজর বোলালেই তা চোখে পড়ে। খাপছাড়া, ছড়ার ছবি এসব লেখায় শিশুমনকে বোঝার-জানার মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে’।







