বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে প্রথম নারী কর্মকর্তা তিনি। শত বাধা বিপত্তি অার প্রতিকূলতা পেরিয়ে করে এখন বাংলাদেশ পুলিশের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (আইজি) হিসেবে কর্মরত অাছেন। তিনি ফাতেমা বেগম। জন্ম ১৯৫৮ সালের ১৪ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জ জেলার টুঙ্গিবাড়ী থানার হাসাইল গ্রামে।
জন্মের পর থেকেই সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। মায়ের স্নেহ ভালবাসা বুঝে ওঠার অাগেই পৃথিবী খেকে বিদায় নেন মা। মাত্র দু’বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। বড় হয়েছেন ভাইবোনদের কাছে।
হাসাইল গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশের পর বানারীপাড়া বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে বদরুন্নেসা কলেজ থেকে এইচএসসি, সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ থেকে স্নাতক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন।
কর্মজীবনে প্রবেশ সপ্তম বিসিএসের মাধ্যমে। ১৯৮৪ সালে বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ পুলিশে। অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজ তিনি পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক। পদে পদে একের পর এক এসেছে বাধা। সাহসিকতা ও দৃঢ় মনোবল দিয়ে অতিক্রম করেছেন সব বাধার দেয়াল।
‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখ, স্বপ্ন হল সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না,’ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম আজাদের বিখ্যাত সেই উক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটিই তার জীবনের চলার পাথেয়।
‘আমার স্বপ্নগুলোকে আমি কখনোই ম্লান হতে দেইনি। স্বপ্ন পূরণে সবসময় থেকেছি অনড়। আর সেভাবেই এগিয়ে চলেছি।’
১৯৮৪ সালে বিসিএস দেওয়ার সময় প্রথম পছন্দ ছিল ফরেন ক্যাডার, তবে পুলিশ ক্যাডারের জন্য সুপারিশ করা হয় তাকে। প্রশিক্ষণসহ সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে যোগ দেন কর্মক্ষেত্রে।
দীর্ঘ এ পথটা মোটেও মসৃণ ছিলনা ফাতেমা বেগমের জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপেই বাধা পেরিয়ে যেতে হয়েছে। পঁচিশ জন পুলিশ কর্মকর্তা একসঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন সেসময়। তাদের মধ্যে দু’জন ছিলেন নারী। একজন ফাতেমা বেগম, অপরজন উম্মে হানী। ‘আমাদের এই পেশায় আসাটা কেউই ভাল চোখে দেখতে পারেনি। এমনকি সেসময়ের স্বরাষ্ট্র সচিব এবং আইজিপিও বারবার এ পেশা ছেড়ে যাবার জন্য বলছিলেন।’
ফাতেমা বেগম বলেন: “এরপরও যখন আমরা বিরত না হই তখন রকিব খন্দকার স্যার আমাকে আর উম্মে হানীকে তার অফিসে ডেকে পাঠান। তিনি আমাদের বাবরবার বোঝাতে চেষ্টা করেন ‘পুলিশের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশা মেয়েদের জন্য নয়। এই চাকুরিতে সফল হতে হলে ঘোড়ায় চড়তে হবে, ১০ ফিট দেয়াল টপকাতে হবে যা একজন নারীর পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়।’ আমাকে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন ক্যাডার পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যেতে। সেদিন আমি স্যারের সামনে মৃদু স্বরে তিনটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলাম, ‘আমি পারব স্যার’।”
এই কর্মকর্তার জীবনের পরের ধাপটা ছিল অারও কঠিন। বিপিএটিসিতে সব ক্যাডার কর্মকর্তাদের সঙ্গে চার মাসের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ শেষে অংশ নেন সারদার পুলিশ একাডেমির প্রশিক্ষণে।
‘প্রশিক্ষণের প্রথম দিনটাতেই বিশাল ধাক্কা খাই। আমাকে আমার পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে মাঠে নামতে দেয়া হয় না। আমার জন্য ঠিক করা হয় আলাদা প্রশিক্ষক। তার নাম ছিল হাবিলদার সোবহান, আমার ওস্তাদ। কিন্তু আমি আলাদা প্রশিক্ষণ নিতে কোনভাবেই রাজি হইনি। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর আমার ওস্তাদ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা আমাকে অনুমতি দেন সবার সঙ্গে মাঠে নামার।’
সহকর্মীদের সহযোগিতামূলক ও বন্ধুসুলভ আচরণ পেলেও তাকে সমস্যাও কম পোহাতে হয়নি।
‘পুলিশে সিনিয়রদের স্যালুট দেয়া ও স্যার বলে সম্বোধন করাটা বাধ্যতামূলক হলেও নারী হবার কারণে আমার জুনিয়ররা আমাকে প্রথম-প্রথম স্যার বলে ডাকত না বা স্যালুটও দিত না। আমাকে মেনে নিতে তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। এমনকি আমার পুরুষ সহকর্মীদের কাছে তারা জিজ্ঞাসা করত, স্যার- এই মেয়েটিও কি আপনাদের মতোই এএসপি!’
এত কিছুর পরও তিনি তার যোগ্যতা দিয়ে সব সমস্যার মোকাবিলা করে সবার অাস্থা, ভালবাসা, শ্রদ্ধা অর্জন করে বর্তমান অবস্থানে অাসতে পেরেছেন। এর পেছনে রয়েছে তার নিরলস শ্রম ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।
সফলতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি টাঙ্গাইল জেলায় সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন। কর্মজীবনে সবচেয়ে ভাল লাগার জায়গা হিসেবে ঠাকুরগাঁও জেলার কথা উল্লেখ করলেন। পুলিশ সুপার হিসেবে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
ঠাকুরগাঁও জেলার স্মৃতি রোমন্থন করে ফাতেমা বেগম বলেন: তখন রমজান মাস। হঠাৎ একদিন থানায় খবর অাসে একটি পথশিশু আত্মহত্যা করেছে। সংবাদ আসার পর আমার ওসি বলে, ইফতার করে তারপর যাব। এই কথার জের ধরেই শুরু হয় সমস্যার। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে পুলিশের মারামরি লেগে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমি সেখানে গেলে উত্তেজিত জনতা অামার উপর হামলে পড়তে চায়। তবে সেদিন আমার সিকিউরিটি গার্ডরা থাকায় কোন ক্ষতি হয়নি।
ফাতেমা বেগম বলেন, ‘সেসময় ঠাকুরগাঁয়ের পরিস্থিতি এমন হয়ে গিয়েছিল যে, তা মোকাবিলায় আমাকে অনেক কৌশলে এগোতে হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মদদে প্রতিদিন সেসময় আমাকে মাইকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হত। আমার ওসিকে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়ে আসছিল তারা। এই সমস্যা নিরসনে স্থানীয় নেতা ও উচ্ছৃঙ্খল ছেলেদের দমন করার জন্য অামি তখন সারা শহরে টহলের ব্যবস্থা করেছিলাম। পরে অবশ্য সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল।’
যোগ্যতা ও দক্ষতার বলে পরে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ জনগণের অতি অাপনজন হয়ে যান। যে কেউ যে কোন সময় সমস্যা নিয়ে আসতে পারত তার কাছে। ধৈর্যসহ সবার সবকিছু শুনে সমাধান দিতেন তিনি।
বর্ণিল কর্মজীবনে এই নারী কাজ করেছেন অনেক জায়গায়। তার কর্মজীবনের মধ্যে ছিল এএসপি (খাগড়াছড়ি সার্কেল), অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ), পুলিশ সুপার (টেলিকম), পুলিশ সুপার (ঠাকুরগাঁও), শান্তিরক্ষী মিশন, এআইজি কল্যাণ (পুলিশ হেডকোয়াটার্স), পুলিশ সুপার (স্পেশাল ব্রাঞ্চ), পরিচালক তদন্ত (র্যাব), ডিআইজি ট্রেনিং এন্ড রিক্রুটমেন্ট (পুলিশ হেডকোয়াটার্স), ডিআইজি প্রশাসন ও অর্থ (পুলিশ হেডকোয়াটার্স) এবং এখন তিনি অতিরিক্ত আইজি (পুলিশ হেডকোয়াটার্স)।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তিতে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস-ও করেছেন ফাতেমা বেগম।







