প্রায় চার মাস ধরে ভোক্তাদের কাঁদানো পেঁয়াজের মতোই লক্ষণ প্রায় দেখা যাচ্ছে ভোজ্য তেলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দামও ওঠানামা করছে পেঁয়াজের মতোই। যদিও ওঠানামার হার পেঁয়াজের তুলনায় নগন্য।
রাজধানীর বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে ও সরকারি বিপণন সংস্থার (টিসিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক বছরে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে ১২ থেকে ২০ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার ভোজ্য তেলে কর বাড়িয়েছে। এছাড়া মাঝখানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছিল। তাই বাংলাদেশের বাজারেও ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১০২ থেকে ১০৪ টাকা, বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় আর পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়।
অথচ টিসিবির তথ্যমতে, এখন থেকে ঠিক এক বছর আগে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হয়েছিল ৮৮ থেকে ৯২ টাকায়, বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হয়েছিল ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায় আর পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৬ টাকায়।
সংস্থাটির তথ্যে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিনে দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ, বোতলজাতে বেড়েছে ৭ শতাংশ আর পাম অয়েলে বেড়েছে ২৪ শতাংশ।
কারওয়ান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী রহমান মিয়া। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: এখনও মানুষকে কাঁদাচ্ছে পেঁয়াজ। এর সাথে তাল মিলেয়ে বাড়ছে ভোজ্য তেলের দাম।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন: শুধু তেল নয়, মসলাজাতীয় পণ্য থেকে শুরু করে চাল, ডাল, চিনি আটা-ময়দা সব কিছুরই দাম বেড়েছে। সরকারের তদারকি নেই বলেই নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। আয়ের সাথে ব্যয় মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ।
ভোজ্য তেলের দাম বাড়ছে কেন জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের নোয়াখালী স্টোরের একজন বিক্রয়কর্মী বলেন: পাইকাররা দাম বাড়ালে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ে। তার দাবি, গত কয়েকদিন আগের চেয়ে বরং এখন দাম কমেছে। বর্তমানের চেয়ে আরো ৩ থেকে ৪ টাকা দাম বেশি ছিল বলে জানান তিনি।
তবে পাইকারী ভোজ্য তেলের ব্যবসায়ীরা দোষ চাপালেন আন্তর্জাতিক বাজার দর, সরকারের কর বৃদ্ধি আর আমদানিকারকদের ওপর।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি আবুল হাসেম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: হ্যাঁ, আমরাও দেখছি দাম বেড়েছে। মাঝখানে আরো বেশি বেড়েছিল। এখন কিছুটা কমছে। গত ১৫ থেকে ২০ দিন আগে ৩ হাজার ৪শ টাকায় মণ বিক্রি হয়েছিল। এরপর তা কমে ৩ হাজার ৫০ টাকায় নেমে আসে। মূলত চীনে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে কিছুটা কমেছিল। কারণ বিশ্বের মধ্যে ভোজ্য তেলের সবচেয় বড় ক্রেতা চীন। এ কারণে সবাই দাম কমিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এখন বাজারে তেলের সরবরাহ কিছুটা কমে আসায় আবার দাম বেড়ে এখন ৩ হাজার ১৫০ টাকায় অবস্থান করছে। অন্যদিকে মিল মালিকরাও কম দামে বিক্রি করছে না। যদি তারা দাম বাড়ায় তাহলে খুচরা পর্যায়ে আবারো দাম বেড়ে যাবে বলে জানান তিনি।
“এছাড়া যেহেতু চীন সবচেয়ে বেশি ভোজ্য তেল কেনে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে, তাই করোনা ভাইরাসের সমস্যা সমাধান হলে চীন আবার তেল কেনা শুরু করবে। তখন আবার দাম বেড়ে যাবে। এমনকি বর্তমান দামের চেয়ে আরো বেশি দাম বাড়বে।”
চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ভোজ্যতেলের ওপর তিন পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হয়, যা আগে শুধু আমদানি পর্যায়ে আদায় করা হতো। এ ছাড়া অগ্রিম করও দিতে হচ্ছে আমদানি পর্যায়ে।
এ ব্যবসায়ী বলেন: বাংলাদেশে বর্তমানে করের হার বেশি। কর হার না কমালে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে অবশ্যই দাম বাড়বে।
সরকারকে এখনই ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে জানিয়ে আবুল হোসেন বলেন, সামনে রমজান মাস। তখন সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। তাই সরকারের উচিত সারা দেশে কী পরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে, আরো কী পরিমাণ দরকার তা নিয়ে এখনি একটা পরিসংখ্যান করা। এতে রমজানে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।
সরকারকে আরো পরামর্শ দিয়ে এই ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীদের এই নেতা বলেন: এখন যারা আমদানি করছে আসলে তারা সঠিক পরিমাণে আমদানি করছে কিনা এবং মজুদ কতটুকু রয়েছে তা দেখতে হবে। যারা আমদানি করছে না, তাদের আমদানি করার জন্য নির্দেশ দিতে হবে। কারণ আমদানি করলে তা দেশে এসে পৌঁছাতে দুই থেকে আড়াই মাস সময় লেগে যায়। এতে যেন সরবরাহে ঘাটতি তৈরি না হয়, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে রমজানে সংকট হবে না। দামও বাড়বে না।

সরকারও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর উদ্দিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আমাদের একটা কৌশলপত্র তৈরি করা হয়ে গেছে। যাতে রমজানে ভোজ্যতেলের দাম না বাড়ে। শুধু তেল নয়, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যাতে না বাড়ে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
করের বিষয়ে তিনি বলেন: কর কমানো বা বাড়ানোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।








