একটি বেসরকারি টিভির সংবাদ পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে একজন দর্শকের প্রশ্ন ছিল, ‘নারী নির্যাতন নিয়ে বলেন, পুরুষ নির্যাতন নিয়ে বলেন না কেন?’। প্রত্যুত্তরে অতিথি বলেছিলেন: ‘সংসারে এখন ছাড় দেয়াদেয়ি কমে গেছে… … ইত্যাদি। নিতান্তই অনর্থক কথাবার্তা।
‘পুরুষ নির্যাতন’ বিষয়টি উপেক্ষিত এই উষ্মাটি অনেকের মাঝেই দেখেছি। অনেকের মুখে শুনেছি। কাউকে কাউকে এমনও প্রশ্ন করতে শুনেছি ‘নারী অধিকার’ আন্দোলনের বিষয় হলে পুরুষের অধিকার কেন আন্দোলনের বিষয় হবেনা? কথামালার মাঝে মনে এল ১৯৭০ সাল হতে কয়েক বছরের জন্য পুরুষ অধিকার আন্দোলনও চালু ছিল। সন্তানের দত্তক পাবার অধিকার, তালাক আইনের পুরুষ বিদ্বেষিতার প্রতিবাদ করা, পিতৃত্বকালীন কর্মছুটি ইত্যাদিসহ বেশ কয়েকটি দাবী-দাওয়া নিয়ে শুরু হলেও আন্দোলনটি তেমন হালে পানি পায়নি। কিন্তু ২০০৯ সালে পল এলাম ‘পুরুষ অধিকার’ আন্দোলনকে উপজীব্য করে ‘ভয়েস ফর মেন’ নামে ওয়েবসাইট খোলার পর হতে অগণিত অসংখ্য পুরুষ মুড়ি-মুড়কির মত হুড়মুড় করে তার অনুসারি হতে শুরু করে।
নারীবাদীদের দৃষ্টিতে এলাম আল্ট্রা-মিসজিনিস্ট, ‘হার্ডকোর মেল শভিনিস্ট হোয়াইট পিগ’। তবুও তার সমর্থকের সংখ্যা বাড়ছেই। কী রাস্তাঘাটের সমাবেশে, কী ক্লাবে-পাব-এ, সব যায়গাতেই! এই নিয়ে ২০১৬ সালে নির্মিত ‘দ্যা রেড পিল’ ডকুমেন্টারিটির কথা মনে এল। একজন নিবেদিত নারীবাদী বানিয়েছেন ছবিটি। তবে তার উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করা কেন নারীবাদ বিরোধিতা নারীবাদের জনপ্রিয়তার চেয়েও বহু বহুগুণ দ্রুত বহু পুরুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ডকুমেন্টারিটি চিন্তার খোরাকে ভরপুর। নারীবাদ বিষয় সংশ্লিষ্টগণ (ছবিটি না দেখা থাকলে) নারী দিবসে ছবিটি দেখে নিতে পারেন। পল এলামেরও একটি বড় প্রকল্প ‘পুরুষ নির্যাতন’ ঠেকানো।
নারীবাদীরা ডকুমেন্টারিটিকে নারীবাদবিরোধী মিসোজিনিস্টিক প্রোপাগান্ডা খেতাব দিয়ে তীব্র বিরোধিতায় নামলেও কানাডা-আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠসূচীতে ‘দ্যা রেড পিল’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অনেক সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়েছে। ইউটিউবেই এনিয়ে অসংখ্য ভিডিও আছে।
বাংলাদেশে জেন্ডার স্টাডিজ পড়ানো হয়। নারীবাদও যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু কোনো পাঠসূচী, লেখালেখি বা আলোচনায় বিষয়টি আলোচিত হয়েছে কিনা জানিনা। নারীবাদের প্রতিপক্ষ না হয়েই নির্মোহ বিকল্প চিন্তার এই ধারাটি কিন্তু পশ্চিমে কয়েক দশক আগেই শুরু হয়েছে। গবেষকরা সম্প্রতি আরো বেশি করে জানতে চাইছেন পুরুষ যদি এতই সুবিধাভোগি হবে তাহলে নারীর তুলনায় স্বল্পায়ু কেন? মানসিক রোগ, পঙ্গুত্ব, স্মৃতিবিলোপ, ডায়বেটিস, আত্মহত্যা ও হৃদরোগের শিকার পুরুষরা নারীদের চাইতে অনেক বেশি কেন? কারণ শুধুই কি দেহগত ব্যবধান বা জনমিতিগত বিন্যাস? নাকি পুরুষের এ’সব পশ্চাদপদতায় জেন্ডার-বৈষম্য ও অবনমিত সম্পর্কের ভূমিকাও আছে।?
এবার কিছু তথ্যে নজর দেয়া যাক!
২০০৭ সালে বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথ-এ ড্যানিয়েল হুইটেকারও সহযোগিরা প্রায় সাড়ে এগারো হাজার জনের দাম্পত্য-সম্পর্কে IPV বা ইন্টিমেইট পার্টনার ভায়োলেন্স নিয়ে গবেষণা করে দেখলেন মারাত্মক আক্রমণে নারী-পুরুষের দায় দ্বিপাক্ষিক (রেসিপ্রকাল) এবং ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ [৫০-৫০]’ একপাক্ষিক আক্রমণ এর বেলায় নারীই অগ্রগামী। প্রায় ৭০ ভাগ প্রথম আক্রমণটি করেছে নারী। ব্রিটেনে ২০০৫ হতে ২০০৯ পর্যন্ত অপরাধের তথ্য আরো অদ্ভূত। পুরুষ করেছে গড়ে ৪৫% এর মত শুরুর আক্রমণ। ২০০৮-২০০৯এ তা আরো কমে ৩৮% হয়েছে। অর্থাৎ ভায়োলেন্স শুরুর বেলায় নারী আসলেইআগুয়ান। ২০০০ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকার সোফি গুডচাইল্ড প্রায় ১৮টি ব্রিটিশ গবেষণার আলোকে দেখান বেশির ভাগ ভায়োলেন্সের শুরু নারীর হাতে। ১৯৭২ সাল হতে শুরু হওয়া গবেষণাগুলোয় প্রায় ৪০ হাজার জন উত্তরদাতা ছিলেন। ১৯৭৫ সাল হতে নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যামিলি রিসার্চ ল্যাবের সমাজবিজ্ঞানী মুরে স্ট্রস ও রিচার্ড গ্যেল্যে কয়েক দশক ধরে ন্যাশনাল ফ্যামিলি ভায়োলেন্স সার্ভের সংগে জড়িত ছিলেন। তাদের জরিপের ফলাফল ছিল ভায়োলন্সে নারী-পুরুষ কেউই পিছিয়ে নেই; শুরুটি প্রায়শই নারীর হাতে।
প্রায় চার দশক ধরে ব্রিটেনে বিতর্ক চলছিল নারীর হাতে আক্রমণ শুরুর প্রমান থাকার পরও দোষ সচরাচর পুরুষের ঘাড়েই পড়ছে কেন? প্রশ্ন উঠছিল কোর্টকাচারির জজ সাহেবরা, পুলিশ, সমাজকর্মীরা কেন পুরুষের বক্তব্য আমলে না নিয়ে নারীর সাক্ষ্য ও ভাষ্যকেই সচরাচর প্রাধান্য দেন। কিছু কিছু গবেষণায় উত্তরও পাওয়া গেছে যে নারী আক্রমণ বেশি করলেও তাদের শারীরিক গঠনের কারণে সেগুলো পার্টনারের জন্য মারাত্মক শারিরীক ক্ষতির কারণ হয় না। পুরুষের আক্রমণ শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়, আক্রমণের চিহ্নও সহজে চোখে পড়ে। প্রামান্য দলিল সহজেই মেলে বলে বিচারিক সুবিধা হয়।
মজার বিষয় হচ্ছে ‘পার্টনার অ্যাবিউস’ নামে একটি জার্নালও ছিল যাতে ২০১০ সালে স্ট্রস লিখলেন যে আক্রমণের হেতু বা মোটিভ নারী ও পুরুষের একই। ক্রোধোম্মত্ততা ও পার্টনারের উপর জবরদস্তিমূলক আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
পশ্চিমে নারীর ক্ষমতায়ন, উপার্জন-সক্ষমতায় বেড়ে ওঠা ইত্যাদিকে পারিবারিক ভায়োলেন্সে নারীরও সমান অংশগ্রহনের কারণ মনে করা হয়।বাংলাদেশ সমাজ পশ্চিমা সমাজের মত নয় আমরা সবাই জানি ও মানি।বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোতে নারীর অধস্তনতা নিয়েও দ্বিমতের সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনটিও তো আর থেমে নেই। পশ্চিমা সমাজের মত একই দ্রুততায় বাংলাদেশি সমাজেরও পশ্চিমায়ন-ভুবনায়ন হচ্ছেই। ফলে জেন্ডার সম্পর্কে, ভায়োলন্সে, নির্যাতন ও নিবর্তনের ধরণেও পরিবর্তন আসতে বাধ্য। তাই বিষয়টি নিয়ে একাডেমিক আলোচনা দরকার। গবেষণা দরকার। জ্ঞান-বিকাশের প্রয়োজনে ‘পুরুষ নিবর্তন’ ধারণাটিকে হাসি-পরিহাসের বিষয় ভাবার সুযোগ আর নাই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








